প্রশ্ন: অনেকে বলে থাকে ‘ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম তথা এ পৃথিবীতে প্রিয়নবী হুযুর পূরণুর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র শুভাগমন উপলক্ষে জশনে জুলুসের মত (মিছিল ও শোভাযাত্রা বের করা) মিলাদ মাহফিল, খানাপিনা, দান-সাদকাহ্ ইত্যাদির মাধ্যমে আনন্দ-উৎসব পালন করার কোন প্রমাণ পবিত্র কোরআনে নেই। এ ব্যাপারে কোরআন-সুন্নাহর আলোকে বিস্তারিত জানতে চাই।

0

প্রশ্ন: অনেকে বলে থাকে ‘ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তাআলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম তথা এ পৃথিবীতে প্রিয়নবী হুযুর পূরণুর সাল্লাল্লাহু তাআলা আলায়হি ওয়াসাল্লামর শুভাগমন উপলক্ষে জশনে জুলুসের মত (মিছিল ও শোভাযাত্রা বের করা) মিলাদ মাহফিল, খানাপিনা, দান-সাদকাহ্ ইত্যাদির মাধ্যমে আনন্দ-উৎসব পালন করার কোন প্রমাণ পবিত্র কোরআনে নেই। এ ব্যাপারে কোরআন-সুন্নাহর আলোকে বিস্তারিত জানতে চাই।

্উত্তর: পবিত্র কোরআনের আলোকে ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম উদ্যাপন, মাহে রবিউল আউয়াল শরীফে রসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র বেলাদত শরীফ ও শুভাগমনকে কেন্দ্র করে জশনে জুলুস (বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা), আলোচনা, সেমিনার, খানাপিনা, সদকাহ-খয়রাত, দরূদ-সালাম, দোয়া-মুনাজাতসহ জাঁকজমকপূর্ণ দ্বীনী অনুষ্ঠানসমূহের আয়োজনের মাধ্যমে প্রিয়নবী’র শুভাগমনের ঘটনাবলী ও আলোচনা করাকে সম্পূর্ণ শরিয়তের পরিভাষায় ‘ঈদে-মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’ বলা হয়।

           ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে নিঃসন্দেহে এটা মুস্তাহাব, কোরআন-হাদীস সমর্থিত পূণ্যময় ইবাদত। সলফে সালেহীন ও বুযুর্গানে দ্বীনের সুন্নাত এবং উত্তম তরীকা। এ ব্যাপারে প্রতিটি যুগের বিশ্ববরেণ্য ইমামগণ আরবী, উর্দু, ফার্সী ভাষায় নির্ভরযোগ্য কিতাবসমূহ রচনা করেছেন। এখানে ভণ্ড ও কুচক্রীদের ভণ্ডামী নিরসনে ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র বৈধতার উপর পবিত্র কোরআনের কিছু প্রমাণাদি পেশ করা হল।

এক. মানুষ যখন কোন নিয়ামত ও রহমত প্রাপ্ত হয়, তখন আনন্দোৎসব করা যেমন তার স্বভাবজাত কাজ তেমনি আল্লাহর নিদের্শও তাই।

 যেমন- এরশাদ হচ্ছে-

قل بفضل اللہ وبرحمتہ فبذالک فلیفرحوا ہوخیر ممّا یجمعون

অর্থাৎ হে হাবীব! আপনি (বিশ্ববাসীকে) বলুন, আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁর দয়া স্মরণ করে সেটার জন্য তারা যেন অবশ্যই আনন্দ প্রকাশ করে; তা তাদের সঞ্চয়কৃত সমস্ত ধন-সম্পদ অপেক্ষা শ্রেয়।

[সূরা ইউনুস, আয়াত-৫৮]

উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতি রহমাতুল্লাহি আলায়হি তাঁর রচিত আদ্দুররুল মনসূর’ তাফসীরে উল্লেখ করেছেন যে,

اخرج ابوالشیخ عن ابن عباس رضی اللہ عنہ فی الایۃ قال فضل اللہ العلم ورحمتہ النبی صلی اللہ علیہ وسلم قال اللہ تعالٰی وما ارسلنٰک الا رحمۃ للعالمین (الانبیاء) فکذا قال الالوسی فی روح المعانی (ج ۱۰ ص ۱۴۱) وابوالسعود فی تفسیرہ والامام الرازی فی التفسیرالکبیر (ج ۱۷ ص ۱۲۳) الدر المنثور للسیوطی ۳۶۸/۴ ج)

অর্থাৎ-হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু এ আয়াতের তাফসীরে বলেন, এখানে আল্লাহর অনুগ্রহ বলতে ‘ইলমে দ্বীন’ কে বুঝানো হয়েছে আর ‘রহমত’ দ্বারা বুঝানো হয়েছে আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে। যেমন আল্লাহ্ তায়ালা এরশাদ করেন, ‘‘হে হাবীব, আমি আপনাকে জগতসমূহের জন্য ‘রহমত’ রূপে প্রেরণ করেছি।’’ [সূরা আম্বিয়া, আয়াত-১০৭]

ইমাম আলূসী ‘রূহুল মা‘আনী ১০ম খন্ডের ১৪১ পৃষ্ঠায়, আবু সাউদ তাঁর তাফসীর গ্রন্থে আর ইমাম রাজী তাঁর ‘তাফসীরে কাবীর’ গ্রন্থে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।

 [ইমাম সুয়ূতী রহমাতুল্লাহি আলায়হি কৃত. ‘তাফসীরে আদুররুল মুনসুর, ৪র্থ খণ্ড, ৩৬৭পৃষ্ঠা।]

দুই.মহান আল্লাহ্ পৃথিবীর বুকে হুজুরে আকরম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র আগমনকে মানবজাতির জন্য সবচেয়ে বড় ইহসান (দয়া) হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

لقد من اللہ علی المؤمنین اذ بعث فیہم رسولا من انفسہم یتلوعلیہم اٰیٰتہٖ ویزکیہم ویعلمہم الکتاب والحکمۃ وان کانوا من قبل لفی ضلالٍ مبین

অর্থাৎ নিশ্চয় আল্লাহ্ মুমিনগণের উপর বড়ই ইহসান (অনুগ্রহ) করেছেন যে, তিনি তাদের মাঝে নিজেদের মধ্য হতে (মানব বংশে) তাদের কাছে একজন সম্মানিত রসূল প্রেরণ করেছেন। যাতে তিনি তাদের নিকট আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করেন, তাদেরকে যাবতীয় পাপ এবং নাপাকী থেকে পবিত্র করেন এবং তাদেরকে কোরআন-হাদীসের শিক্ষা দান করেন। যদিও তারা তার শুভাগমনের পূর্বে স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে ছিল। [সূরা ইমরান, আয়াত-১৬৪]

এ আয়াতে আল্লাহ্ তা‘আলা আমাদের প্রিয় রসূলের শুভাগমনকে মুমিনের জন্য বিশেষ ‘অনুগ্রহ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সাধারণ পার্থিব নেয়ামত বা অনুগ্রহ লাভ করার দরুন যদি ঈদ বা খুশি করা শরিয়ত সমর্থিত হয়। তবে সবচেয়ে বড় অনুগ্রহ অর্থাৎ মহান রাসূলের আগমনের মুহূর্ত, মাস, দিন, ক্ষণকে স্মরণ করে ঈদ খুশি আনন্দোৎসব করা যে বড় উত্তম কাজ এতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। তদুপরি সূরা আলে- ইমরানের উপরিউক্ত আয়াতে করিমায় মহান রাব্বুল আলামীন রসূলে পাক সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ধরাবুকে শুভাগমনের লক্ষ্য- উদ্দেশ্য ব্যক্ত করেছেন। যা ঈদে-মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামা এর মাহফিল সমূহে বর্ণিত হয়।

তিন. পবিত্র কোরআনে পাকে আরো এরশাদ হচ্ছে-

وما ارسلنٰک الا رحمۃ اللعٰلمین

অর্থাৎ হে হাবীব, আমি আপনাকে জগতসমূহের প্রতি একমাত্র ‘রহমত’ রূপেই প্রেরণ করেছি।

[সূরা আম্বিয়া, আয়াত-১০৭]

            এ আয়াতে মহান আল্লাহ্ তায়ালা প্রিয় নবীর ইরসাল তথা পৃথিবীর বুকে তাঁকে পাঠানোর কথা এবং তিনি যে রাহমাতুল্লিল আলামীন তার সুস্পষ্ট বিবরণ তুলে ধরেছেন। এ আয়াতে করীমার ব্যাখ্যায় ইমাম ফখরুদ্দীন রাজী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি বলেন-

انہ علیہ السلام کان رحمۃ فی الدین وفی الدنیا اما فی الدین فلانہ علیہ السلام بعث والناس فی جاہلیۃ وضلالۃ ……الخ (التفسیر الکبیر للامام فحر الدین الرازی رحمۃ اللہ علیہ [ج ۲۲/ص .۲۳]

অর্থাৎ তিনি (নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম) দ্বীন এবং দুনিয়া উভয় ক্ষেত্রে ‘রহমত’। দ্বীনের ক্ষেত্রে হুজুরে রাহমাতুল্লিল আলামীন সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ‘রহমত’ হওয়ার কারণ যেহেতু তাঁর শুভাগমন এমন সময় হয়েছিল যখন মানবজাতি জাহেলিয়াত ও গোমরাহীর মধ্যে নিমজ্জিত ছিল। আর দুনিয়া বা পৃথিবীর জন্য তিনি ‘রহমত’ এজন্য যে, তাঁর আগমন ও পদার্পণের কারণে গোটা পৃথিবী শান্তির ছায়া লাভে ধন্য হয়েছে।

[ইমাম ফখরুদ্দীন রাজী কৃত. তাফসীরে কাবীর, ২২তম খন্ডের ২৩০ পৃষ্ঠা।]

চার.মহান আল্লাহ্ আরো এরশাদ করেন-

لقد جائکم رسول من انفسکم عزیز علیہ ما عنتم حریص علیکم بالمؤمنین رؤف رحیم (التوبۃ ۱۲۸)

            অর্থাৎ ‘নিশ্চয় তোমাদের কাছে তাশরিফ এনেছেন তোমাদেরই বংশ হতে এমন সম্মানিত রসূল যাঁর কাছে তোমাদের কষ্টে পড়া বড়ই কষ্টদায়ক, তিনি তোমাদের কল্যাণ অতিমাত্রায় কামনাকারী, মুমিনদের জন্য পূর্ণ দয়ার্দ্র আর বড়ই দয়ালু। [সূরা তাওবা, আয়াত-১২৮]

            এ আয়াতে পাকেও মহান আল্লাহ্ মক্কাবাসী তথা বিশ্ববাসীকে সম্বোধন করে রসূলে আকরম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামার ধরা বুকে আগমন করাকে তাঁর অনেক গুণাবলী ও মর্যাদা সহকারে বর্ণনা করেছেন। এ আয়াতে কারীমার ব্যাখ্যায় ইমাম ফখরুদ্দীন রাজী রহমাতুল্লাহি আলায়হি বলেন-

وارسلہ صلی اللہ علیہ وسلم من ہذہ الحالات والصفات یکون من اعظم نعم اللہ علیکم …..وقال ابن عباس رضی اللہ عنہ سمّہ اللہ تعالٰی باسمین من اسماۂ ای رؤف رحیم (التفسیر الکبیر ج ۱۸ص ۲۳۶ )

            অর্থাৎ প্রিয়নবী সাইয়্যেদুল মুরসালীন সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে এ সব অবস্থা ও গুণাবলী দ্বারা জগতে প্রেরণ করাটা তোমাদের জন্য আল্লাহর সর্বাপেক্ষা বড় নিয়ামত বা সর্বশ্রেষ্ঠ অনুগ্রহ। এ আয়াতের ব্যাখ্যায় হযরত ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুমা বলেন, ‘আল্লাহ্ তায়ালা তাকে (রসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম) কে আপন দু’টি নাম ‘রঊফ’ (দয়ার্দ্র ও ‘রহীম’ (অসীম দয়ালু) দ্বারা নামকরণ করে সম্মানিত করেছেন।’’

[হযরত ইমাম রাযী (র.) কৃত. ‘তাফসীরে কবীর’ ১৮ম খণ্ড, ২৩৬-২৩৭পৃষ্ঠা]

পাঁচ. পরম করুণায়ের এরশাদ

یایہا الناس قد جائکم برہان من ربکم وانزلنا الیکم نورًا مّبٍیْنًا

অর্থাৎ হে বিশ্ববাসী নিশ্চয়ই তোমাদের নিকট তোমাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট প্রমাণ এসেছে। এবং আমি তোমাদের প্রতি উজ্জ্বল আলো অবতীর্ণ করেছি।

[সূরা নিসা, আয়াত-১৭৪]

            উক্ত আয়াতে করীমায় ‘বোরহান’ শব্দের ব্যাখ্যায় তাফসীরে কবীর, তাফসীরে রূহুল বয়ান ও তাফসীরে জালালাঈন শরীফে বর্ণনা করা হয়েছে-

وہو النبی صلی اللہ علیہ وسلم قد جائکم برہانکم ..الایۃ

অর্থাৎ  আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের নিকট বোরহান তথা অকাট্য প্রমাণ এসেছে। এখানে ‘বোরহান’ থেকে উদ্দেশ্য হুজুরে আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম।

            বিশ্ববিখ্যাত তাফসীর বিশারদ ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি বলেন-

 অর্থাৎ  উক্ত আয়াতে প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে ‘বোরহান’ বলা হয়েছে। যেহেতু তাঁর দায়িত্ব হক্ব এবং ন্যায় কে প্রতিষ্ঠিত করা এবং বাতিল ও অন্যায়কে খন্ডন করার জন্য অকাট্য প্রমাণ পেশ করা।

[তাফসীরে কাবীর, সূরা নিসা, তাফসীরে জালালাঈনের হাশিয়া, সূরা নিসা, পৃষ্টা-৯৩]

            উপরিউক্ত আয়াতে করিমায় মহান প্রভু প্রিয় মাহবুব সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে বিশ্ববাসীর নিকট ‘বোরহান’ তথা অকাট্য প্রমাণ হিসেবে শুভাগমন করার কথা বিবরণ দিয়েছেন।

ছয়.আল্লাহ্ পাক জাল্লাশানহু এরশাদ করেন-

وانما سماہ برہانا لان حرفہ اقامۃ البرہان
علی تحقیق الحق وابطال الباطال

অর্থাৎ  নিশ্চয় তোমাদের নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে মহান ‘নুর’ এসেছে এবং সুস্পষ্ট কিতাব।’’

            তাফসীরে জালালাঈনের ৯৭ পৃষ্ঠায়, তাফসীরে কবীর ৩য় খন্ডের ৩৯৫ পৃষ্ঠায়, তাফসীরে খাজেন ১ম খন্ডের ৪৪৭পৃষ্ঠায়, তাফসীরে আবু সাউদ ৪র্থ খন্ডের ৩৬ পৃষ্ঠায়, তাফসীরে বায়যাভী, তাফসীরে রূহুল মা‘আনী, তাফসীরে রূহুল বয়ান ২য় খণ্ডের ২৬৯পৃষ্ঠায় সহ সকল নির্ভরযোগ্য তাফসীরের ব্যাখ্যা মতে আয়াতে বর্ণিত ‘নূর দ্বারা হুযুর পাক সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে বুঝানো হয়েছে। এসব আয়াত শরীফে সৃষ্টিকূল সর্দার হুজুরে আনওয়ার সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামার শুভাগমন অর্থাৎ তাঁর বরকতময় মীলাদ এর বিবরণ রয়েছে। এতে প্রতীয়মান হয় যে, বরকতময় মীলাদ’র উৎস পবিত্র কোরআন থেকেই প্রমাণিত।

সাত.সামান্য জাগতিক নেয়ামত লাভ করলেও তার জন্য ঈদ উৎসব করার সরাসরি উদাহরণ আমরা আল-কোরআনে দেখতে পাই।

قد جائکم من اللہ نور وکتاب مبین

            অর্থাৎ ঈসা ইবনে মারয়াম আলাইহিস্ সালাম বললেন, হে আল্লাহ্, হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদের জন্য আকাশ থেকে খাদ্য ভর্তি খাঞ্ছা অবতরণ করুন, যা আমাদের ও আমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলের জন্য হবে ঈদ তথা আনন্দ উৎসব আর আপনার তরফ থেকে অন্যতম নিদর্শন এবং আপনি আমাদের জীবিকা দান করুন। আর আপনিতো সর্বোত্তম জীবিকা দানকারী। [সূরা মায়েদাহ্, আয়াত-১১৪]

            এ আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহ্ তায়ালার পক্ষ থেকে খাঞ্ছা ভরা খাদ্য আসলে তা যদি হযরত ঈসা আলাইহিস্ সালামের ভাষায় সৃষ্টির আদি হতে অন্ত পর্যন্ত সকলের জন্য আনন্দ-উৎসবের উসিলা ও আল্লাহর নিদর্শন হয়, তাহলে আকা ও মাওলা রাহমাতুল্লিল আলামীন সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর মত মহান নেয়ামত এর শুভাগমনের দিন-মাস কতই না মর্যাদাবান, গুরুত্ববহ ও আনন্দ-উৎসবের দিন, যা বলার অপেক্ষা রাখে না।

আট. আল্লাহ্ তায়ালা এরশাদ করেন-

قال عیسی ابن مریم اللہم ربنا انزل علینا مائدۃ من السماء تکون لنا عیدًا لاوّلنا واخرنا وایۃ منک وارزقنا وانت خیر الرازقین

অর্থাৎ  এবং তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরো সবাই মিলে। আর পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না এবং নিজেদের উপর আল্লাহর অনুগ্রহকে স্মরণ করো যখন তোমরা একে অপরের শত্র“ ছিলে, তিনি তোমাদের অন্তরগুলোতে সম্প্রীতি সৃষ্টি করে দিয়েছেন। সুতরাং তাঁর অনুগ্রহক্রমে তোমরা পরস্পর ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে গেছ এবং তোমরা দোযখের গর্তের প্রান্তে পৌঁছে গিয়ে ছিলে, তখন তিনি তোমাদেরকে তা হতে রক্ষা করেছেন। আল্লাহ্ তোমাদের নিকট এভাবেই স্বীয় নিদর্শনাদি বর্ণনা করেন; যাতে তোমরা হিদায়ত প্রাপ্ত হও।’’ [সূরা আলে ইমরান, আয়াত-১০৩]

            এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম বায়যাভী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি বলেন-

واعتصموا بحبل اللہ جمیعا ولا تفرقوا واذکروا نعمۃ اللہ علیکم اذکنتم اعداء فالف بین قلوبکم فاصبحتم بنعمتہ اخوانا وکنتم علی شفاخقرۃ من النار فانقذکم منہا کذالک یبین اللہ لکم اٰیتہ لعلکم تہتدون

            বণির্ত আছে যে, আউস ও খাযরাজ উভয়ে বৈমাত্রেয় ভাই সম্পর্কিয় গোত্র ছিল। তাদের উভয়ের সন্তান-সন্তুতিদের মধ্যে একশ বিশ বছর যাবত দীর্ঘকাল যুদ্ধ অব্যাহত ছিল। নবীকুল সর্দার হুজুরে আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম তাদের মধ্যে ঈমানের মাধ্যমে বন্ধুত্ব সৃষ্টি করে দিয়েছেন এবং আল্লাহ্ ইসলামের মাধ্যমে তাদের মধ্যে যুদ্ধের আগুন নিভিয়ে দিয়েছেন।

[তাফসীরে বায়যাভী, সূরা আলে ইমরান-৮৪পৃ.]

            পবিত্র কোরআনের নিয়া’মাতুল্লাহ’ এর তাফসীর করতে গিয়ে ইমাম বুখারী রহমাতুল্লাহি আলায়হি হযরত ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুমা সূত্রে বর্ণনা করেন-

قیل کان الاوس والحزروج اخوین لابوین فوقع بین اولادہم العدواۃ وتطاولت الحروب ماءۃ وعشرین سنۃ حتی اطفأ بالاسلام والّف بینہم رسولہ صلی اللہ علیہ وسلم (التفسیر للبیضاوی سورۃ اٰل عمران ص ۸۴)

            হযরত ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু হতে বর্ণিত, যারা আল্লাহর নিয়ামতকে পরিবর্তন করেছে’ এ আয়াতের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন ‘আল্লাহর নিয়ামত হলেন- সরওয়ারে কায়েনাত সায়্যিদুল মুরসালীন সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম।

[বুখারী ২য় খণ্ড, কিতাবুল মাগাযী, পৃষ্ঠা নং-৫৬৬]

নয়. আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা‘আলা এরশাদ করেন-

عن ابن عباس رضی اللہ عنہ فی تفسیر الذین بدلوا نعمۃ اللہ کفرًا الایۃ قال ……ومحمد صلی اللہ علیہ وسلم نعمۃ اللہ (کتاب المغازی للبخاری ج ۲ ص ۵۶۶)

            অর্থাৎ এবং তাদেরকে আল্লাহর দিবসসমূহ স্মরণ করিয়ে দাও, নিশ্চয় সেটার মধ্যে নিদর্শনাদি রয়েছে প্রত্যেক ধৈর্য্যশীল, কৃতজ্ঞ বান্দাদের জন্য।

[সূলা ইব্রাহীম, আয়াত-৫]

            উপরোক্ত আয়াতে করিমায় বিশেষ বিশেষ আল্লাহর নেয়ামত ও ঘটনাসমূহ অবতীর্ণের দিবসগুলোকে ‘আইয়্যামিল্লাহ্’ তথা ‘আল্লাহর বিশেষ দিবস’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে এবং উক্ত বিশেষ দিবসগুলোকে বিশেষভাবে স্মরণ করার জন্য আদেশ প্রদান করা হয়েছে। উল্লেখ্য যে, এ ধরাবুকে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র শুভাগমনের দিবসের চেয়ে সর্বোত্তম বিশেষ পূণ্যময় দিবস আর কোনটি হতে পারে? যেমন- আলহাবী লিল ফতোয়ায় ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ুতী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি বর্ণনা করেছেন-

وذکّرہم بِاَیَّامِ اللّٰہِ اِنَّ فِی ذٰلِکَ لِاٰیَاتِ لِکُلِّ صَبَّارٍ شَکُوْر

            অর্থাৎ এ মহান রহমতের নবী হুযূর পাক সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামার পৃথিবীর বুকে আগমন করার চেয়ে অন্য কোন অনুগ্রহ ও নেয়ামত সর্বোত্তম অনুগ্রহ বা নেয়ামত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে? অর্থাৎ কখনো হতে পারে না।

            এ ধরনের আরো বহু আয়াতে করিমায় আল্লাহ্ তায়ালা সরকারে দো‘আলম নূরে মুজাস্সাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র মিলাদ তথা পৃথিবীর বুকে তাঁর শুভাগমন ও শুভ পদার্পণ করাকে সম্মান ও মর্যাদা সহকারে তার অসংখ্য গুণাবলী ও আল্লাহ্ প্রদত্ত শান-মানসহ বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। আশেকে রাসূল ঈমানদার পাঠকগণের অবগতি এবং বিভ্রান্তকারীদের বিভ্রান্তি নিরসনের জন্য কয়েকটি আয়াতে করিমা উল্লেখ করা হয়েছে।

            উপরোক্ত আয়াতে করিমার আলোকে সুস্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, ধরাবুকে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র শুভাগমন মহান আল্লাহর এক মহান তথা সর্বোত্তম নেয়ামত ও সর্বশ্রেষ্ঠ অনুগ্রহ। উক্ত মহান অনুগ্রহকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করার জন্য পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামার মাধ্যমে প্রিয়নবীর শুভাগমনের ক্ষণ, মুহূর্ত, দিন ও মাসকে স্মরণ করা ইসলামী শরীয়তের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, পুণ্যময় আমল, ইসলামী ঐতিহ্য-ধর্মীয় সংস্কৃতি যা যুগ যুগ ধরে চলে আসা ছলফে সালেহীন ও বুযুর্গানে দ্বীনের প্রচলিত নীতি, বিশ্ববরেণ্য ফোকাহায়ে কেরামের দৃষ্টিতে মুস্তাহাব ও অনেক সাওয়াবজনক ইবাদত এবং পবিত্র কোরআনের অসংখ্য আয়াতে করিমার উপর বাস্তব আমল। সর্বোপরি সুন্নাতে মালাইকাহ্ ও সুন্নাতে ইলাহী, যেহেতু মহান প্রভু প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামার ধরাবুকে আগমনের অনেক অনেক পূর্বে আলমে আরওয়াহ্ তথা ঊর্ধ্ব ও আত্মার জগতে সম্মানিত নবীগণের আত্মাসমূহকে একত্রিত করতঃ ধরাবুকে সর্বশ্রেষ্ঠ রসূলের শুভাগমনের ঘটনা উল্লেখ পূর্বক সকল নবী-রাসূলের রূহ মোবারকসমূহের সামনে আমাদের প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর শ্রেষ্ঠত্ব, শান-মান ও বিশাল মর্যাদার কথা তুলে ধরেছেন, যা পবিত্র কোরআনে করীম দ্বারা প্রমাণিত। সুতরাং যে সব বদ নসিব, বে আদব ও হতভাগা মাহে রবিউল আউয়ালে অনুষ্ঠিত পবিত্র জশনে জুলুসে ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম, মাহফিলে মিলাদ, সেমিনার, আলোচনা সভা, মিলাদ-কেয়াম, সালাত-সালাত, দোয়া-মুনাজাত, আল্লাহর দরবারে শুকর আদায়ের জন্য খানা-পিনা ও তবাররুকাতের আয়োজনকে কটাক্ষ ও তুচ্ছ করে বলে বেড়ায় এ কোন্ ঈদ আবার? তাদের উদ্দেশ্যে এতটুকুই বলতে হবে আর কত দিন সরলপ্রাণ মুসলমানকে ধোকা দিবে? উপরোক্ত কোরআনে করিমের আয়াত, তাফসিরসহ বুঝার চেষ্টা কর। নসিবে হেদায়ত থাকলে অবশ্যই বুঝতে সক্ষম হবে যে প্রিয় নবীর শুভাগমনের মাস মাহে রবিউল আউয়াল মাসে হামদ নাত ও জিকির আযকারের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম মূলত সকল ঈদের সেরা ঈদ। যেহেতু আরফা দিবসের ঈদ, জুমা দিবসের ঈদ, শবে বরাত, শবে কদর, ঈমান, ইসলামসহ সকল নিয়ামত ও ইবাদত ঈদে মিলাদুন্নবীর ওসীলায় পাওয়া গেছে। প্রিয় রাসূলের শুভাগমন এ ধরা বুকে না এলে কোন ইবাদতের এবং কোন ঈদের অস্তিত্বই হত না।

শেয়ার
  •  
  •  
  •  
  •