আহলে হাদীস নামধারী ভ্রান্ত ও লা-মাযহাবীদের খন্ডন (পর্ব-2)

0

তাকবীর-ই তাহরীমার সময়  উভয় কান পর্যন্ত দু’ হাত উঠানোর বিধান

=============

নামাযে তাকবীর-ই তাহরীমার সময় পুরুষদের জন্য উভয় কান পর্যন্ত দু’ হাত উঠানো সুন্নাত; কিন্তু ওহাবী গায়র-মুকাল্লিদগণ মেয়েলোকদের মতো কাঁধ দু’টি বৃদ্ধাঙ্গুলি যুগল দ্বারা স্পর্শ করে বুকের উপর হাত বাঁধে। অথচ পুরুষের জন্য হাত কান পর্যন্ত তুলে নাভীর নিচে বাঁধাই সুন্নাত। তাই প্রথমে কান পর্যন্ত হাত উঠানোর মাসআলাটা সপ্রমাণ উল্লেখ করে এরপর নাভীর নিচে হাত বাঁধার মাসআলাটা ধারাবাহিকভাবে উল্লেখ করার প্রয়াস পাবো- ইন্শা-আল্লাহ্! সুতরাং আমি এ অধ্যায়ের দু’টি পরিচ্ছেদ করছি- প্রথম পরিচ্ছেদে আমাদের হানাফী মাযহাবের দলীলাদি এবং দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে লা-মাযহাবীদের বিভিন্ন আপত্তি ও সেগুলোর খণ্ডণ করা হবে। আল্লাহ্ তা‘আলা কবূল করুন।

প্রথম পরিচ্ছেদ
কান পর্যন্ত হাত উঠানোর পক্ষে অনেক হাদীস শরীফ রয়েছে। তন্মধ্যে কয়েকটা মাত্র নিন্মে পেশ করছি-

হাদীস নম্বর ১-৩
সর্বইমাম বোখারী, মুসলিম ও ত্বাহাভী হযরত মালিক ইবনে হুয়ায়রিস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন-
كَانَ النَّبِىُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمْ اِذَا كَبَّرَ رَفَعَ يَدَيْهِ حَتَّى يُحَاذِىَ اُذنَيْهِ وَفِىْ لَفْظٍ حَتَّى يُحَاذِيَ بِهِمَا فُرُوْعَ اُذنَيْهِ-
অর্থ: হুযূর-ই আকরাম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম যখন তাকবীর বলতেন, তখন আপন দু’হাত মুবারক তাঁর উভয় কান পর্যন্ত উঠাতেন। অন্য বচনে এভাবে আছে- উভয় কানের লতি পর্যন্ত উঠাতেন।

হাদীস নম্বর-৪
আবূ দাঊদ শরীফে হযরত বারা ইবনে আযিব রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত-
رَأَيْتُ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اِذَا فَتَحَ الصَّلوةَ رَفَعَ يَدَيْهِ اِلَى قَرِيْبٍ مِّنْ اُذُنَيْهِ ثُمَّ لَايَعُوْدُ-
অর্থ: আমি হুযূর-ই আনওয়ারকে দেখেছি যে, যখন তিনি নামায আরম্ভ করতেন তখন নিজের দু’ হাত মুবারক উভয় কানের নিকট পর্যন্ত উঠাতেন। এর পর আর হাত উঠাতেন না। (রফ’ই ইয়াদাঈন করতেন না)।

হাদীস নম্বর-৫
মুসলিম শরীফে হযরত ওয়া-ইল ইবনে হুজর রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণনা করা হয়েছে-
اَنَّهُ رَأَى النَّبِىَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَفعَ يَدَيْهِ حِيْنَ دَخَلَ فِى الصَّلَوةِ كَبَّرَ قَالَ اَحَدُ الرُّوَاةِ جَبَالَ اُذُنَيْهِ ثُمَّ اِلْتَحَفَ بِثَوْبِه –
অর্থ: তিনি হুযূর-ই আকরাম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে দেখেছেন যে, হুযূর যখন নামাযে প্রবেশ করেছেন তখন আপন দু’হাত মুবারক উঠিয়েছেন। আর তাকবীর বলেছেন। এক বর্ণনাকারী বলেছেন, আপন দু’কানের বরাবর, তারপর আপন কাপড়ে দু’হাত গোপন করে (ঢেকে) নিয়েছেন।

হাদীস নম্বর- ৬-৮
বোখারী, আবূ দাঊদ, নাসাঈ হযরত আবূ ক্বালাবাহ্ রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু হতে বর্ণনা করেছেন-
اَنَّ مَالِكَ بْنَ حُوَيْرِثٍ رَأَى النَّبِىَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَرْفَعُ يَدَيْهِ اِذَا كَبَّرَ وَاِذَا رَفَعَ رَأسَهُ مِنَ الرُّكُوْعِ حَتَّى يَبْلُغَ فُرُوْعَ اُذْنَيْهِ-
অর্থ: হযরত মালিক ইবনে হুয়াইরিস নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে দেখেছেন, তিনি উভয় হাত মুবারক উঠাতেন যখন তাকবীর-ই তাহরীমাহ্ বলতেন আর যখন রুকূ’ থেকে শির মুবারক উঠাতেন এ পর্যন্ত যে, তখন উভয় হাত মুবারক উভয় কানের লতি মুবারক পর্যন্ত পৌঁছে যেতো।

হাদীস নম্বর- ৯-১২
সর্ব ইমাম আহমদ, ইসহাক্ব ইবনে রাহ্ওয়াইহ্, দারু ক্বুত্বনী ও ত্বাহাভী হযরত বারা ইবনে ‘আযিব রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন-
كَانَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى الله عَلَيْهِ وسَلَّمَ اِذَا صَلَّى رَفَعَ يَدَيْهِ حتَّى تَكُوْنَ اِبْهَامَاهُ حَذَاءِ اُذْنَيْهِ-
অর্থ: যখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম নামায পড়তেন, তখন এ পর্যন্ত উভয় হাত মুবারক উঠাতেন যে, তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুলী যুগল উভয় কান মুবারকের বরাবর হয়ে যেতো।

হাদীস নম্বর- ১৩-১৫
সর্ব ইমাম হাকিম মুস্তাদ্রাকে, দারু ক্বুতনী এবং বায়হাক্বী অত্যন্ত বিশুদ্ধ সনদে, যা ইমাম বোখারীও বোখারী শরীফের শর্তাবলীর অনুরূপ, হযরত আনাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন-
رَأْيْتُ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمْ كَبَّرَ فَحَاذَى بِاِبْهَامَيْهِ اُذُنَيْهِ-
অর্থ: আমি রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে দেখেছি যে, তিনি তাকবীর বললেন আর আপন উভয় বৃদ্ধাঙ্গুলী শরীফ আপন উভয় কান মুবারকের বরাবর করে নিয়েছেন।

হাদীস নম্বর-১৬-১৭
ইমাম আবদুর রায্যাক্ব ও ইমাম তাহাভী হযরত বারা ইবনে আযিব রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন-
كَانَ النَّبِىُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اِذَا كَبَّرَ لِاِفْتَتَاحِ الصَّلَوةِ رَفَعَ يَدَيْهِ حَتَّى يَكُوْنَ اِبْهَامَاهُ قَرِيْبًا مِنُ شَحْمَةِ اُذُنَيْهِ-
অর্থ: যখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম নামায আরম্ভ করার জন্য তাকবীর বলতেন, তখন এ পর্যন্ত হাত শরীফ উঠাতেন যে, তাঁর উভয় বৃদ্ধাঙ্গুলী শরীফ উভয় কান মুবারকের লতির বরাবর হয়ে যেতো।

হাদীস নম্বর-১৮
ইমাম আবূ দাঊদ হযরত ওয়াইল ইবনে হুজর রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণনা করেন-
اَنَّ النَّبِىَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَفَعَ يَدَيْهِ حَتَّى كَانَتْ بِجَبَالِ مَنْكَبَيْهِ وَحَاذى بِاِبْهَامَيْهِ اُذُنَيْهِ-
অর্থ: হুযূর-ই আকরাম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম উভয় হাত মুবারক উঠালেন এ পর্যন্ত যে, উভয় হাত শরীফ তো উভয় স্কন্ধের এবং উভয় বৃদ্ধাঙ্গুলী শরীফ উভয় কান মুবারকের বরাবর হয়েছিলো।

হাদীস নম্বর-১৯
দারু ক্বুত্বনী হযরত বারা ইবনে আযিব রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণনা করেন-
اَنَّه رَأَى النَّبِىَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حِيْنَ اِفْتَتَحَ رَفَعَ يَدَيْهِ حَتَّى حَاذى بِهِمَا اُذُنَيْهِ ثُمَّ لَمْ يَعُدُ اِلَى شَيْءٍ مِنْ ذَالِكَ حَتَّى فَرَغَ مِنْ صَلَوتِهِ-
অর্থ: তিনি হুযূর-ই আকরামকে দেখলেন যখন তিনি নামায আরম্ভ করেছেন, তখন আপন হাত মুবারক উঠালেন এ পর্যন্ত যে, ওই দু’টিকে উভয় কান মুবারকের বরাবর করে নিয়েছেন। তারপর নামায সমাপ্ত করা পর্যন্ত আর হাত উঠাননি।

হাদীস নম্বর-২০
ত্বাহাভী শরীফে হযরত আবূ হুমায়দ সা-‘ইদী থেকে বর্ণনা করা হয়েছে-
اَنَّه كَانَ يَقُوْلُ لِاَصْحَابِ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اَنَا اَعْلَمُكُمْ بِصَلَوةِ رَسُوْلِ للهِ صَلَى عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ قَامَ اِلَى الصَّلٰوةِ كَبَّرَ وَرَفَعَ يَدَيْهِ حَذَاءَ وَجْهِهِ-
অর্থ: তিনি হুযূর-ই আকরামের সাহাবীদেরকে বলতেন, তোমাদের সবার চেয়ে আমি হুযূর-ই আকরামের নামায সম্পর্কে বেশী জানি। তিনি যখন নামাযে দণ্ডায়মান হতেন, তখন তাকবীর বলতেন আর আপন দু’ হাত মুবারক চেহারা শরীফের বরাবর পর্যন্ত উঠাতেন।

কান পর্যন্ত হাত উঠানোর পক্ষে আরো বহু হাদীস শরীফ পেশ করা যেতে পারে। এখানে মাত্র বিশটি হাদীস শরীফ উল্লেখ করলাম। যদি আরো বেশী চান, তাহলে হাদীস শরীফের কিতাবাদি, বিশেষ করে ‘সহীহুল বিহারী শরীফ’ পর্যালোচনা করুন। কারণ, সেটার মতো কিতাব হানাফী মাযহাবের সমর্থনে ‘জা-মি‘ই আহা-দীস’ (হাদীস সম্ভার) রূপে আজ পর্যন্ত দেখা যায়নি।

যুক্তিগত দলীলাদি
যুক্তি (আক্বল)ও চাচ্ছে যে, নামায আরম্ভ করার সময় উভয় কান পর্যন্ত উভয় হাত উঠানো হোক। কেননা, মুসল্লী নামায আরম্ভ করার সময় ইবাদতে মশগুল হয় এবং দুনিয়াবী ঝগড়া-বিবাদ থেকে পৃথক ও সম্পর্কহীন হয়ে যায়। পানাহার, কথাবার্তা, এদিক-ওদিক দেখা, সব কিছু নিজের উপর হারাম করে নেয়। সে যেন দুনিয়া থেকে বের হয়ে ঊর্ধ্ব জগতে ভ্রমণ করে। ওরফে, যখন কোন জিনিষ থেকে তাওবা কিংবা পৃথক করানো হয়, তখন কানগুলোতে হাত রাখানো হয়, কাঁধ ধরানো হয় না। নামাযীও যেন মুখে (তাকবীর বলে) নামায শুরু করে, আর কাজে কানগুলোতে হাত রেখে দুনিয়া থেকে পৃথক হয়ে থাকে। এমন সময় কাঁধ ধরা একেবারেই যুক্তিগ্রাহ্য নয়। যেমন সাজদায় মুসলমান মুখেতো মহান রবের মহত্ব ও বড়ত্বের কথা স্বীকার করে, আর ভূ-পৃষ্ঠের উপর মাথা রেখে নিজের অক্ষমতা ও বিনয় প্রকাশ করে, তেমনি নামায শুরু করার সময় একাংশের স্বীকার মুখে করা হয়; অপর অংশের প্রকাশ আমল (কর্ম) দ্বারা করা হয়।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
এ মাসআলার বিপক্ষে আপত্তিসমূহ ও সেগুলোর খণ্ডন
এ মাসআলায় গায়র মুক্বাল্লিদ (মাযহাব অমান্যকারী)দের দু’টি আপত্তি রয়েছে, যে দু’টি আপত্তি তারা সর্বত্র পেশ করে থাকে-

প্রথম আপত্তি
ইমাম বোখারী ও ইমাম মুসলিম হযরত আবূ হুমায়দ সা-‘ইদী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে এক দীর্ঘ হাদীস বর্ণনা করেছেন, যাতে একটা বচন এমন আছে যে- اِذَا كَبَّرَ جَعَلَ يَدَيْهِ حَذَاءَ مَنْكَبَيْهِ- অর্থাৎ হুযূর-ই আকরাম যখন তাকবীর বলতেন, তখন আপন হাত শরীফ স্কন্ধযুগলের বরাবর করে নিতেন। বোখারী ও মুসলিম হযরত ইবনে ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুমা থেকে এ বচনগুলো উদ্ধৃত করেছেন-
اَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَاَنَ يِرْفَعُ يَدَيْهِ حَذْ وَمَنْكَبَيْهِ
অর্থ: রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আপন দু’ হাত মুবারক স্বীয় স্কন্ধ যুগলের বরাবর করে নিতেন।
এ হাদীস শরীফ অনেক সনদ দ্বারা বর্ণিত। বুঝা গেলো যে, স্কন্ধযুগল পর্যন্ত হাত উঠানো সুন্নাত। আর কর্ণযুগল পর্যন্ত উঠানো সুন্নাতের পরিপন্থী।

খণ্ডন
এ হাদীসগুলো হানাফী মাযহাবের মোটেই বিরোধী নয়। কেননা, কানের সাথে বৃদ্ধাঙ্গুলী লাগালে হাত দু’টি কাঁধের সমান (বরবার)ই হয়ে যাবে এবং উভয় হাদীসের উপর আমল হয়ে যাবে। কিন্তু কাঁধ পর্যন্ত হাত উঠিয়ে কাঁধকে স্পর্শ করার মধ্যে ওই সব হাদীসের উপর আমল করা হয় না, যেগুলোতে কান পর্যন্ত হাত উঠাতেন মর্মে উল্লেখ করা হয়েছে। হানাফী মাযহাবের অনুসারীরা উভয় প্রকারের হাদীসের উপর আমল করে থাকেন। আর ওহাবী লা-মাযহাবীরা এক প্রকারের হাদীসকে ছেড়ে দেয়। সুতরাং হানাফী মাযহাব ব্যাপকতর; বরং হাদীস নম্বর ১৮তে এর স্পষ্ট বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। তা হচ্ছে- হুযুর-ই আনওয়ার সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম হাত শরীফ এভাবে উঠাতেন যে, হাত শরীফ তো স্কন্ধযুগল পর্যন্ত থাকতো, বৃদ্ধাঙ্গুলী দু’টি থাকতো কান পর্যন্ত। সুতরাং না হাদীস শরীফগুলো পরস্পর বিরোধী, না ওই দু’ধরনের হাদীসের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করা অসম্ভব। শুধু তোমাদের বুঝা ও অনুধাবনের মধ্যে হেরফের হয়েছে।

সমস্ত গায়র মুক্বাল্লিদ (লা-মাযহাবী, আহলে হাদীস ও সালাফী)’র প্রতি সাধারণ ঘোষণা রইলো- এমন কোন মারফ’ূ (সরাসরি হুযূর-ই আকরামের সূত্রে বর্ণিত হাদীস শরীফ) দেখান, যা’তে একথা রয়েছে যে, হুযূর-ই আকরাম আপন বৃদ্ধাঙ্গুলী শরীফ দু’টি কাঁধ পর্যন্ত উঠাতেন। যেখানেই কাঁধগুলোর কথা আছে, ওখানে তো হাত শরীফ এরশাদ হয়েছে, আর যেখানে কানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানে বৃদ্ধাঙ্গুলী শরীফ বলা হয়েছে। এ থেকে বুঝা যায় যে, উভয় কাঁধ পর্যন্ত হাত এভাবে উঠাতেন যে, বৃদ্ধাঙ্গুলী শরীফ কান শরীফ পর্যন্ত পৌঁছে যেতো।

দ্বিতীয় আপত্তি
কান পর্যন্ত হাত শরীফ উঠাতেন মর্মে যেসব হাদীস শরীফ আপনারা (সুন্নী হানাফী মুসলমানগণ) পেশ করেছেন, সবকটি ‘দ্ব’ঈফ’ (দুর্বল)। সুতরাং সেগুলো আমলযোগ্য নয়।

খণ্ডন
এ আপত্তির কয়েকটা জবাব দেওয়া যেতে পারে-
এক. ওহাবী গায়র মুকাল্লিদগণ তাদের অভ্যাসের গোলাম। তাদের অভ্যাস হচ্ছে তাদের বিপক্ষে যে সব হাদীস আছে সবকটিকে তারা বিনা কারণে ‘দ্ব’ঈফ’ (দুর্বল) বলে বসে। (এ ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে।)

দুই. আমরা এ পরম্পরায় বোখারী ও মুসলিমের হাদীসও উল্লেখ করেছি। ওইগুলোর উপর তো তোমাদের পাকাপোক্ত ঈমান থাকার কথা। (সুতরাং ওইগুলো মেনে নাও।)

তিন. ‘দ্ব’ঈফ’ হাদীসও যখন কয়েকটা সূত্রে (সনদ) বর্ণিত হয়, তখন তা শক্তিশালী ও ‘হাসান’ পর্যায়ের হাদীস হয়ে যায়। দুর্বল খড়কুটাগুলোও পরস্পর মিলে মজবুত রশি হয়ে যায়। সুতরাং একাধিক দুর্বল সনদ হাদীসের মতন (বচন)কে কেন মজবুত করবে না? এ কিতাব ‘জা-আল হক’ঃ ২য় খণ্ডের ভূমিকাটা দেখুন! (সেটা পাঠ-পর্যালোচনা করলে এ সম্পর্কে ভুল অবশ্যই ভাঙ্গবে।)

চার. আমাদের উপস্থাপিত এ হাদীসগুলো অনুসারে মুসলিম উম্মাহ্র বিজ্ঞ আলিম, ওলী ও নেক্কার ব্যক্তিবর্গ আমল করেছেন। উম্মতের আমলের কারণেও দুর্বল হাদীস শক্তিশালী হয়ে যায়।

পাঁচ. যদি এ হাদীসগুলো (তোমাদের কথা মতো) দুর্বলও হয়, তবুও ইমাম-ই আ‘যম আবূ হানীফা রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর মতো ইমাম সেগুলো গ্রহণ করেছেন। এটাও তো ওইগুলোকে শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য করে দেয়। কেননা, নেক্কার এবং যোগ্য আলিম গ্রহণ করলেও দুর্বল হাদীস শক্তিশালী হয়ে যায়।

ছয়. নির্বিচারে ওইসব হাদীসকে আপনাদের ‘দুর্বল’ বলে ফেলাকে ‘জরহে মজহুল’ (অজ্ঞাত কারণে সমালোচনা করা) বলা হয়, যা কোন মতেই গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা, তাতে দুর্বল হবার কোন কারণ বলা হয়নি, বলা হয়নি সেগুলো কি কারণে দুর্বল?

সাত. যদি (পরবর্তী) মুহাদ্দিসগণ উক্ত হাদীস শরীফগুলো দুর্বল হিসেবে পান, তবে তা ইমাম-ই আ‘যম আবূ হানীফা রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর উপর কোন প্রভাব ফেলতে পারবে না। কারণ, তাঁর সমসমায়িক যুগে কোন দুর্বল বর্ণনাকারী হাদীসের সনদগুলোতে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। পরবর্তী যুগের দুর্বলতা পূর্ববর্তীদের জন্য ক্ষতিকারক নয়। সুতরাং সালাফী-ওহাবী প্রমুখের আশাপ্রদ আপত্তিটাও টুকরো টুকরো হয়ে উড়ে গেলো। আল্হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন।

শেয়ার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •