দাওয়াতে খায়র’র গুরুত্ব ও আমাদের দায়িত্ব – মাওলানা আবু যাহরা মুহাম্মদ মোজাম্মেল হক

0

দাওয়াতে খায়র’র গুরুত্ব ও আমাদের দায়িত্ব
মাওলানা আবু যাহ্রা মুহাম্মদ মোজাম্মেল হক

পূর্ব প্রকাশিতের পর
দায়িত্ব পালনের প্রতিদান
সুতরাং এ পছন্দনীয় কথার বিনিময়ও হবে অমূল্য। অন্যান্য ইবাদতের জন্য যেমন অগণিত নেকী রয়েছে, তেমনি ভাবে- এ কাজটাও যেহেতু ইবাদত তার জন্যও কল্পনাতীত সাওয়াব রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে হযরত ইমাম মুহাম্মদ গাযালী রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি বলেন, হযরত সাইয়্যিদুনা মুসা আলায়হিস্ সালাতু ওয়াস্ সালাম আরয করলেন, হে আল্লাহ্ যে ব্যক্তি আপন ভাইকে ডাকবে, তাকে সৎ কাজের নির্দেশ দেবে এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখবে তার প্রতিদান কি? ইরশাদ করলেন, আমি তার কথার জন্য একবছরের ইবাদতের সাওয়াব লিপিবদ্ধ করে দিই, আর তাকে জাহান্নামের শাস্তি দিতে আমার লজ্জাবোধ হয়।
[মুকাশাফাতুল কুলূব] এ মহান কাজের বিনিময়ে অসংখ্য নেকীর সাথে সাথে আখিরাতে মহা পুরস্কারের সুসংবাদও রয়েছে। হযরত সাইয়্যিদুনা আবুযর গিফারী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেন, ‘‘হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু আরয করলেন, হে আল্লাহর রসূল! (সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম) মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা ছাড়াও কি জিহাদ আছে? হুযূর পুরনূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, হ্যাঁ, হে আবু বকর! আল্লাহ্ তা‘আলার এমন সব মুজাহিদও পৃথিবীতে রয়েছে, যাঁরা ওই সব শহীদ অপেক্ষাও উত্তম, যাঁরা জীবিত রয়েছে। তাঁরা রুজি পান। এরাঁ যমীনের উপর চলাফেরা করছেন, আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁদের নিয়ে আসমানের ফিরিশতাদের সামনে গর্ব করেন। তাঁদের জন্য জান্নাত সাজানো হয়। হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু আরয করলেন, ‘‘হে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম তাঁরা কারা? হুযূর পুরনূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, নেকীর নির্দেশদাতা মন্দ থেকে আল্লাহ তা‘আলার জন্য ভালোবাসা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য শত্র“তা পোষণকারী।’’
অতঃপর ইরশাদ করেন, ‘‘ওই মহান সত্তার শপথ! যাঁর কুদরতের মুঠোয় আমার প্রাণ, এমন বান্দা উঁচুতম বাসভবনে থাকবে, যেগুলো শহীদের বাসভবন গুলো থেকেও উঁচু হবে। প্রতিটি বাসভবনের তিনশটি দরজা থাকবে। দরজাগুলো হবে ইয়াকুত ও সবুজ যুমারাদ পাথরের। প্রত্যেক দরজার উপর আলো থাকবে। এমন প্রত্যেক লোক তিন লক্ষ হুরের সাথে বিবাহ্ বন্ধনে থাকবে। আর ওই সব হুর চূড়ান্ত পর্যায়ের পবিত্র চরিত্রের অধিকারী হবে ও ভীষণ সুশ্রী হবে। যখনই বান্দা তাদের মধ্যে যে কোন একটি হুরের দিকে তাকাবে, তখন সে (হুর) বলবে, আপনি অমুক দিন আল্লাহ্ তা‘আলার যিকর করেছেন, আপনি এভাবে নেক কাজের নির্দেশ দিয়েছেন এবং মন্দ কাজে বাধাঁ দিয়েছেন। মোটকথা, যখনই কোন হুরের দিকে তাকাবে, তখন সে (হুরটি) সৎ কাজের নির্দেশ ও অসৎ কাজে বাধাঁ দানের কারণে তার একেকটি উচ্চ মর্যাদার কথা বলবে। [মুকাশাফাতুল কুলূব] কেমন শান হবে কল্যাণের পথে আহ্বান ও মন্দ থেকে মানুষকে বারণকারীর, দুনিয়াতে নেকীর ভাণ্ডার আর আখিরাতে জান্নাতী নি’মাত ও উঁচু মর্যাদা সবচেয়ে সৌভাগ্যের বিষয় হবে তাঁরা ঐ জান্নাতের অধিকারী হবে যে জান্নাত লাভের জন্য মৃত মুসলমানদের পক্ষে দু’আ করার কথা বলেছেন। যে জান্নাতের মর্যাদা অন্যন্য। আল্লাহর প্রিয় হাবীব সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম তাতে তাশরীফ রাখবেন। আর তা হলো জান্নাতুল ফেরদৌস। আশিকে রাসূল হলে এমন হওয়া চাই যে, মাহবূব নবী যেথায় থাকবেন, আশিকও সেথায় যেন থাকতে পারেন এরূপ আমল দ্বারা নিজেকে সজ্জিত করা। যে আমলের দ্বারা ঐ মহান জান্নাত অর্জিত হবে সে আমলে যত কষ্টই হোক না কেন, তা দৃঢ়চিত্তে করে যাওয়ার মধ্যেই জীবনের সার্থকতা। তা-ই নবী প্রেমের আমলী দলীল। বিশিষ্ট তাবিঈ হযরত সাইয়্যিদুনা কা’আবুল আহবার রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেন, জান্নাতুল ফেরদৌস বিশেষ করে ঐ ব্যক্তির জন্যই, যে সৎ কাজের নির্দেশ দেয় ও অসৎ কাজে বাধা দেয়। [তাম্বাহুল মুগর্ফারীন] উপরিউক্ত আলোচনা থেকে আমরা দাওয়াতে খায়র বা কল্যাণের পথে আহ্বান ও মন্দ কাজে বাধা দানের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা, এ দায়িত্ব পালনের ফযীলত ও বারাকাত এবং উত্তম প্রতিদান সম্পর্কে জানতে পারলাম। আল্লাহ্ পাক সহায় হলে আশা করি এ গুরু দায়িত্ব সম্পর্কে আমাদের উপলব্ধি সৃষ্টি হবে এবং আমরা আমাদের শক্তি ও সামর্থ অনুযায়ী এ দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হবো এবং জান্নাতুল ফেরদৌসের পথ যাত্রীদের সঙ্গী হবো।
এ দায়িত্ব অবহেলা করুন পরিণতি
কল্যাণের পথে আহ্বান ও মন্দ থেকে বারণের এ দায়িত্ব আমাদের পরিবার থেকে শুরু করতে হবে। তাদেরকে দ্বীনি ইল্ম ও আদব শিক্ষা দিতে হবে।
নামায ও শরিয়তের নির্দেশাবলীর উপর আমলের প্রতি উৎসাহিত করতে হবে। প্রয়োজনে শরিয়ত নির্দেশিত নিয়মে কঠোরতা প্রদর্শন করতে হবে। আর এ কাজ করার পূর্বে নিজ জীবনে এসব সর্বাগ্রে বাস্তবায়ন করতে হবে। নিজে আমল না করে অন্যকে উপদেশ দিতে গেলে নিজের জন্য লজ্জার বিষয় হবে এবং উপদেশের প্রভাব তাদের মধ্যে পড়বে না। তাই প্রথমে নিজের মধ্যে খোদাভীতি সৃষ্টি করতে হবে। আল্লাহ্ ও রসূলের প্রেম জাগ্রত করতে হবে। যে প্রেম আল্লাহ্ ও তাঁর প্রিয় মাহবূব সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশ পালনে সহায়ক হবে। আল্লাহ্ পাকের ভালোবাসা অর্জন ও তাঁর আযাব থেকে বাঁচার জন্য তার প্রিয় হাবীব সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাতের জীবনাদর্শ অনুসরণ সুন্নাত পালনে উৎসাহিত করবে। এভাবে নিজের ও নিজ পরিবারকে গঠন করে জান্নাতীদের দলভুক্ত হতে হবে। জাহান্নামের কঠিন শাস্তি বা আযাব বরদাশত করার শক্তি আমাদের নাজুক শরীরের নেই। আল্লাহ্ পাক আমাদেরকে সতর্ক করে ইরশাদ করেছেন-
يَايُّهَا الَّذِيْنَ اَمَنُوْا قُوْا اَنْفُسَكُمْ وَاَهْلِيْكُمْ نَارًا وَقُوْدُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ-
অর্থাৎ হে ঈমানদারগণ, নিজেদেরকে ও নিজেদের পরিবার-বর্গকে আগুন থেকে রক্ষা করো যার ইন্ধন হচ্ছে মানুষ ও পাথর। [সূরা আত্তাহরীম: আয়াত ৩৬] যারা নিজ পরিবারকে নেকীর প্রতি উৎসাহিত করে না দ্বীনি জ্ঞান শিক্ষা দেয় না, গুনাহ থেকে সতর্ক করে না, তাদের ইহকালীন ও পরকালীন করুণ অবস্থার বর্ণনা জেনে সতর্ক হোন। হযরত সাইয়্যিদুনা ফকীহ্ আবুল লায়স সমরক্বন্দী রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি উদ্ধৃত করেছেন- কথিত আছে যে, ‘‘কিয়ামতের দিন মানুষকে আল্লাহ্ তা‘আলার দরবারে দণ্ডায়মান করানো হবে। পরিবারের কর্তার প্রতি তার স্ত্রী ও সন্তানগণ আল্লাহ্ তা‘আলার দরবারে অভিযোগ করে আরয করবে, হে আমাদের প্রতিপালক! এ ব্যক্তিকে আমাদের প্রতি কর্তব্যের অবহেলার কারণে পাকড়াও করুণ। কেননা, সে আমাদেরকে সমাজের, দ্বীনের বিষয়াদি শিক্ষা দেয়নি। আমাদেরকে হারাম রুজি আহার করাতো। আমরা ছিলাম অজ্ঞ।’’
সুতরাং ওই (হতভাগ্য) কে হারাম রুজি উপার্জন করার কারণে প্রহার করা হবে। প্রচণ্ড প্রহারে তার দেহের গোশত ঝরে পড়বে। এরপর মীযানের নিকট হাযির করা হবে। আর ফিরিশতাগণ লোকটির পর্বত সমান নেকীগুলো হাযির করবেন। তখন পরিবারের সদস্যদের থেকে এক ব্যক্তি সামনে এগিয়ে যাবে, আর বলবে, আমার নেকীর ওজন কম হয়েছে, আর সে তার নেকীগুলো থেকে নিয়ে নেবে, তারপর পরিবারের অন্য লোক আসবে, সেও তার নেকীগুলো থেকে নিয়ে নিজের অভাব পূরণ করে নেবে। মোট কথা (পরিবার-পরিজন) তার নেকীগুলো নিয়ে যাবে, তারপর সে তার পরিবারের সদস্যদের দিকে মুখ ফিরিয়ে বলবে, আহা! আমার গর্দানের উপর কি ওইসব গুনাহ্ রয়ে গেলো যেগুলো তোমাদের খাতিরে আমি বহন করেছি?’’ আর ফিরিশতাগণ বলবে, সেটা হচ্ছে ওই লোক যার পরিবারের লোকেরা তার সমস্ত নেকী নিয়ে গেছে। আর সে তাদের কারণে জাহান্নামে প্রবিষ্ট হয়ে গেছে।
[ক্বুররাতুল ‘উয়ূন] চিন্তা করা দরকার যে, আমাদের øেহের সন্তান যদি আমাদের কোন আদেশ না মানে আমরা তখন চড়-তাপ্পর লাগিয়ে দিই। কিন্তু নামায কাযা করলো কিনা আমরা তার খোঁজ-খবর নিই না। এ থেকে জানা গেলো যে, যারা নিজ পরিবারের সংশোধনের চেষ্টা করেনা, তাদের আখিরাতের অবস্থা কি হতে পারে তা সম্পর্কে অবহিত হওয়ার পর নিশ্চুপ থাকা হবে নিজের ধ্বংস নিজে ডেকে আনা।
(চলবে)

শেয়ার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •