উচ্চস্বরে দুরূদ শরীফ পাঠ করা

0

উচ্চস্বরে দুরূদ শরীফ পাঠ করা
দুরূদ শরীফ-এর মর্মার্থ হচ্ছে- আল্লাহ্ কর্তৃক নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর শান ও মর্যাদা বৃদ্ধিকরণ। আল্লাহ্ তা‘আলার পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে, আল্লাহ্ ও ফেরেশতাগণ আল্লাহর হাবীবের উপর দুরূদ শরীফ পাঠ করেন। আল্লাহ্ কর্তৃক দুরূদ পড়ার অর্থ আল্লাহর নবীর মর্যাদা মুহূর্তে মুহূর্তে বৃদ্ধিকরণ। আর ফেরেশতা কর্তৃক পাঠ করার অর্থ হলো- আল্লাহর নিকট আল্লাহর হাবীব সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর মর্যাদা বৃদ্ধিকরণের জন্য আল্লাহ্র দরবারে সালাত ও সালাম সম্বলিত বাক্য দিয়ে ফরিয়াদ করা। ঈমানদারের উপর নির্দেশ হল সালাত ও সালামের বাক্য দিয়ে আল্লাহর দরবারে নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর শান মান বৃদ্ধির জন্য আবেদন করা। এটাকে দুরূদ পাঠ বলা হয়। মূলত দুরূদ শরীফ আল্লাহ্, ফেরেশতাগণ ও বান্দাদের কাজ; যেখানে নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর শান, মান, মর্যাদা বৃদ্ধি করার মর্ম রয়েছে।

এ দুরূদ শরীফ যেমনিভাবে চুপে চুপে পাঠ করা জায়েয, তেমনি উচ্চস্বরেও জায়েয। যেমন ক্বোরআন মাজীদে এরশাদ হয়েছে- فَاذْكُرُوْا اللهَ كَذَكْرِكُمْ ابَآئَكُمْ اَوْ اَشَدَّ ذِكْرًا অর্থাৎ তোমরা এভাবে আল্লাহর যিক্র করো, যেভাবে তোমরা তোমাদের বাপ-দাদাকে স্মরণ করো; বরং এর চেয়ে আরও বেশি। এটা থেকে বুঝা গেলো, আল্লাহর যিক্র চুপে চুপে হোক কিংবা উচ্চস্বরে হোক, উভয় অবস্থায় জায়েয ও বৈধ।
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে, হুযূর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম নামায থেকে সালাম ফেরানোর পর উচ্চস্বরে-لآَ اِلهَ اللهُ وَحْدَه لاَ شَرِيْكَ لَه (লা- ইলা-হা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্দাহূ লা- শরীকা লাহু) পর্যন্ত পড়তেন।

হযরত ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেন-
كُنْتُ اَعْرِفُ اِنْقِضَاءَ صَلوٰةِ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِالتَّكْبِيْرِ
অর্থাৎ তাকবীরের আওয়াজ উচ্চস্বরে শুনে আমি বুঝতে পারতাম রাসূলুল্লাহর নামায শেষ হওয়ার কথা। হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস তখন সাবালক ছিলেন না বিধায় মাঝে মধ্যে জামা‘আতে হাযির হতেন না।

আরো বর্ণিত আছে হাদীসে ক্বুদসীতে, আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ করেন-
فَاِنْ ذَكَرَنِىْ فِىْ نَفْسِه ذَكَرُتُه فِىْ نَفْسِىْ ـ وَاِنْ ذَكَرَنِىْ فِىْ مَلَأَ ذَكَرُتُه فِىْ مَلْأَ خَيْرٍ مِّنْهُمْ
অর্থাৎ বান্দা যদি আমাকে জামা‘আত বা মজলিসে স্মরণ করে, তবে আমিও তাকে তদপেক্ষা উত্তম মজলিসে স্মরণ করি।

তাই দুরূদ শরীফ অন্যতম যিক্র। শুধু তা নয়, তা আল্লাহর যিক্রও। এ জন্য প্রত্যেক দো‘আ ক্ববূলের ব্যাপারে দুরূদ শরীফ অন্যতম ওসীলা; বরং এটা ছাড়া দো‘আ ক্ববুলও হবে না বলে হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে। আরো উল্লেখ আছে হাদীসে ক্বুদ্সীতে جَعَلْتُكَ ذِكْرَا مِنِّىْ فَمَنْ ذَكَرَكَ ذَكَرَنِىْ অর্থাৎ আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন, ‘‘ওহে! আমার হাবীব, আপনাকে আমার পক্ষ থেকে যিক্র সাব্যস্ত করলাম। অতএব, আপনাকে যে যিক্র করলো, সে আমার যিক্র করলো।’’

ফতওয়া-ই শামীতে উল্লেখ আছে-
فَقَالَ بَعْضُ اَهْلِ الْعِلْمِ اِنَّ الْجَهْرَ اَفْضَلُ لِاَنَّه اَكْثَرُ عَمَلاً وَلِتَعَدِّىْ فَائِدَتِه اِلَى السَّامِعِيْنَ وَيُؤْقِظُ قَلْبَ الْغَافِلِيْنَ فَيَجْمَعُ هَمَّه اِلَى الذِّكْرِ وَيَصْرِفُ سَمْعَه اِلَيْهِ وَيَطْرُدُ النَّوْمَ وَيَزِيْدُ النَّشَاطَ
অর্থাৎ কোন কোন ফক্বীহ্ উচ্চস্বরে যিক্র ও দুরূদ শরীফ পড়াকে উত্তম বলেছেন। এর মধ্যে কর্ম বেশি। শ্রবণকারীর নিকট এর ফায়দা পৌঁছে, অলস ব্যক্তিদেরকে জাগ্রত করে দেয় এবং তাদের ধ্যান-ধারণাকে আল্লাহ্ ও রসূলের পথে নিয়ে আসে এবং নিদ্রা দূরীভূত করে সজীবতা সৃষ্টি করে দেয়।

তাই উচ্চস্বরে দুরূদ শরীফ পাঠ করা উত্তম কাজ। এর মধ্যে অন্যান্য শ্রোতারা এটা শ্রবণে উপকৃত হবে। পাশাপাশি অন্যান্য সৃষ্টি এ দুরূদ শরীফে যোগ দেবে এবং তারা ক্বিয়ামতের দিন সাক্ষী হবে। সুতরাং এটা ইসলামের মধ্যে অন্যতম নিদর্শন।

তাই, দুরূদ শরীফ আল্লাহর যিক্র। আল্লামা ইসমাঈল হক্বক্বী তাফসীর-ই রুহুল বয়ানে উল্লেখ করেছেন:
رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هذَا اَلذِكْرُ بِرَفْعِ الصَّوْتِ جَآئِزٌ بَلْ مُسْتَحَبٌّ اِذَا لَمْ يَكُنْ عَنْ رِّيَاءٍ لِيَغْتَنِمَ النَّاسُ بِاِظْهَارِ الدِّيْنِ وَوُصُوْلِ بَرْكَةِ الذِّكْرِ اِلى السَّامِعَيْنَ فِى الدُّوْرِ وَالْبُيُوْتِ وَيُوَافِقُ الذِّكْرَ مَنْ سَمِعَ صَوْتَه وَىَشْهَدَلَه يَوْمَ الْقِيَامَةِ كُلَّ رَطَبٍ وَّيَابِسٍ سَمَعِ صَوْتَه
অর্থাৎ উচ্চস্বরে যিক্র করা শুধু জায়েয নয়; বরং মুস্তাহাব; কিন্তু রিয়া মুক্ত হতে হবে। আর এ উচ্চস্বরে যিক্র দ্বারা ইসলাম ধর্মের মাহাত্ম্য প্রকাশ করাই উদ্দেশ্য হয়। এ যিক্রের বরকত ঘরে অবস্থানকারীদের মধ্যে যেন পৌঁছে এবং যিক্রের মধ্যে যেন মশগুল হয়ে যায়। ক্বিয়ামতের দিন এ যিক্রের সাক্ষী প্রত্যেক কিছুই হবে, যাদের কানে এ যিক্রের আওয়ায পৌঁছেছে।

ফাতাওয়া-ই আলমগীরীতে আছে- قَاضٍ عِنْدَه جَمَعٌ عَظِيْمٌ يَرْفَعُوْنَ اَصْوَاتَهُمْ بِالتَّسْبِيْحِ وَالْتَّهْلِيْلِ جُمْلَةً لاَ بَأْسَ بِه অর্থাৎ কোন বিচারকের নিকট লোক সমাগম হয়ে উঁচু আওয়াজে যিক্র-আযকার করছে। তা শরীয়ত মতে অসুবিধা নেই। আরো উল্লেখ আছে- اَلْاَفْضَلُ فِىْ قِرَأَةِ الْقُرْانِ خَارِجَ الصَّلٰوةِ الْجَهْرُ
অর্থাৎ নামাযের বাইরে বড় আওয়াজে ক্বোরআন শরীফ পাঠ করা উত্তম।
—০—

শেয়ার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •