নাভীর নিচে হাত বাঁধা সুন্নাত (পুরুষের জন্য)

0

নাভীর নিচে হাত বাঁধা সুন্নাত (পুরুষের জন্য)

============

গায়র মুক্বাল্লিদ-ওহাবীরা নামাযের তাকবীর-ই তাহরীমার পর বুকের উপর, নাভীর উপরে হাত বাঁধে। এর খণ্ডনে আমি এ মাসআলার আলোচনা দু’টি পরিচ্ছেদে বিন্যস্ত করেছি। প্রথম পরিচ্ছেদে আমাদের দলীলাদি এবং দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে ওহাবী লা-মাযহাবীদের আপত্তি ও সেগুলোর জবাব (খণ্ডন) উল্লেখ করেছি।

প্রথম পরিচ্ছেদ
পুরুষগণ নামাযে নাভীর নিচে হাত বাঁধবে। এটা সুন্নাত। বুকের উপর হাত বাঁধা সুন্নাতের পরিপন্থী। এ প্রসঙ্গে অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। আমি মাত্র কয়েকটি হাদীস শরীফ উল্লেখ করার প্রয়াস পাচ্ছি।

হাদীস নম্বর – ১
عَنْ وَائِلِ بْنِ جُحْرٍ قَالَ رَأَيْتُ رَسُوْلَ اللهِ صَلَى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَضَعَ يَمِيْنَه عَلَى شِمَالِه تَحْتَ السُّرَّةِ – رَوَاهُ اِبْنُ اَبِىْ شَيْبَةَ بِمُسْنَدٍ صَحِيْحٍ وَرِجَالُه ثِقَاتٌ-
অর্থ: হযরত ওয়াইল ইবনে হুজর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘‘আমি হুযূর-ই আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে দেখেছি যে, তিনি ডান হাত মুবারক বাম হাত মুবারকের উপর রেখেছেন নাভী শরীফের নিচে।
এ হাদীস শরীফ ইবনে আবী শায়বাহ্ সহীহ্ সনদ সহকারে উদ্ধৃত করেছেন। এর সব বর্ণনাকারী নির্ভরযোগ্য।

হাদীস নম্বর – ২
ইবনে শাহীন হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন-
قَالَ ثَلَثٌ مِّنْ اَخْلَاقِ النُّبُوَّةِ تَعْجِيْلُ الْاِفْطَارِ وَتَأْخِيْرُ السُّحُوْرِ وَوَضْعُ الْكَفِّ عَلَى الْكَفِّ تَحْتَ السُّرَّةِ-
অর্থ: তিনটি কাজ নুবূওয়তের চরিত্রের অন্তর্ভুক্ত: ১. (বিলম্ব না করে) শীঘ্র ইফতার করা, ২. সাহরী দেরীতে আহার করা এবং ৩. নামাযে ডান হাত বাম হাতের উপর নাভীর নিচে রাখা।

হাদীস নম্বর- ৩
আবূ দাউদ শরীফ: ইবনে আ’রাবীর কপিতে, হযরত আবূ ওয়াইল রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত-
قَالَ اَبُوْ وَائِلٍ اَخْذُ الْكَفِّ عَلَى الْكَفِّ فِى الصَّلوةِ تَحْتَ السُّرَّةِ-
অর্থ: হযরত আবূ ওয়া-ইল রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেন- নামাযে নাভীর নিচে হাতের উপর হাত রাখা চাই।

হাদীস নম্বর -৪ ও ৫
দারু ক্বুত্ব্নী ও আবদুল্লাহ্ ইবনে আহমদ হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন-
اِنَّ مِنَ السُّنَّةِ فِى الصَّلَوةِ وَضْعِ الْكَفِّ وَفِى رَوَايَةٍ وَضْعُ الْيَمِيْنِ عَلَى الشِّمَالِ تَحْتَ السُّرَّةِ-
অর্থ: নামাযে হাতের উপর হাত রাখা, অন্য এক বর্ণনায় আছে – ডান হাত বাম হাতের উপর রাখা, নাভীর নিচে, সুন্নাত।

হাদীস নম্বর- ৬-৯
আবূ দাঊদ ইবনে আ’রাবীর কপিতে, আহমদ, দারু ক্বুত্বনী ও বায়হাক্বী হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন- اِنَّهُ قَالَ اَلسُّنَّةُ وَضْعُ الْكَفِّ عَلى الْكَفِّ تَحْتَ السُّرَّةِ-
অর্থ: নাভীর নিচে হাতের উপর হাত রাখা সুন্নাত।

হাদীস নম্বর- ১০
রাযীন হযরত আবূ হুজায়ফাহ্ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন-
اِنَّ عَلَيًّا قَالَ اًلسُّنَّةُ وَضْعُ الْكَفِّ فِى الصَّلَوةِ وَيَضَعُهُمَا تَحْتَ السُّرَّةِ-
অর্থ: হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেছেন, নামাযে হাত বাঁধা সুন্নাত। আর তিনি উভয় হাত নাভীর নিচে রাখতেন।

হাদীস – ১১
ইমাম মুহাম্মদ ‘কিতাবুল আসার শরীফ’-এ হযরত ইব্রাহীম নাখ‘ঈ থেকে বর্ণনা করেছেন-
اِنَّهُ كَانَ يَضَعُ يَدَهُ الْيُمْنٰى عَلَى يَدِهِ الْيُسْرَى تَحْتَ السُّرَّةِ-
অর্থ: তিনি নিজের ডান হাত বাম হাতের উপর নাভীর নিচে রাখতেন।

হাদীস- ১২
ইবনে আবী শায়বাহ্ হযরত ইব্রাহীম নাখ্‘ঈ থেকে বর্ণনা করেছেন-
قَالَ يَضَعُ يَمِيْنَهُ عَلَى شِمَالِهِ تَحْتَ السُّرَّةِ-
অর্থ: তিনি বলেন, তিনি আপন ডান হাত বাম হাতের উপর নাভীর নিচে রাখেন।

হাদীস- ১৩
ইবনে হাযাম হযরত আনাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন-
اِنَّهُ قَالَ مِنْ اَخْلَاقِ النُّبُوَّةِ وَضْعُ الْيَمِيْنِ عَلَى الشِّمَالِ تَحْتَ السُّرَّةِ-
অর্থ: তিনি বলেন, ডান হাত বাম হাতের উপর নাভীর নিচে রাখা নুবূওয়তের চরিত্রের অন্তর্ভুক্ত।

হাদীস- ১৪
আবূ বকর ইবনে আবী শায়বাহ্ হাজ্জাজ ইবনে হাস্সান থেকে বর্ণনা করেছেন-
قَالَ سَمِعْتُ اَبَا مُجْلَزٍ وَسَأَلْتُه قُلْتُه كَيْفَ يصْنَعُ قَالَ يَضَعُ بَاطِنَ كَفِّهِ يَمِيْنَهُ عَلَى ظَاهِرِ كَفِّ شِمَالِهِ وَيَجْعَلُهُمَا اَسْفَلَ مِنَ السُّرَّةِ- اِسْنَادُهُ جَيِّدٌ وَرُوَاتُهُ كُلُّهُمْ ثِقَاتٌ-
অর্থ: আমি আবূ মুজলাযকে জিজ্ঞাসা করেছি- তিনি নামাযে হাত কিভাবে রাখেন? তিনি বললেন, তিনি আপন ডান হাতের তালু বাম হাতের পিঠের উপর রাখেন- নাভীর নিচে। এ হাদীসের সনদ অতি উত্তম (শক্তিশালী) আর সমস্ত বর্ণনাকারী নির্ভরযোগ্য।

এ প্রসঙ্গে আরো বহু হাদীস পেশ করা যায়। এখানে শুধু চৌদ্দটা উল্লেখ করে ক্ষান্ত হলাম। এর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ দেখুন- ‘সহীহুল বিহারী’ ও ‘ফাত্হুল ক্বাদীর’-এ।

যুক্তিও চায় যে, নামাযে নাভীর নিচে হাত রাখা হোক! কেননা, গোলাম তার মুনিবের সামনে এভাবেই দণ্ডায়মান হয়। এতে চূড়ান্ত আদব রয়েছে। নামাযে যেহেতু বান্দা মহান রবের দরবারে হাযিরা দেয়, সেহেতু আদব সহকারে দণ্ডায়মান হওয়া চাই। গায়র মুক্বাল্লিদগণ (লা-মাযহাবীরা) যখন নামাযে দাঁড়ায়, তখন বুঝা যায় না যে, তারা কি মসজিদে দাঁড়িয়েছে, না বুক ফুলিয়ে দম্ভভরে (গোঁয়ারের মত) দাঁড়িয়েছে; বিনয় প্রকাশের জন্য দাঁড়িয়েছে, না কুস্তি লড়ার জন্য থুতনী উঁচিয়ে দাঁড়িয়েছে।

হে আল্লাহর বন্দারা! যখন রুকূ’তে আদব প্রকাশ করছো, সাজদায় আদব এবং ‘আত্তাহিয়্যাত’-এ আদব ও বিনয়ের বিষয়টি বিবেচনা করছো, তখন ক্বিয়ামে বুক ফুলিয়ে, থুতনী উঁচিয়ে বেয়াদবীর সাথে পলোয়ানের মতো কেন দাঁড়াচ্ছো? এখানেও নাভীর নিচে হাত বেঁধে গোলামের মতো দাঁড়াও! আল্লাহ্ তা‘আলা বুঝ শক্তি দান করুন! (এ কথা নিশ্চিতভাবে জেনে রেখো যে,) গায়র মুক্বাল্লিদ লা-মাযহাবীদের নিকট একটি মারফু’ সহীহ হাদীসও নেই। মুসলিম ও বোখারী শরীফের এ প্রসঙ্গে কোন হাদীস শরীফ তাদের নিকট নেই, যাতে পুরুষদেরকে বুকের উপর হাত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। (এমনটি করার বিধান রয়েছে মেয়ে লোকদের জন্য। মহিলাদের নামাযের নিয়মও অন্যত্র সপ্রমাণ আলোচনা করা হবে ইন্শা-আল্লাহ্।)

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
[এ মাসআলার বিপক্ষে আনীত আপত্তিসমূহ ও সেগুলোর খণ্ডন]

আপত্তি- ১
আবূ দাঊদ শরীফে ইবনে জারীর দ্বাবী আপন পিতা থেকে বর্ণনা করেন-
قَاَلَ رَأَيْتُ عَلِيًّا يُمْسِكُ شِمَالَهُ بِيَمِيْنِهِ عَلَى الرُّسْغِ فَوْقَ السُّرَّةِ-
অর্থ: আমি হযরত আলী মুরতাদ্বা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুকে দেখেছি – তিনি বাম হাত ডান হাত দ্বারা কব্জির উপর ধরেছেন নাভীর উপরে।

খণ্ডন
এর কয়েকটা জবাব রয়েছে-
এক. আপনি তো আবূ দাঊদ শরীফের এ হাদীস পুরোপুরি উল্লেখ করেন নি। এর পর বিস্তারিত বর্ণনা হচ্ছে নিন্মরূপ: (ইবনে আ’রাবীর কপি)
قَالَ اَبُوْدَاؤدَ رَوى عَنْهُ سَعِيْدُ بْنُ جُبَيْرٍ فَوْقَ السُّرَّةِ وَقَالَ اَبُوْجلَادٍ تَحْتَ السُّرَّةِ وَرُوِىَ عَنْ اَبِىْ هُرَيْرَةَ وَلَيْسَ بِالْقَوِىِّ-
অর্থ: ইমাম আবূ দাঊদ বলেছেন, হযরত সা‘ঈদ ইবনে জুবায়র থেকে নাভীর উপর হাত বাঁধার বর্ণনা এসেছে; কিন্তু আবূ জালাদ নাভীর নিচে বলে বর্ণনা করেছেন। হযরত আবূ হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকেও এটা বর্ণিত হয়েছে, কিন্তু সেটা কোন শক্তিশালী বর্ণনা নয়।

জরুরী নোট
‘নাভীর নিচে’ অথবা ‘নাভীর উপরে’ হাত বাঁধার হাদীসগুলো ‘আবূ দাঊদ’ শরীফের প্রচলিত কপিগুলোতে নেই; ‘ইবনে আ’রাবী’ সম্বলিত আবূ দাঊদের কপিগুলোতে মওজুদ রয়েছে; যেমনটি আবূ দাঊদ শরীফের পার্শ্বটীকায় এর স্পষ্ট বিবরণ রয়েছে। এ কপি থেকে ‘ফাতহুল ক্বাদীর’ ও ‘সহীহুল বিহারী’ বর্ণনাদি নিয়েছে। মোট কথা, হে লা-মাযহাবীরা আপনাদের পেশকৃত আবূ দাঊদের হাদীসে পরস্পর বিরোধ সৃষ্ট হয়ে গেছে। এ পরস্পর বিরোধী বর্ণনাগুলোকে খোদ্ ইমাম আবূ দাঊদ ‘দুর্বল’ বলেছেন। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে- হে লা-মাযহাবীরা! আপনারা আবূ দাঊদের দুর্বল হাদীস থেকে দলীল গ্রহণ করেছেন। দ্বিতীয়ত, যখন হাদীসে পরস্পর বিরোধ দেখা দেয়, তখন ‘ক্বিয়াস’ দ্বারা প্রাধান্য নির্ণয় করা হয়। ‘ক্বিয়াস’ (যুক্তি) চাচ্ছে- ‘নাভীর নিচে হাত বাঁধার বর্ণনা সম্বলিত হাদীসগুলো অনুসারেই আমল করা হোক। কেননা, সাজদাহ্, রুকু’ ও আত্তাহিয়্যাত-এর বৈঠক-এ সব ক’টিতে আদবের প্রতি দৃষ্টি রাখা হয়েছে। সুতরাং ক্বিয়ামেও আদবের দিকটা বিবেচনায় আনা হোক। নাভীর নিচে হাত বাঁধায় আদব রয়েছে। বুকের উপর (পুরুষেরা) হাত-বাঁধা বেয়াদবীর সামিল; যেমন, এভাবে কাউকে কুস্তি খেলার জন্য আহ্বান করা হয়। মহান রবকে জোর (শক্তি) দেখিও না, ওখানে কান্না করো। (নম্রতা দেখাও!)

আপত্তি- ২
হে হানাফীরা, আপনাদের পেশকৃত হাদীসগুলো দ্ব‘ঈফ (দুর্বল)। আর দ্ব‘ঈফ বা দুর্বল হাদীস থেকে দলীল গ্রহণ করা ভুল পদ্ধতি।

খণ্ডন:
দ্ব‘ঈফ দ্ব‘ঈফ (দুর্বল, দুর্বল) বলে বুলি আওড়ানো আপনারা লা-মাযহাবীদের পুরানা অভ্যাস। সাতটা জবাব আমি প্রথম অধ্যায়ের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে দিয়েছি। আবারো শুনুন- যে বর্ণনা (হাদীস) একাধিক সনদে বর্ণিত হয়, সেটা ‘দ্ব‘ঈফ’ বা দুর্বল থাকে না। আমি তো দশটি সনদ পেশ করেছি। তাছাড়া, উম্মতের আমল দ্বারাও ‘দুর্বল’ হাদীস ‘শক্তিশালী’ হয়ে যায়। তদুপরি, ইমাম-ই আ’যম আবূ হানীফা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর মতো মহান ইমামের ‘কবূল করা’র কারণেও সেটার দুর্বলতা দূরীভূত হয়ে যায়। তাছাড়া, ওইগুলোতে যদি দুর্বলতা থাকে, তাহলে তা ইমাম-ই আ’যমের পরে সৃষ্টি হয়েছে। পরবর্তীকালীন দুর্বলতা ইমাম আ’যমের জন্য ক্ষতিকর হবে কেন? মোটেই হবে না, ইত্যাদি।

একটা মজার ঘটনা
আমি (মুফতী আহমদ ইয়ার খান) ৬ রমযানুল মুবারক সোমবার ‘আহলে হাদীসের অহংকার’ বলে খ্যাত পাকিস্তানের গুজরাত নিবাসী মাওলানা হাফেয এনায়ত উল্লাহ’র প্রতি একটি চিঠি লিখে তা গুজরাতের জামালপুর নিবাসী হাফেয ইলাহী বখশের মাধ্যমে পাঠিয়েছিলাম। চিঠিতে তাঁকে লিখেছিলাম যেন অনুগ্রহপূর্বক বুকের উপর হাত বাঁধার পক্ষে কিছু হাদীস সূত্র সহকারে লিখে পাঠান। আমার ধারণা ছিলো যে, যেহেতু হাফেয মাওলানা এনায়ত উল্লাহ্ সাহেব আহলে হাদীসের শীর্ষস্থানীয় গর্বিত আলিম, সেহেতু তিনি তাদের উক্ত আমলের পক্ষে বোখারী, মুসলিম অথবা সিহাহ্ সিত্তার অন্য হাদীস-গ্রন্থাবলী থেকে অসংখ্য হাদীস উদ্ধৃত করে পাঠাবেন, যেগুলো আমরা আজ পর্যন্ত হয়তো দেখিও নি। কিন্তু জবাব কি আসলো? উক্ত মাওলানা সাহেবের পক্ষ থেকে যে জবাব এসেছে তা শুনুন! আর মাথায় হাত মারুন! তিনি এক ইঞ্চি পরিমাণের এক টুকরো কাগজে একটা মাত্র লাইন লিখেছিলেন। তা নি¤œরূপ:
বুলুগুল মুরাম: পৃষ্ঠা – ২১
عَنْ وَائِلِ بْنِ حُجْرٍ اَنَّهُ قَالَ صَلَّيْتُ مَعَ النَّبِىَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَوَضَعَ يَدَهُ الْيُمْنَى عَلَى يَدِهِ الْيُسْرَى عَلَى صَدْرِهِ-
অর্থ: ওয়াইল ইবনে হুজর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পেছনে নামায পড়েছি। সুতরাং তিনি আপন ডান হাত বাম হাতের উপর তাঁর বক্ষের উপর রেখেছেন।
আর মৌখিকভাবে উক্ত মাওলানা বলে পাঠিয়েছেন যে, তাফসীর-ই ক্বাদেরী (উর্দু)তেও লিখা হয়েছে যে, فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ -এর অর্থ হচ্ছে- ‘‘আপনি আপনার রবের জন্য নামায পড়–ন এবং ‘নাহর’ অর্থাৎ বুকের উপর নামাযে হাত রাখুন।’’

(আহলে হাদীসের অহংকার বলে খ্যাত মাওলানা’র) এ জবাব দেখে ও শুনে আমি তো এ ভেবে সীমাহীন হতভম্ব যে, আফসোস! যেই আহলে হাদীস সম্প্রদায়ের শীর্ষস্থানীয়রা আমাদের নিকট যে কোন মাস’আলায় (দলীল হিসেবে) বোখারী ও মুসলিমের হাদীসের উদ্ধৃতি দাবী করতে থাকেন এবং সিহাহ্ সিত্তার বাইরে যেতে দেন না, আর যখন তাদের পক্ষে দলীল দেওয়ায় পালা আসে তখন এমন রেওয়ায়ত লিখে ক্ষান্ত হন, যার না আছে কোন হাত-পা না আছে মাথা। উক্ত রেওয়াতের না কোন সূত্র (সনদ) লিখলেন, না কোন নির্ভরযোগ্য কিতাবের বরাত। হাফেয ইলাহী বখশ আমাদের বললেন, ‘বুলূগুল মুরাম’-এর কথা। তাও মাত্র ত্রিশ/চল্লিশ পাতার একটি পুস্তিকা। তা থেকে এ হাদীস মৌলভী সাহেব উদ্ধৃত করে দিয়েছেন। যদি কোন মাসআলায় আমরা এমন পুস্তিকা থেকে কোন হাদীস উদ্ধৃত করতাম, তাহলে ক্বিয়ামত এসে যেতো! তারা দাবী করতো বোখারী কিংবা মুসলিমের হাদীস।

তাঁর উদ্ধৃত রেওয়ায়তটার এমন কোন পাত্তাই নেই যে, তা কি মওদ্বু’ (বানোয়াট), না দ্ব‘ঈফ (দুর্বল), কিংবা অন্য কিছু। যদি কিছুক্ষণের জন্য সেটাকে একটা সহীহ হাদীস বলে মেনেও নেয়া হয়, তবে সেটার প্রতি লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, তাতে একথার উল্লেখ নেই যে, হুযূর-ই আকরাম নামাযের মধ্যে বুকের উপর হাত রেখেছেন, বরং فَوَضَعَ يَدَهُ الخ -এর ‘ف’ (عاطفه تعقيبه) থেকে বুঝা যায় যে, তিনি নামাযের পর কোন প্রয়োজনে বক্ষ মুবারকের উপর হাত রেখেছেন। যেমন মহান রব এরশাদ করেন-وَاِذَا طَعِمْتُمْ فَانْتَشِرُوْا (অর্থাৎ এবং যখন তোমরা খানা খেয়ে নাও তখন চলে যাও)।

এর অর্থ এ নয় যে, খাদ্যাহার করার মধ্যভাগে রুটি/ভাত হাতে নিয়ে চলে যাও। এমতাবস্থায় এ হাদীস শরীফ আমাদের পেশকৃত হাদীসগুলোর পরিপন্থী হবে না।

তাছাড়া, (আহলে হাদীসের মৌলভীর উপস্থাপিত) উক্ত হাদীসে সেটার পদ্ধতি বর্ণনা করা হয়নি যে, নারীদের মতো হাত বুকের উপর রেখেছেন, না পলোয়ানদের মতো। সুতরাং হাদীসটি ‘মুজমাল’ (অবিস্তারিত); আমল করার যোগ্য নয়। আর আয়াত শরীফ সম্পর্কে শুধু এতটুকু বলবো যে, وَانْحَرْ শব্দের এ অস্পৃশ্য অর্থ না কোন মারফূ’ সহীহ্ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, না জমহুর (অধিকাংশ) মুফাস্সিরগণ বর্ণনা করেছেন। সবাই তো আয়াতের এ অর্থ করেন যে, ‘মহান রবের জন্য নামায পড়–ন! এবং ক্বোরবানী করুন।’ উক্ত মৌলভী বরাতও দিয়েছেন কেমন বড় ও উল্লেখযোগ্য তাফসীরের ‘তাফসীর’-ই ক্বাদেরী’ (উর্দু)!

আর যদি অসম্ভব কল্পনায় তা মেনেও নেওয়া হয়, তাহলে সমস্ত আহলে হাদীসের উচিত হবে- এখন থেকেই নামাযে হাত বুকের পরিবর্তে গলার উপর রাখা। কেননা ‘নাহ্র’ তো গলার শেষ ভাগকে বলা হয়, যা বুকের সাথে মিলিত অংশের উপরের দিকে থাকে। ক্বোরবানীকেও ‘নাহর’ এজন্য বলা হয় যে, তাতে যবেহের সময় পশুর গলা চিরে ফেলা হয়; বুক চেরা হয় না। সুতরাং আহলে হাদীস লা-মাযহাবীদেরও, উন্নতি করে বক্ষের উপরে গলা ধরা উচিত হবে।

মোটকথা, উক্ত মৌলভীর উক্ত জবাবের জন্য আমাদের খুব আফসোস্ হলো। আর আমরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম যে, ওই আহলে হাদীসের নিকট নামাযে বুকের উপর হাত বাঁধার পক্ষে কোন হাদীস বোখারী, মুসলিম ও সিহাহ্ সিত্তার নেই। এসব বেচারা ভ্রান্তলোক সেহাহ্ সিত্তার হাদীস তাদের পক্ষে পাবে কিভাবে? সিহাহ্ সিত্তার অন্যতম হাদীসগ্রন্থ তিরমিযী শরীফে ইমাম তিরমিযী বলেছেন-
وَرَاَى بَعْضُهُمْ اَنْ يَضَعَهُمَا فَوْقَ السُّرَّةِ وَرَاَى بَعْضُهُمْ اَنْ يَضَعَهُمَا تَحْتَ السُّرَّةِ وَكُلُّ ذَلِكَ وَاسِعٌ عِنْدَهُمْ-
অর্থ: কিছু সংখ্যক বিজ্ঞ আলিমের অভিমত হচ্ছে- হাত নাভীর উপর রাখবে, আর কারো কারো অভিমত হচ্ছে হাত নাভীর নিচে রাখবে। এ দু’এর মধ্যে প্রতিটি জায়েয, তাদের মতে।

ইমাম তিরমিযী রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি যদি বুকের উপর হাত বাঁধার পক্ষে কোন হাদীস পেতেন, তাহলে তিনি অবশ্যই তা উদ্ধৃত করতেন। শুধু আলিমদের অভিমত উল্লেখ করে ক্ষান্ত হতেন না।

[পরিশেষে, বলছি পুরুষরা নামাযে তাকবীর-ই তাহরীমাহ্ করে দু’হাত নাভীর নিচে বাঁধবেন (বুকের উপর বাঁধবে নারীরা)। এ বিষয়টি এখন অকাট্যভাবে প্রমাণিত।] এটাই হানাফী মাযহাবের সিদ্ধান্ত। সুতরাং এটা অনুসারেই আমল করা হবে।