আহলে হাদীস নামধারী ভ্রান্ত ও লা-মাযহাবীদের খন্ডন (পর্ব-7)

0

এ মাসআলার বিপক্ষে আনীত আপত্তিসমূহ ও সেগুলোর খন্ডন==========
এ পর্যন্ত আমরা ‘গায়র মুক্বাল্লিদ’ (লা-মাযহাবী)দের দিক থেকে এ মাসআলায় যেসব আপত্তি শুনেছি, সেগুলোর উল্লেখ খন্ডনসহকারে বিস্তারিতভাবে করার প্রয়াস পাচ্ছি।

আপত্তি নম্বর-১
‘আ-মী-ন’ দো‘আ নয়। সুতরাং যদি এটাকে উচ্চস্বরে বলা হয়, তবে ক্ষতি কি? মহান রবতো দো‘আ নি¤œস্বরে করতে নির্দেশ দিয়েছেন; অন্য কোন যিক্রের বেলায় এ নির্দেশ দেন নি!

খন্ডন
‘আ-মী-ন’ তো দো‘আই। এটা যে দো‘আ, তা ক্বোরআন শরীফ থেকে প্রমাণিত হয়। দেখুন হযরত মূসা আলায়হিস্ সালাম আল্লাহ্ তা‘আলার দরবারে দো‘আ করেছেন-
رَبَّنَا اطْمِسْ عَلىٰ أَمْوَالِهِمْ وَاشْدُدْ عَلَىٰ قُلُوبِهِمْ فَلَا يُؤْمِنُوا حَتّىٰ يَرَوُا الْعَذَابَ الْأَلِيمَ ﴿٨٨﴾
তরজমা: হে আমাদের রব, তাদের সম্পদ বিনষ্ট করে দাও এবং তাদের হৃদয়কে কঠোর করে দাও যেন তারা ঈমান না আনে যতক্ষণ পর্যন্ত বেদনাদায়ক শাস্তি দেখে নেয়। [সূরা ইয়ূনুস: আয়াত-৮৮, তরজমা: কান্যুল ঈমান] [উল্লেখ্য, হযরত মুসা আলায়হিস্ সালাম দো‘আ করেছিলেন আর হযরত হারূন আলায়হিস্ সালাম ‘আ-মী-ন’ (হে আল্লাহ্ ক্ববূল করো) বলেছিলেন। -তাফসীর নূরুল ইরফান]

মহান রব উভয়ের দো‘আ কবুল করেছেন। আর তিনি এরশাদ করেছেন-
قَالَ قَدْ أُجِيبَتْ دَّعْوَتُكُمَا فَاسْتَقِيمَا وَلَا تَتَّبِعَانِّ سَبِيلَ الَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ ﴿٨৯﴾
তরজমা: তিনি (মহান রব) বললেন, ‘তোমরা দু’জনের প্রার্থনা ক্ববূল হয়েছে। সুতরাং তোমরা দৃঢ় থাকো এবং অজ্ঞদের সাথে চলোনা।’ [প্রাগুক্ত: আয়াত-৮৯]

লক্ষ্য করুন! দো‘আ তো করেছিলেন শুধু হযরত মূসা আলায়হিস্ সালাম; কিন্তু মহান রব বলেছেন, ‘‘তোমরা উভয়ের দো‘আ কবূল হয়েছে। অর্থাৎ তোমার ও হযরত হারূন (আলায়হিমাস্ সালাম)-এর। হযরত হারূন দো‘আ কখন করলেন? এর কারণ এ ছিলো যে, তিনি হযরত মূসা আলায়হিস্ সালাম-এর দো‘আর উপর ‘আ-মী-ন’ বলেছিলেন। মহান রব ‘আ-মী-ন’কে দো‘আ বলেছেন। বুঝা গেলো যে, ‘আ-মী-ন’ দো‘আই। আর দো‘আ নি¤œস্বরে হওয়া চাই। এটা ক্বোরআন-ই করীমের মাসআলাগুলোর অন্যতম।

আপত্তি নম্বর -২
তিরমিযী শরীফে হযরত ওয়া-ইল ইবনে হুজর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত-
قَالَ سَمِعْتُ النَّبِىَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَرَأَ غَيْرِ الْمَغْضُوْبِ عَلَيْهِمْ وَلاَ الضَّالِّيْنَ وَقَالَ آمِيْنَ وَمَدَّ بِهَا صَوْتَه
অর্থাৎ আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে (এভাবে পড়তে) শুনেছি-‘গায়রিল মাগদ্বূ-বি আলায়হিম ওয়ালাদ্ব্ দ্বোয়া—-ল্লী-ন।’ আর ‘আ-মী-ন’ বলেছেন এবং আওয়াজকে এটা বলার সময় উঁচু করেছেন।

খন্ডন
হে লা-মাযহাবীরা, আপনারা হাদীস শরীফটার ভুল অনুবাদ করেছেন, তাতে مَدَّ (মাদ্দা) এরশাদ হয়েছে। مَدَّ (মাদ্দা) مَدٌّ (মাদ্দুন) থেকে গঠিত। এর অর্থ উঁচু করা নয়; বরং আওয়াজকে টেনে পাঠ করা। মর্মার্থ এ দাঁড়ালো যে, হুযূর-ই আক্রাম ‘আ-মী-ন’ কে ‘কারীম’ শব্দের সমুচ্চারিত করে ক্বসর করে (না টেনে) বলেননি, বরং ‘ক্বা-লী-ন’ (قالين)-এর মতো ‘আ-মী-ন’-এর (الف) (আলিফ) ও ‘م’ (মীম)-কে খুব দীর্ঘ করে (টেনে) পড়েছেন। সুতরাং উপরিউক্ত বর্ণনায় (হাদীসে) আপনাদের পক্ষে কোন প্রমাণ নেই; বরং আপনাদের অনুবাদে ত্রুটিই রয়েছে। স্মর্তব্য যে, مَدَّ (মাদ্দ্)-এর বিপরীতার্থক শব্দ হচ্ছে- قَصْرٌ (ক্বসর)। যেভাবে خِفاء (নি¤œস্বরে বলা)’র বিপরীতার্থক শব্দ হচ্ছে جَهْرٌ (উচ্চস্বরে বলা)। অনুরূপ, رفع (উঁচু করা)-এর বিপরীতার্থক শব্দ হচ্ছে- خفض (নিচু করা)। যদি এখানে جهر (জাহর বা উঁচু স্বরে বলা) উল্লেখ করা হতো, তাহলে আপনাদের দলীল শুদ্ধ হতো। অথচ جهر (জাহ্র) কোন রেওয়ায়তে নেই। মহান রব এরশাদ ফরমাচ্ছেন- اِنَّه يَعْلَمُ الْجَهْرَ وَمَا يَخْفى (তরজমা: নিশ্চয় তিনি জানেন প্রত্যেক ‘প্রকাশ্য’ এবং ‘অপ্রকাশ্যকে’ও। [সূরা আ’লা: আয়াত: ৭] দেখুন, এখানে ‘خفاء (নি¤œস্বরে বলা)’র বিপরীতে جهر (উচুঁস্বরে বলা) এরশাদ করেছেন; مَدَّ বলেননি।

আপত্তি নম্বর-৩
আবূ দাঊদ শরীফে হযরত ওয়াইল ইবনে হুজর থেকে বর্ণিত-
قَالَ كَانَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيهِ وَسَلَّمَ اِذَا قَرَأَ
وَلاَالضَّالِّيْنَ قَالَ آمِيْنَ وَرَفَعَ بَهَاصَوْتَه
অর্থ তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম যখন বলতেন, ‘ওয়ালাদ্ব্ দ্বোয়া—-ল্লী-ন’ তখন বলতেন, ‘আ-মী-ন’। আর তাতে আওয়াজ শরীফকে উঁচু করতেন।
এখানে رَفَعَ বলেছেন, যার অর্থ ‘উঁচু করেছেন’। বুঝা গেলো যে, ‘আ-মী-ন’ উঁচু আওয়াজে বলা সুন্নাত।

খন্ডন
এর কয়েকটা জবাব দেওয়া যায়:
এক. হযরত ওয়াইল ইবনে হুজরের মূল রেওয়াতে আছে مَدَّ (মাদ্দা); যেমনটি তিরমিযী শরীফে বর্ণিত হয়েছে। এর অর্থ টেনে পড়া, উঁচু করা নয়। উল্লিখিত হাদীসের সনদে কোন বর্ণনাকারী روايت بالمعنى (নিজস্ব ব্যাখ্যা সম্বলিত বর্ণনা) করেছেন। তিনি مَدَّ কে رَفَعَ দ্বারা ব্যক্ত করেছেন। তবুও অর্থ হবে ওই ‘টেনে পড়া’; উঁচু করা নয়। روايت بالمعنى (নিজস্ব ব্যাখ্যা সম্বলিত বর্ণনা)’র সাধারণ প্রচলন তখনো ছিলো।

দুই. তিরমিযী ও আবূ দাঊদের বর্ণনায় ‘নামাযের মধ্যে’ (এমনটি পড়তেন) বলে উল্লেখ করা হয়নি; বরং শুধু হুযূর-ই আক্রামের ‘ক্বিরআত’ (পড়া)’র উল্লেখ রয়েছে। সম্ভবত নামায ব্যতীত নামাযের বাইরে অন্য সময়ের ক্বিরআতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু যে বর্ণনাগুলো (প্রথম পরিচ্ছেদে) আমি পেশ করেছি, সেগুলোতে নামাযের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সুতরাং হাদীসগুলোতে কোন দ্বন্দ্ব (স্ব-বিরোধিতা) নেই। আর বিরুদ্ধবাদীদের উত্থাপিত হাদীসগুলোও আমাদের বিরোধী নয়।

তিন. উচ্চস্বরে ‘আ-মী-ন’ বলা এবং নি¤œস্বরে ‘আ-মী-ন’ বলার বর্ণনা সম্বলিত রেওয়াত (হাদীস শরীফ)গুলোর মধ্যে পরস্পর বিরোধিতা রয়েছে। এমতাবস্থায় উচ্চস্বরে ‘আ-মী-ন’ বলার বর্ণনাগুলো অনুসারে আমল করা যাবেনা; কারণ ওইগুলো ক্বোরআন মজীদের বিরোধী। আর নি¤œস্বরে বলার পক্ষে বর্ণিত হাদীস শরীফগুলো ক্বোরআন শরীফের অনুরূপ। তাই ওইগুলো অনুসারে আমল করা ওয়াজিব (অপরিহার্য)।

চার. নি¤œস্বরে ‘আ-মী-ন’ বলার হাদীসগুলো ‘ক্বিয়াস-ই শর‘ঈ’ (শরীয়তসম্মত ক্বিয়াস)-এর অনুরূপ। আর উচ্চস্বরে বলার হাদীসগুলো সেটার পরিপন্থি। সুতরাং নি¤œস্বরে ‘আ-মী-ন’ বলার হাদীসগুলো অনুসারে আমল করার উপযোগী; এর পরিপন্থি বর্ণনাগুলো আমলযোগ্য নয়।

পাঁচ. উচ্চস্বরে ‘আ-মী-ন’ বলার হাদীস শরীফগুলো পবিত্র ক্বোরআন ও ওইসব হাদীস শরীফ দ্বারা, ‘মানসূখ’ (রহিত), যেগুলো আমি (প্রথম পরিচ্ছেদে) পেশ করেছি। এ কারণে সাহাবা-ই কেরাম সবসময় ‘আ-মী-ন’ নীরবে বলতেন। এবং নি¤œস্বরে বলার নির্দেশ দিতেন; উচ্চস্বরে ‘আ-মী-ন’ বলতে নিষেধ করতেন; যেমনটি প্রথম পরিচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে। যদি উচ্চস্বরে ‘আ-মী-ন’ বলার হাদীসগুলো ‘মানসূখ’ (রহিত) না হতো, তাহলে সাহাবা-ই কেরাম ওই আমল কেন ছেড়ে দিয়েছেন?

আপত্তি নম্বর- ৪
ইবনে মাজাহ্য় হযরত আবূ হোরায়রাহ্ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত,
كَانَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيهِ وَسَلَّمَ اِذَا قَالَ غَيْرِ الْمَغْضُوْبِ عَلَيهِمْ وَلاَ الضَّالِّيْنَ قَالَ آمِيينَ حَتّى يَسْمَعَهَا اَهْلُ الصَّفِّ الْاَوَّلِ فَيَرْتَجُّ بِهَا الْمَسْجِدُ ـ অর্থ হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম যখন ‘গায়রিল মাগদ্বূ-বি ‘আলায়হিম ওয়ালাদ্ব্ দ্বোয়া—-ল্লী-ন’ বলতেন, তখন ‘আ-মী-ন’ বলতেন, এমনকি প্রথম কাতারের মুসল্লিগণ তা শুনতে পেতেন, অতঃপর পূর্ণ মসজিদে তা ধ্বনিত হতো।

এ হাদীসে তো কোন প্রকার ভিন্ন ব্যাখ্যা (তা’ভীল)-এর প্রয়োজন নেই। এতে তো গোটা মসজিদ শরীফে ধ্বনিত হবার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। উচ্চস্বর ব্যতীত ধ্বনিত হয় না।

খন্ডন
এ আপত্তির কয়েকটা জবাব রয়েছেঃ
প্রথমত: হে লা-মাযহাবীরা, আপনারা তো পূর্ণ হাদীস উল্লেখ করেননি, হাদীসের প্রথমাংশ ছেড়ে দিয়েছেন। আর তা হচ্ছে-
عَنْ اَبِىْ هُرَيْرَةَ قَالَ تَرَكَ النَّاسُ التَّامِيْنَ وَكَانَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ …الخـ
অর্থ: হযরত আবূ হোরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, লোকেরা ‘আ-মী-ন’ বলা ছেড়ে দিয়েছে; অথচ হুযূর করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম…।

এ বাক্য শরীফ থেকে বুঝা গেলো যে। আম সাহাবা-ই কেরাম উচ্চস্বরে ‘আ-মী-ন’ বলা ছেড়ে দিয়েছিলেন; যা হযরত আবূ হোরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু অভিযোগ আকারে উপস্থাপন করছেন। বস্তুত: সাহাবা-ই কেরাম হাদীস শরীফের উপর আমল ছেড়ে দেওয়া ওই হাদীস শরীফ মান্সূখ হয়ে যাবার প্রমাণবহ। এ হাদীস শরীফ তো আমাদের সমর্থন করছে, হে বিরুদ্ধবাদীরা, আপনাদের না।

দ্বিতীয়ত: যদি এ হাদীস শরীফকে সহীহ্ও মেনে নেওয়া হয়, তবুও তা যুক্তি ও বাস্তব দৃশ্যের পরিপন্থী। আর যে হাদীস শরীফ যুক্তি ও বাস্তব দৃশ্যের পরিপন্থী হয়, তা আমলযোগ্য নয়; বিশেষ করে যখন সমস্ত প্রসিদ্ধ (মাশহুর) হাদীস ও ক্বোরআনের আয়াতসমূহের পরিপন্থী হয়।

কেননা, এ হাদীস শরীফে মসজিদ ধ্বনিত হবার কথা উল্লেখ করা হয়েছে; অথচ গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদে প্রতিধ্বনি সৃষ্টি হয়, ছাদবিশিষ্ট মসজিদে এমনটি হয় না। হুযূর-ই আন্ওয়ার সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর মসজিদ শরীফ তাঁর পবিত্র যুগে (জীবদ্দশায়) মা’মূলী ছাদবিশিষ্ট ছিলো। ওখানে প্রতিধ্বনি সৃষ্টিই বা কিভাবে হতে পারতো? আজ কোন গায়র মুক্বাল্লিদ কোন ছাদ বিশিষ্ট ঘরে শোর-চিৎকার করে প্রতিধ্বনি করে দেখাক! ইনশা-আল্লাহ্, চিৎকার করতে করতে মারা যাবে, কিন্তু প্রতিধ্বনি সৃষ্টি হবে না। এ আপত্তির অবশিষ্ট অংশের জবাব হবে তা-ই, যা আপত্তি নং-৩-এর জবাবে বলা হয়েছে।

তৃতীয়ত: এ হাদীস শরীফ ক্বোরআন-ই করীমেরও অনুরূপ নয়। মহান রব এরশাদ ফরমাচ্ছেন- …لاَ تَرْفَعُوْا اَصْوَاتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ النَّبِىِّ (তরজমা: হে ঈমানদারগণ, নিজেদের কণ্ঠস্বরকে উঁচু করোনা ওই অদৃশ্যের সংবাদদাতা (নবী)’র কণ্ঠস্বর থেকে…। [সূরা হুজুরাত: আয়াত-২, কান্যুল ঈমান]

যদি সাহাবীগণ এত উঁচু আওয়াজে আ-মী-ন বলে থাকেন যে, মসজিদে তা প্রতিধ্বনিত হয়ে গিয়েছিলো, তবে তো তাঁদের আওয়াজ হুযূর-ই আক্রামের আওয়াজ শরীফ থেকে উঁচু হয়ে গিয়েছিলো। এটা ক্বোরআন-ই করীমের প্রকাশ্য বিরোধিতা হলো। বস্তুত: যে হাদীস শরীফ ক্বোরআন-ই করীমের পরিপন্থী হয়, তা আমল করার মত নয়।

আপত্তি নম্বর- ৫
বোখারী শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে-
فَقَالَ عَطَآءٌ آمِيْنْ دُعَآءٌ أَمَّنَ اِبْنُ الزُّبَيرِ وَمَنْ وَّ رَآئَه حَتّى اَنَّ فِى الْمَسْجِدِ لُجَّةً
অর্থাৎ হযরত আত্বা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেন, ‘আ-মী-ন’ একটি দো‘আ। আর হযরত ইবনে যোবায়র ও তাঁর পেছনে যাঁরা ছিলেন তাঁরা ‘আ-মী-ন’ বলেছেন। এমনকি মসজিদে প্রতিধ্বনি সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিলো।
এ হাদীস শরীফ থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হলো যে, ‘আ-মী-ন’ এত জোরে চিৎকার করে বলা দরকার, যাতে মসজিদ ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়ে যায়।

খন্ডন
এ আপত্তির কতিপয় জবাব দেওয়া যায়ঃ
এক. এ হাদীস শরীফের প্রথম বাক্য আমাদের (হানাফী মাযহাব)-এর অনুরূপ। অর্থাৎ ‘আ-মী-ন’ দো‘আ। আর ক্বোরআন-ই করীমে এরশাদ হয়েছে, ‘দো‘আ নিম্বস্বরে করো।’ ‘প্রথম পরিচ্ছেদ’-এ দেখুন।

দুই. এ হাদীসে নামাযের উল্লেখ নেই। জানিনা, নামাযের বাইরে এ তিলাওয়াত হয়েছিলো, না নামাযের অভ্যন্তরে। প্রকাশ তো এটাই হলো যে, হয়তো এটা নামাযের বাইরে সম্পন্ন হয়েছিলো, যাতে ওই সব হাদীসের বিরোধী না হয়, যেগুলো আমরা পেশ করেছি। এবং

তিন. এ হাদীস শরীফ যুক্তি ও বাস্তব দর্শনেরও পরিপন্থী; কেননা, কাঁচা ছাদবিশিষ্ট মসজিদে প্রতিধ্বনি সৃষ্টি হতে পারে না। সুতরাং এটার ভিন্ন ব্যাখ্যা (তা’ভীল) অপরিহার্য (ওয়াজিব)। আরে জনাব! যদি ক্বোরআন মজীদের কোন আয়াতও ‘আক্বলে শর‘ঈ’ (শরীয়ত সমর্থিত যুক্তি) ও বাস্তবাবস্থার পরিপন্থী হয়, তবে ওখানেও তা’ভীল করা ওয়াজিব হয়ে যায়। অন্যথায় ‘কুফর’ হওয়া অনিবার্য হয়ে যায়। ‘আয়াত-ই সিফাত’ (আল্লাহর গুণাবলীর আয়াতগুলো)কে ‘মুতাশা-বিহ্’ (দ্ব্যর্থবোধক) হিসেবে ধরে নিয়ে আমরা শুধু ঈমান আনি; সেগুলোর প্রকাশ্য অর্থ গ্রহণ করি না। কেননা, সেগুলোর প্রকাশ্য অর্থ শরীয়তসম্মত যুক্তির বিরোধী। যেমন- يَدُ اللهِ فَوْقَ اَيْدِيْهِمْ তরজমা: তাদের হাতগুলোর উপর আল্লাহর হাত (দয়া) রয়েছে। [সূরা ফাত্হ্: আয়াত-১০]

فَاَيْنَمَا تُوَلُّوْا فَثَمَّ وَجْهُ اللهِ তরজমা: তোমরা যে দিকে ফিরবে সেদিকেই আল্লাহর চেহারা (ক্বেবলা)। [সূরা বাক্বারা: আয়াত-১১৫] আল্লাহ্ তা‘আলার জন্য হাত-মুখ থাকা যুক্তি (বিবেক-বুদ্ধি)’র বাইরে।
সুতরাং এ আয়াতাংশ দু’টির তা’ভীল বা ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া ওয়াজিব। মহান রব এরশাদ ফরমাচ্ছেন- وَجَدَهَا تَغْرُبُ فِىْ عَيْنٍ حَمِئَةٍ অর্থাৎ যুলক্বারনাঈন সূর্যকে কালো কাদাময় জলাশয়ে অস্ত যেতে দেখতে পেলো।
[সূরা কাহ্ফ: আয়াত-৮৬]

সূর্য অস্তমিত হবার সময় আসমান থেকে নেমে আসা এবং কাদাময় জলাশয়ে অস্ত যাওয়া যুক্তিগ্রাহ্য ছিলো না। সুতরাং সেটার তা’ভীল করা হয়। এ তা’ভীল ‘হাশিয়াতুল ক্বোরআন’-এ দেখুন। বস্তুত: হাদীস পড়া এক জিনিষ, হাদীস বুঝা অন্য জিনিষ।

সারকথা হলো এমন কোন ‘সহীহ্’, মারফূ’ হাদীস পাওয়া যায়নি, যাবেও না। যাতে নামাযে ‘আ-মী-ন’ উচ্চস্বরে বলার পক্ষে স্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে। এমন সহীহ্ হাদীস পাওয়া যায়নি; পাওয়া যাবেও না, তাই ওহাবী, লা-মাযহাবীদের উচিৎ জেদ (হঠকারিতা) পরিহার করা এবং সত্য অন্তরে ইমাম-ই আ’যম আবূ হানীফা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর দামন (আঁচল) ধরা। তিনি যা বলেছেন, ‘তা-ই হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামের প্রদর্শিত সরল-সঠিক পথ। এ মাসআলার আরো অধিক গবেষণাধর্মী বর্ণনা দেখতে চাইলে ‘হাশিয়া-ই বোখারী’ (আরবী) দেখুন।

আপত্তি নম্বর-৬
নি¤œস্বরে ‘আ-মী-ন’ বলার প্রসঙ্গে, হে হানাফী-সুন্নীরা, আপনারা যেসব হাদীস শরীফ পেশ করেছেন, ওইসব হাদীস দ্ব‘ঈফ বা দুর্বল। আর দুর্বল হাদীস থেকে দলীল গ্রহণ ও দলীল হিসেবে পেশ করা যায়না। (উল্লেখ্য, এটা ওহাবীদের পুরানা সবক, যা তারা মুখস্থ করে আওড়িয়ে আসছে। তারা আরো বলছে-) দেখুন, হযরত ওয়াইল ইবনে হুজর থেকে বর্ণিত ও তিরমিযী শরীফে উদ্ধৃত রেওয়াতে (হাদীস শরীফ) যা আপনারা পেশ করেছেন, সেটা সম্পর্কে ইমাম তিরমিযী নিজেই বলেছেন-
حَدِيْثُ سُفْيَانَ اَصَحُّ مِنْ حَدِيْثِ شُعْبَةَ فِىْ هذَا اِلى اَنْ وَقَالَ وَخَفَضَ بِهَا صَوْتَه وَاِنَّمَا هُوَ مَدَّ بِهَا صَوْتَه
অর্থ: ‘আ-মী-ন’ বলা সম্পর্কে সুফিয়ানের হাদীস শো’বাহ্র হাদীস অপেক্ষা বেশী সহীহ্। শো’বাহ্ এখানে বলেছেন, ‘খাফাদ্বা’, অর্থাৎ হুযূর-ই আক্রাম নিম্বস্বরে বলেছেন, অথচ এখানে مد (মদ্দা) আছে। অর্থাৎ আওয়াজকে টেনে ‘আ-মী-ন’ বলেছেন।

খন্ডন
আল্লাহ্ তা‘আলার শোকর যে, আপনারা আপনাদের এ বক্তব্যে অন্তত ‘মুক্বাল্লিদ’ তো হয়েছেন ইমাম-ই আ’যমের না হলেও, ইমাম তিরমিযীর, আর দেখা যাচ্ছে যে কোন সমালোচনা চোখ বন্ধ করে মেনে নিচ্ছেন! ওহে জনাব, ওই হাদীসের দুর্বলতার মূল কারণ হচ্ছে- এটা আপনাদের মতের বিপক্ষে। যদি সেটা আপনাদের পক্ষের হতো, তাহলে আপনারা সেটা চোখ বন্ধ করে মেনে নিতেন! আপনাদের এ আপত্তির কয়েকটা জবাব হতে পারেঃ

এক. আমরা ‘আ-মী-ন’ নি¤œস্বরে বলার পক্ষে ২৬ (ছাব্বিশ)টি ‘সনদ’ বা সূত্র পেশ করেছি। ওইগুলোর সব-ক’টিই কি দুর্বল? আর সব ক’টিতে কি শো’বাহ্ রাভী (বর্ণনাকারী) আসছেন? আর শো’বাহ্ কি সব জায়গায় ভুল-ত্রুটি করেছেন? এটা সম্ভবই নয়।

দুই. যদি এ ২৬টি সনদের প্রত্যেকটি (আপনাদের কথা মত) দুর্বলও হয়, তবুও সব মিলে একত্রে সবল হয়ে গেছে। যেমনটি আমি এ কিতাবের ভূমিকার উল্লেখ করেছি।

তিন. শো’বাহ্ ইমাম আবূ হানীফাহ্ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর পর সনদে শামিল হয়েছেন; যাঁর কারণে, এ হাদীস দুর্বল হয়েছে। ইমাম-ই আ’যম তো এ হাদীস একেবারে শুদ্ধরূপে পেয়েছিলেন। পরবর্তীদের দুর্বলতা পূর্ববর্তীদের বিশুদ্ধতার জন্য ক্ষতিকর নয়।

চার. যদি প্রথম থেকেই হাদীসটি দুর্বল হতো, তবুও ইমাম-ই আ’যম সিরাজুল উম্মাহ্ ইমাম আবূ হানীফাহ্ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আন্হু হাদীসটি গ্রহণ করে নেওয়ার ফলে শক্তিশালী হয়ে গেছে; যেমনটি আমি ইতোপূর্বে আরয করেছি।

পাঁচ. যেহেতু এ হাদীস শরীফ অনুসারে আম মুসলিম উম্মাহ্ আমল করে এসেছেন, সেহেতু হাদীসটির ‘দুর্বলতা’ দূরীভূত হয়ে গেছে এবং হাদীস শক্তিশালী হয়ে গেছে; যেমন আমি ভূমিকায় উল্লেখ করেছি।

ছয়. এ হাদীসকে খোদ্ ক্বোরআন-ই করীম সমর্থন করছে। পক্ষান্তরে, উচ্চস্বরে ‘আ-মী-ন’ বলার হাদীসগুলো ক্বোরআনের পরিপন্থী। সুতরাং নি¤œস্বরে ‘আ-মী-ন’ বলার পক্ষের হাদীস ক্বোরআন করীমের সমর্থনের কারণে শক্তিশালী হয়ে গেছে; যেমন আমি ভূমিকায় আরয করেছি।

সাত. এ হাদীসের সমর্থন করছে ক্বিয়াস-ই শর‘ঈও। পক্ষান্তরে, উচ্চস্বরে বলার হাদীস ‘ক্বিয়াস-ই শর‘ঈ’ ও ‘আক্বল-ই শর‘ঈ’র বিপরীত। সুতরাং নি¤œস্বরে ‘আ-মী-ন’ বলার পক্ষের হাদীসগুলো শক্তিশালী। আর উচ্চস্বরে ‘আ-মী-ন’ বলার হাদীস আমলযোগ্য নয়। মোটকথা, নিরবে আ-মী-ন বলার হাদীস অত্যন্ত শক্তিশালী। সুতরাং আমলও এগুলো অনুসারে করা চাই।

আপত্তি নম্বর- ৭
আবূ দাঊদ শরীফে হযরত আবূ হোরায়রাহ্ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে, হুযূর-ই আক্রাম যখন সূরা ফাতিহা সমাপ্ত করে নিতেন, তখন-
قَالَ آمِيْنْ حَتّى يَسْمَعَ مَنْ يَلِيْه مِنَ الصَّفِّ الْاَوَّلِ
অর্থাৎ তিনি ‘আ-মী-ন’ বলেছেন এতটুকু আওয়াজে যে, প্রথম কাতারের যিনি তাঁর নিকটে থাকতেন, তিনি শুনতে পেতেন।

খন্ডন
এর দু’টি জবাব দেওয়া যায়ঃ
এক. এ হাদীস শরীফ, হে আপত্তিকারীরা আপনাদেরও বিরোধী। কেননা, আপনাদের উপস্থাপিত রেওয়াতগুলোতে ছিলো যে, (আ-মী-ন-এর আওয়াজে) গোটা মসজিদ প্রতিধ্বনিত হতো। আর এ’তে বর্ণিত হয়েছে যে, (আ-মী-ন) বলার আওয়াজ পেছনের দু’/একজন লোক শুনতে পেতেন। ( সুতরাং এ গুলো পরস্পর বিরোধী হলো।)
দুই. এ হাদীসের সনদে বিশর ইবনে রাফি’ আসছেন। তাঁকে ইমাম তিরমিযী ‘জানা-ইয’ পর্বে, হাফেয যাহাবী ‘মীযান-এ’। অত্যন্ত দুর্বল বলেছেন। ইমাম আহমদ তাকে ‘মুনকারুল হাদীস’ বলেছেন। ইবনে মু‘ঈন তাঁর বর্ণনাকে মওদ্বূ’ (বানোয়াট) বলে সাব্যস্ত করেছেন। আর ইমাম নাসাঈ তাকে শক্তিশালী বলে মেনে নেননি। [আফ্তাব-ই মুহাম্মদী] সুতরাং এ হাদীস অতিমাত্রায় দুর্বল। তাই আমল করার মতো নয়।

শেয়ার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •