স্বপ্নযোগে রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর দর্শন লাভ- মাওলানা এ কে এম ফজলুর রহমান মুন্শী

0

মহান রাব্বুল আলামীন উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য রোজ কিয়ামত পর্যন্ত যে, সকল স্থায়ী নিয়ামত প্রদান করেছেন, তন্মধ্যে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে স্বপ্নযোগে বা প্রকাশ্যে দর্শন লাভ করা অন্যতম। স্বপ্নে বা জাগ্রত অবস্থায় রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর দর্শন বা যিয়ারত লাভ করা একজন মুমিন-মুসলমানের চরম ও পরম পাওয়া। এর কোন তুলনা নেই।
স্বপ্নযোগে রাহমাতুল্লিল আলামীন সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে দেখা সম্ভব
হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু হতে বর্ণিত আছে তিনি বলেছেন, আমি মহানবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, নবুয়তের মধ্যে শুধু ‘মুবাশশিরাত’ বাকি রয়েছে। সাহাবায়ে কেরাম রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুম বলেছেন, আর মুবাশশিরাত কি? তিনি বলেন, ‘সুস্বপ্ন’।
সুস্বপ্নের মর্যাদা
হযরত আনাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু হতে বর্ণিত আছে সায়্যেদুল মুরসালীন সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, পুণ্যবান ব্যক্তির শুভ স্বপ্ন নবুয়তের ছেচল্লিশ ভাগের একভাগ। হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন কিয়ামত নিকটবর্তী হবে, মুমিনদের স্বপ্ন মিথ্যা হবে না এবং মুমিনের স্বপ্ন নবুওয়তের ছেচল্লিশ ভাগের এক ভাগ। আর যা নবুওয়তের অংশ তা মিথ্যা হয় না।
সুস্বপ্ন আল্লাহর দিক হতে এবং কুস্বপ্ন শয়তানের দিক হতে
হযরত কাতাদাহ্ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি খাতামুন নাবিয়্যিন সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, ভাল স্বপ্নগুলো আল্লাহর তরফ হতে। সুতরাং তোমাদের কেউ যখন তার পছন্দীয় স্বপ্ন দেখে, তবে তার প্রিয় ব্যক্তি ছাড়া আর কারোও নিকট প্রকাশ করবে না। আর যদি অপছন্দনীয় স্বপ্ন দেখে তবে বামদিকে তিনবার থুথু নিক্ষেপ করবে এবং ওই স্বপ্নের অকল্যাণ হতে আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাইবে। আর ওই স্বপ্ন কারোও নিকট প্রকাশ করবে না। এতে ওই স্বপ্নের দ্বারা তার কোন ক্ষতি হবে না।
স্বপ্নের প্রকারভেদ
হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু হতে বর্ণিত আছে, শাফীউল মুযনাবীন সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- যখন যুগ এবং সময় কিয়ামতের নিকটবর্তী হয়ে যাবে, তখন প্রায়শ খাঁটি মুসলমানের স্বপ্ন মিথ্যা ও বিফল হবে না। তোমাদের অধিক সত্যবাদী লোকের স্বপ্ন নবুওয়তের পঁয়তাল্লিশ ভাগের এক ভাগ। আর স্বপ্ন হল তিন প্রকার। এক. উত্তম স্বপ্ন, যা আল্লাহর তরফ হতে সুসংবাদ বাহক। দুই. শয়তানের তরফ হতে যা দুর্ভাবনা সৃষ্টিকারী। আর তিন. যা মানুষ তার মনের সাথে কথা বলে, ভাবনা-চিন্তা করে তা হতে উদ্ভুত। অতএব তোমাদের কেউ অপছন্দনীয় কোন স্বপ্ন দেখলে সে যেন ঘুম হতে উঠে দাঁড়ায় এবং নফল নামায পড়ে এবং মানুষের নিকট যেন ওই স্বপ্ন প্রকাশ না করে।
রসূলুল্লাহ্ ( )কে দেখার ফযিলত ও তার বাসনা
হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু হতে বর্ণিত আছে, রাহমাতুল্লিল আলামীন সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যার হাতে মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম) এর প্রাণ তার কসম! তোমাদের উপর এমন একটি সময় আসবে, যখন তোমরা আমাকে দেখতে পাবে না। আর আমাকে দেখা তোমাদের নিকট তখন তোমাদের ধন-সম্পদ ও অন্যান্য সবকিছু হতে প্রিয় হবে।
নবী করীম ( )এর প্রতি ভালোবাসা সবোর্চ্চ অগ্রাধিকার দেয়া
হযরত আনাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু হতে বর্ণিত আছে নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি আমাকে ভালোবাসবে জান্নাতে সে আমার সাথে অবস্থান করবে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন, তোমাদের মধ্যে কেউ সেই পর্যন্ত পূর্ণ ঈমানদার হবে না যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার পিতা, সন্তান এবং অন্যান্য সকল লোকের চাইতে অধিক প্রিয় হব।
ভালোবাসার প্রমাণ ও পুরস্কার
হযরত আনাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু হতে বর্ণিত আছে যে, এক ব্যক্তি নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর সামনে হাজির হয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! কিয়ামত কবে হবে? রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম পাল্টা জিজ্ঞাসা করলেন, কিয়ামতের জন্য কি পরিমাণ আমল প্রস্তুত করেছ? অর্থাৎ কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে কি হবে, আমল করো তাহলে পরকালে কাজে আসবে। লোকটি বলল, আমি কিয়ামতের জন্য নামায, রোযা, সদকাহ ইত্যাদি বেশি করতে পারিনি, তবে আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলকে ভালোবাসি। রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি যাকে ভালোবাস তার সাথেই থাকবে।
নবী করীম ( )কে দেখার সৌভাগ্য
হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু হতে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ্ সাল¬াল¬াহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল¬াম বলেছেন, আমার উম্মতের মধ্যে আমাকে যারা বেশি ভালোবাসবে তারা হল পরবর্তীকালের উম্মত। তারা নিজেদের সকল মালামাল দান করেও আমাকে এক নজর দেখবার জন্য মনে-প্রাণে প্রস্তুত থাকবে। এটা আমার প্রতি তাদের অফুরন্ত ভালোবাসারই প্রমাণ। এই হাদীসে বর্ণিত দেখা, সাক্ষাৎ বা দীদার স্বপ্নের মাধ্যমে হওয়ার প্রতি যেমন ইঙ্গিত বহন করে, তেমনি এই সাক্ষাৎ বা দীদার জাগ্রত অবস্থায়ও হতে পারে। আশেকে রসূল, উম্মত এবং আল্লাহর প্রিয় ওলিরা জাগ্রত অবস্থায় ও দীদার লাভ ধন্য হয়ে থাকেন।
স্বপ্নযোগে রসূল ( )কে দেখা একান্তই সত্য ও বাস্তব
যে ব্যক্তি স্বপ্নযোগে রসূলে করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে দেখল, প্রকৃতই সে সন্দেহাতীতভাবে যথার্থই তাঁকেই দেখল। এটা এজন্য যে, শয়তান তাঁর আকৃতি ধারণ করতে পারে না। শয়তানকে এই শক্তি দেয়া হয়নি যে, সে রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর আকৃতি ধারণ করে ধোঁকা দেবে বা প্রতারণা করবে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- যে আমাকে (স্বপ্নে) দেখল, সে প্রকৃতই আমাকে দেখল। হযরত জাবির রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু হতে বর্ণিত হয়েছে, রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি স্বপ্নযোগে আমাকে দেখল, সে সত্যিই আমাকে দেখল। মোদ্দাকথা হচ্ছে শয়তানকে যদিও যে কোন প্রকারের আকৃতি ধারণ করার শক্তি দেয়া হয়েছে কিন্তু রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর আকৃতি ধারণ শক্তি তাকে দেয়া হয়নি। এর কারণ হলো রসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর পবিত্র সত্তা হচ্ছে, হেদায়ত ও নূর প্রকাশকারী। আর শয়তান হচ্ছে পথভ্রষ্টতা, গোমরাহী, অন্ধকার প্রকাশকারী ও নাপাক। হেদায়ত ও নূর এবং গোমরাহী ও জুলুমাত কখনো এক রকম হতে পারে না। রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর পবিত্র সত্তার মাঝে গোমরাহী ও অন্ধকারাচ্ছন্নতার সাদৃশ্যতার কোন উপযোগিতাই নেই। এটা মুক্ত ও পবিত্র।
কোন কোন ওলামায়ে কিরামের বক্তব্য
কেউ কেউ বলেন, এ মর্যাদাটি সকল নবীর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য এবং শয়তান কোন নবীর আকৃতিই ধারণ করতে পারে না। আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি উল্লেখ করেছেন যে, এ মর্যাদা শুধু কেবল রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর জন্যই নির্দিষ্ট।
বিশেষ কোন আকৃতিতেই দেখার শর্ত নেই
স্বপ্নযোগে রসূলে করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে দেখার ক্ষেত্রে বিশেষ কোন আকৃতিতে দেখার শর্ত নেই। যে কোন ব্যক্তি যে আকৃতিতেই দর্শন করুক না কেন, প্রকৃত প্রস্তাবে যেন তাকেই দর্শন করল। আবার কেউ কেউ দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে বলে থাকেন যে, বিশেষ আকৃতিতে দেখলেই তা সঠিক বলে ধরে নেয়া যায়। মোট কথা, যে ব্যক্তি ওই আকার আকৃতিতে দেখল বাস্তবে রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর যে আকার ছিল, তাই যথার্থ দর্শন বলে মনে করা যাবে। কোন কোন ব্যক্তি আরও সংক্ষেপ করে বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে ওই বিশেষ আকৃতিতে যে দেখল দুনিয়া হতে বিদায় হওয়ার সময় তাঁর আকৃতি ছিল, এমনকি তারা নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এ দাড়িগুলোর মধ্যে পাকা দাড়িগুলোর প্রতিও লক্ষ্য রাখেন। অর্থাৎ রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর দাড়ি মোবারক বিশটির অধিক পাকা ছিল না। তাদের কথা হল, স্বপ্নের তাবির বলতে পারঙ্গম ব্যক্তি ইমাম ইবনে সিরীনের নিকট কেউ যদি এসে বলত, আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে স্বপ্নে দেখেছি, তখন তিনি তাকে জিজ্ঞেস করতেন, বল, কোন আকৃতিতে দেখেছ? যদি সে ওই আকৃতির কথা বলত, যে রকম আকৃতি রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর ছিল, তবে তিনি তাকে উত্তর করতেন, তুমি ঠিকই তাঁকে দেখেছ। অন্যথায় তিনি বলতেন, তুমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর যিয়ারত করনি।
হযরত ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আনহুর নিকট কোন ব্যক্তি বলল, আমি স্বপ্নযোগে রসূলে করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে দেখেছি। তিনি জানতে চাইলেন, কোন আকৃতিতে সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে দেখেছ? লোকটি বলল, সায়্যিদুনা হাসান রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর আকৃতিতে দেখেছি। তখন ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বললেন, তুমি রসূলে করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে ঠিকই দেখেছ। কোন কোন উলামায়ে কিরাম বলেন, তাঁর বিশেষ ও পরিচিতি প্রকৃত আকৃতিতে দেখা হচ্ছে প্রকৃত অবস্থার উপলব্ধি। আর অন্য কোন আকৃতিতে দেখা চচ্ছে, তাঁর মতো আকৃতির উপলব্ধি। তবে সমস্ত মুহাদ্দিসের ঐকমত্য অনুযায়ী সঠিক কথা এটা যে, যে কোন আকৃতিতেই দেখুক না কেন, প্রকৃতপক্ষে তা নবীর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকেই দেখেছে বলে ধরা হবে। অবশ্য তাঁর প্রকৃত আকৃতিতে দেখা পরিপূর্ণতার দাবি রাখে। আকৃতিগত পার্থক্যই ধারণাগত পার্থক্য। যার ধারণার আয়না ইসলামের নূর দ্বারা যতটুকু পরিস্কার ও নূরান্বিত হবে, তাঁর দর্শনও ততটুকু সঠিক ও পরিপূর্ণ হবে।
রসূলুল্লাহ্ ( )কে স্বপ্নযোগে দর্শন করার পর জাগ্রত অবস্থায় দর্শন করা
সহীহ মুসলিম শরীফে বর্ণিত হয়েছে, রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে আমাকে স্বপ্নযোগে দেখল, সে অচিরেই আমাকে জাগ্রত অবস্থায় দেখবে। এই হাদীসের ব্যাখ্যা সম্পর্কে মাশায়েখগণ বিভিন্ন অভিমত ব্যক্ত করেছেন। শায়খুল হাদীস আল্লামা ছফী উল্লাহ্ মুছাপুরী রহমাতুল্লাহি আলায়হি বলেছেন, যে ব্যক্তি রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে স্বপ্নযোগে দর্শন করবে, সে জাগ্রত অবস্থায়ও তাঁর দর্শন লাভে ধন্য হবে। তাঁর পবিত্র হায়াতে যেমন সত্য, এর অনেক সহীহ বর্ণনা পাওয়া যায়। অনুরূপভাবে রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামএর ওফাতের পরও তা সত্য। আল্লাহ্পাকের অনেক পেয়ারা বান্দাহ্ স্বপ্নযোগে তাঁর যিয়ারত লাভে যেমন ধন্য হয়েছেন তেমনি তারা জাগ্রত অবস্থায় দেখার সৌভাগ্যও অর্জন করেছেন। এ বিষয়ে সহীহ বর্ণনা পাওয়া যায়। ‘আযযিকরুল মাইমুন’ নামক কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে হাজির হয়ে এই নিবেদন পেশ করল যে, আমার পিতা একেবারেই বৃদ্ধ। তিনি রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে হাজির হওয়ার সামর্থ রাখে না। তবে তিনি রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে স্বপ্নযোগে দর্শন লাভ করেছেন। এই কথা শ্রবণ করে রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করলেন, ‘মান রাআনী ফিল মানামে ফাছাইয়ারানী ফিল ইয়াকজাতে’ অর্থাৎ যে আমাকে স্বপ্নে দেখবে, অবশ্যই অচিরই সে জাগ্রত অবস্থায় আমাকে দেখবে। সেই বৃদ্ধ লোকটি জাগ্রত অবস্থায়ও রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর দর্শন লাভে ধন্য হয়েছিলেন।
বস্তুত, স্বপ্নযোগে রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর দর্শনের মাধ্যমে যে এক বিশেষ প্রকারের মহব্বত ও নৈকট্য অর্জিত হবে, তারই দর্শনের মাধ্যমে সেই মহব্বত ও নৈকট্যের বিশুদ্ধতা ও বাস্তবতা বিকশিত হয়ে উঠবে। রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর জবানের বাণী ‘ফাইয়ারানী’ (অবশ্যই অচিরেই সে আমাকে দেখবে) বাক্যের মাধ্যমে এই বিশেষত্বটিই মূর্ত হয়ে ফুটে উঠেছে।
কোন কোন হাদীসের ভাষ্যকার উপরোল্লিখিত হাদীসের মর্ম এভাবে বিশ্লেষণ করেছেন যে, যে ব্যক্তি রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে স্বপ্নযোগে দেখবে, সে আখেরাতে জাগ্রত অবস্থায় তাঁর দর্শন লাভে ধন্য হবে। কিন্তু এই ব্যাখার ওপর মন্তব্য করতে গিয়ে রইসুল মোহাদ্দেসীন শায়খ আবদুল হক মোহাদ্দেসে দেহলভী রহমাতুল্লাহি আলায়হি বলেছেন, আখেরাতে সকল উম্মতই রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর দর্শন লাভ করবে। আখেরাতের দর্শন সকলের জন্যই অবারিত ও উন্মুক্ত থাকবে। সুতরাং ‘ফাছাইয়ারানী’ (অবশ্যই অচিরেই সে আমাকে দেখবে) বাক্যের মর্মকে সংকুচিত করে কেবলমাত্র আখেরাতের দর্শনের সাথে নির্দিষ্ট করা সমীচীন হবে না। বস্তুত এই হাদীসটি কোন কোন মহান আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত পেয়ারা বান্দাহ্ এবং আল্লাহর রাস্তায় সাধনায় নিমগ্ন কোন ব্যক্তির জন্য এই সুসংবাদ প্রদান করে যে, যে কোন সময় এই নিয়ামত দ্বারা ধন্য হয়ে জাগ্রত অবস্থায় রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর সাক্ষাৎ লাভ করার মর্যাদা ও সৌভাগ্য লাভে ধন্য হবে। এটা আল্লাহপাকের এক পরম চরম ফযল ও অনুগ্রহ। তিনি যাকে চান এই ফযল ও অনুগ্রহ দ্বারা সৌভাগ্যবান করেন।
সুস্বপ্ন নবুয়তের অংশ
হাদীস শরীফে মুমিনের স্বপ্নকে নবুয়তের অংশ (জুযউম মিনান নবুয়ত) বলা হয়েছে। অর্থাৎ মুমিনের স্বপ্ন নবুয়তের এলেমের অংশ বিশেষ। মহান আল্লাহ্ পাক নবুয়তের এলমকে কতখানি সম্প্রসারিত করেছেন, তা আল্লাহ্ পাকই ভালো জানেন। তবে, মুমিনের স্বপ্ন নবুয়তের এলেমের ছেচল্লিশ ভাগের এক ভাগ অথবা পঁয়তাল্লিশ ভাগের একভাগ অথবা চল্লিশ ভাগের এক ভাগ, অথবা এরও কমবেশী উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন বর্ণনায় বিভিন্ন প্রকার অংশের কথা বলা হয়েছে। সে যাই হোক, এ সকল বর্ণনায় অংশ বলতে (জুযউন) কি বুঝানো হয়েছে এ সম্পর্কে হাফেজ ইবন হাজার আসকালানী রহমাতুল্লাহি আলায়হি বুখারী শরীফের ব্যাখ্যায় অনেকের মতামতের কথা উল্লেখ করেছেন। আর তাবরীজ কিতাবের লেখকও এ বিষয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন।
কিন্তু হাফেজ মোল্লা আলী ক্বারী রহমাতুল্লাহি আলায়হি এ সম্পর্কে এক ইনসাফ ভিত্তিক সমাধান প্রদান করে বলেছেন- ‘যেহেতু সুস্বপ্নকে নবুয়তের এলেমের একাংশ বলা হয়েছে আর এলমে নবুয়ত নবীদের জন্যই নির্দিষ্ট ও নির্ধারিত সুতরাং বর্ণিত অংশকেও নবীদের জন্য নির্দিষ্ট বলে মনে করাই যথেষ্ট। আমাদের জন্য এতটুকু অবগত হওয়াই যথেষ্ট যে, সুস্বপ্ন বা ভালো স্বপ্ন নবুয়তের অংশসমূহের মধ্যে একটি অংশ মাত্র। নবুয়তের এলেমের সৌন্দর্য, ব্যপ্তি এবং মহানতার উপলব্ধির জন্য এটাই যথেষ্ট। তবে, নবীগণ নবুয়তের এলেমের অংশসমূহ সম্পর্কে পরিপূর্ণ ওয়াকেফহাল ছিলেন। তারা অবশ্যই ভালোভাবে অবগত ছিলেন যে, সুস্বপ্ন কিভাবে ছেচল্লিশ ভাগের একভাগ হয়েছে। অনুসরণকারী উম্মতের জন্য নবুয়তের এলেমের কোনও অংশের চুলচেরা বিশ্লেষণ করা ও এর পরিমাণ নির্ধারণ করা মোটেই সম্ভব নয়। (ওয়াল্লাহু ওয়াছিউন আলীম) আল্লাহ্ পাকই সর্বজ্ঞ।
স্বপ্ন বাস্তব না ধারণা প্রসূত
একথা সত্য যে, সুস্বপ্ন বাস্তব ও যথার্থ, আর নফসের ধ্যান-ধারণারপ্রসূত স্বপ্ন ধারণা সম্ভুত। অর্থাৎ স্বপ্নদ্রষ্টার জাগ্রত অবস্থায় যা কিছু সংঘটিত হয়, নিদ্রিতাবস্থায়ও তা দেখা যায়। সুনানে আবু দাঊদ শরীফে বর্ণিত আছে যে, কোন কোন স্বপ্ন মানুষের ধ্যান-ধারণা এবং চিন্তা ভাবনা দ্বারা উৎপন্ন হয়ে থাকে। এ ধরনের স্বপ্ন সত্য এবং মিথ্যা উভয়ই হতে পারে। আর আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত এই যে, মানুষের অন্তরে আল্লাহ্ পাকের কুদরতের দৃষ্টি কিংবা ফিরিশতাদের দ্বারা যে স্বপ্ন উপস্থাপন করা হয়, তা বাস্তব ও সুস্বপ্ন। যে সকল ফিরিশতা স্বপ্ন দেখানোর কাজে নিয়োজিত রয়েছে তাদেরকে সিদ্দীকুন বলা হয়। তারা মানবাকৃতিতে স্বপ্ন দেখান। তবে, রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে স্বপ্নে দেখার ব্যাপারে শয়তানের কোন হস্তক্ষেপ থাকে না। রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম স্পষ্টই বলেছেন, যে আমাকে স্বপ্নে দেখে সে যথার্থই আমাকে স্বপ্নে দেখে। শয়তান কোন ক্রমেই আমার আকৃতি ধারণ করতে পারবে না।’ কিন্তু তা সত্ত্বেও কেউ যদি রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে তার যথার্থ আকৃতিতে না দেখে, তবে তা হবে স্বপ্ন দর্শকের ব্যক্তিগত অবস্থার প্রতিফলন। সে ব্যক্তিগত অবস্থা অনুযায়ীই রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে দেখে থাকে। যেমন কোন বস্তুকে কোন লাল আয়নায় দেখলে তা লালই দৃষ্টিগোচর হবে। অনুরূপভাবে সবুজ আয়নায় দেখলে সুবজ এবং দীর্ঘ আয়নায় দেখলে দীর্ঘ দেখা যাবে। তেমনি যে যে প্রকৃতির লোক সে তেমন অবস্থায় রসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর দর্শন লাভে ধন্য হবে। এ প্রসঙ্গে শায়খুল হাদীস মাওলানা সায়্যেদ মুফতী আমিমুল ইহসান রহমাতুল্লাহি আলায়হি বলেছেন- ‘দর্শনকারী কখনো রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে যথাযথভাইে দর্শন লাভ করে। অথবা ছুরতে মেছালী (উপমা আকৃতি) দেখে। যেমন কোন ব্যক্তি আড়ালে বসে তার সম্মুখ হতে বেশ কিছু দূরে একটি বড় আয়না রাখল। দ্বিতীয় কোন ব্যক্তি সেই আড়ালের পেছনে হতে সম্মুখে বসা ব্যক্তির প্রতিবিম্ব দেখল। স্বপ্নযোগে এই উভয় প্রকার দর্শন হতে পারে। কেউ রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে স্বয়ং দেখে এবং কেউ আয়নায় প্রতিফলিত প্রতিবিম্বের ন্যায় দেখে থাকে।
‘ফাক্বাদ রাআনী’ এর মর্ম
রসূলুল্লাহ্ এর বাণী- ‘যে ব্যক্তি আমাকে স্বপ্নে দেখে সে যথার্থই আমাকে দেখে।’ এ কথার মর্ম ও বিশ্লেষণ খুবই ব্যাপক এবং বিস্তৃত। এ পর্যায়ে একটি প্রশ্নের উদয় হতে পারে যে, গোটা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এবং বিভিন্ন স্থানের মুমিন মুসলমানগণ একই সময়ে রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে স্বপ্নযোগে দর্শন লাভ করে থাকে। সুতরাং রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম সমস্ত লোকের সাথে কেমন করে একই সময়ে দেখা দিতে পারেন? এটা কেমন করে সম্ভব? এই প্রশ্ন অথবা এ জাতীয় প্রশ্ন যাদের মনে উদয় হয়, তারা অভিশপ্ত ও ভ্রান্ত সম্প্রদায়ভুক্ত। তাদের ও জাতীয় প্রশ্নের কোন মূল্য নেই। তা প্রকৃতই ভিত্তিহীন, অসার। কারণ, রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন হয় না। তিনি সকল অবস্থায় রওযা মোবারকেই অবস্থান করেন। এখান হতেই তার নবুয়তের নূরের জ্যোতি কুল-মাখলুকাতকে আলো দান করে থাকেন। যেমন সূর্যোদয় হলে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের লোক সূর্যকে অবলোকন করে, অথচ সূর্য একই স্থানে থাকে। মোটকথা, যে যে রকম রংয়ের চশমা দিয়ে দেখে, সে সেই রংয়েরই দেখে। অথচ সূর্যের আকৃতির কোনই পরিবর্তন হয় না। স্থানচ্যূতিরও প্রয়োজন পড়ে না।
আউলিয়ায়ে কেরামের কারামত
যে সকল মুর্দা দিল, পথভ্রষ্ট, বদ আকীদাসম্পন্ন মানুষ ওলী আউলিয়াদের কারামতের ওপর বিশ্বাস করে না, তাদের কথা আলাদা। কেননা, তাদের ঈমান ও একীন এতই ত্র“টিপূর্ণ যে, তাদের কাছে অনেক সত্যমত ও পথ অগ্রহণীয়ই রয়ে গেছে এবং থাকবে। কিন্তু যারা ওলী আওলিয়াদের কারামতকে বিশ্বাস করেন এবং এর সত্যায়ন করেন তাদের জানা থাকা উচিত যে, পেয়ারা নবী মুহাম্মদুর রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর জাগ্রত অবস্থায় দর্শন লাভ করা মূলত ওলী আউলিয়াদের কারামতের সাথেই সংশ্লিষ্ট। মহান আল্লাহ্ পাকের মর্জি মোতাবেক আউলিয়ায়ে কেরাম থেকে কারামত প্রকাশ পাওয়া এমন অস্বাভাবিক ও অত্যাশ্চার্য ঘটনা, যা ঊর্ধ্ব জগত অথবা নিম্নজগত হতে বিকশিত হতে পারে। এর উপর মানুষের কোন হাত নেই, অধিকার নেই। মাওয়াহিবে লাদুন্নিয়া, তাওছিকু ইবরাছিল ঈমাম, বাহজাতুন নুফুস, রওজুর রায়াহীন ইত্যাদি গ্রন্থে পূর্ববর্তী ও এমন অনেক পুণ্যবান লোকদের বিষয়ে আলোচিত হয়েছে। যারা স্বপ্নযোগে রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর দর্শন লাভ করার পর জাগ্রত অবস্থায়ও তার সাক্ষাৎ লাভে কৃতার্থ হয়েছেন। হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম আবু হামেদ গাজ্জালী রহমাতুল্লাহি আলায়হি বলেছেন, আরবাবে কুলুব (অর্থাৎ যাদের কলবসমূহ আল্লাহর ও রসূলের মহব্বত ও মারেফাতের নূরে পরিপূর্ণ)। জাগ্রত অবস্থায় মালাইকাদের এবং অম্বিয়ায়ে কেরামের রূহসমূহ প্রত্যক্ষ করেন, তাদের বাক্যালাপের আওয়াজ শ্রবণ করেন এবং তাদের নিকট হতে হেদায়েতের নূর সংগ্রহ করেন এবং নানাভাবে ফায়দা হাসিল করেন।
‘বাহজাতুল আসরার’ গ্রন্থে শায়খ আবুল আব্বাস আহমদ ইবনে শায়খ আবদুল্লাহ্ আযহারী হুসায়নী রহমাতুল্লাহি আলায়হি হতে বর্ণিত আছে তিনি বলেন, আমি একদিন শায়খ সায়্যিদুনা গাওসুস্ সাকালাইন মুহীউদ্দীন আবদুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহি আলায়হি এর মজলিসে উপস্থিত হলাম। এই মজলিসে দশ হাজার লোক উপস্থিত ছিল। শায়খ আলী ইবনে হায়তী রহমাতুল্লাহি আলায়হি মজলিসের সম্মুখভাগে অবস্থান করছিলেন। এই স্থানটি তার জন্য নির্দিষ্ট করে রাখা হয়েছিল। অল্পক্ষণের মধ্যেই তিনি নিদ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়লেন। এমন সময় শায়খ মুহীউদ্দীন আবদুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহি আলায়হি রাগত স্বরে বলেন, তোমরা চুপ কর। সবাই নিশ্চুপ ও নরীব হয়ে গেল। নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ ছাড়া কিছুই অবশিষ্ট রইল না। তারপর শায়খ জিলানী রহমাতুল্লাহি আলায়হি মিম্বর হতে অবতরণ করলেন এবং শায়খ হায়তী রহমাতুল্লাহি আলায়হি-এর সম্মুখে আদবের সাথে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং গভীর দৃষ্টিতে তার প্রতি তাকিয়ে রইলেন। তারপর যখন শায়খ জিলানী রহমাতুল্লাহি আলায়হি তাকে সম্বোধন করে বলেন- হে মান্যবর, আপনি হয়তো রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর দর্শন লাভ করেছিলেন। তিনি উত্তর করলেন, হ্যাঁ। শায়খ গাউসুল আযম রহমাতুল্লাহি আলায়হি বললেন, এজন্যই আমি আদব রক্ষা করে দাঁড়িয়ে ছিলাম। রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আপনাকে কি নসিহত করেছেন? তিনি উত্তর দিলেন, আপনার খেদমতে উপস্থিত থাকার হুকুম প্রদান করেছেন। এ সময় হযরত শায়খ হায়তী রহমাতুল্লাহি আলায়হি উপস্থিত লোকজনদের লক্ষ্য করে বললেন, আমি স্বপ্নযোগে যা কিছু দেখেছি, হযরত গাউসুল (রহমাতুল্লাহি আলায়হি) জাগ্রত অবস্থায়ই তা প্রত্যক্ষ করেছেন। সুবহানাল্লাহ্!
প্রকৃত অবস্থার মূল্যায়ন
শায়খ বদরুদ্দীন হাসান ইবনে আহরাল রহমাতুল্লাহি আলায়হি হতে মাওয়াহিবু লাদুন্নিয়া গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে যে, জাগ্রত অবস্থায় রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর দর্শন লাভের ঘটনা আওলিয়ায়ে কেরাম মুহাদ্দেসীনে এজাম ও আরবাবে কুলুব বান্দাহদের নিকট হতে তাওয়াতুর অর্থাৎ অবিচ্ছিন্নভাবে অধিকসংখ্যক ব্যক্তির সাক্ষ্যের আলোকে সত্য প্রমাণিত হয়েছে, যাদের উপযুক্ত শক্তিশালী এলেম অর্জিত ছিল। যাদের এলেম ও আমলের মধ্যে বিন্দু পরিমাণ সংশয় সন্দেহের অবকাশ নেই বা ছিল না। মহান রাব্বুল আলামীন তাদেরকে এমন মর্যাদা ও মর্তবা এনায়েত করেছিলেন, যা ছিল ‘আন তা’বুদাল্লাহা কা আন্নাকা তারাহু’ (অর্থাৎ তুমি আল্লাহ পাকের ইবাদত এমনভাবে করবে যেন তুমি তাকে দেখছ) এর বাস্তব প্রতিফলন। রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর দর্শন লাভের সময় তাদের অনুভব ও অনুভূতি শক্তি সার্বিকভাবে হারিয়ে যায় এবং তাদের মধ্যে এমন একটি অবস্থা ছায়া বিস্তার করে যা কোন ভাষার মাধ্যমে প্রকাশ করা যায় না। তাদের মর্যাদা ও মর্তবা অনুসারে দর্শনের মধ্যেও ভিন্ন ভিন্ন অবস্থাসমূহ প্রকাশ পেয়ে থাকে। কখনো তারা স্বপ্নযোগে দর্শন লাভ করেন। আবার কখনো অনুভব শক্তির প্রাবল্য হেতু জাগ্রত অবস্থার মতই দীদার লাভে কৃতার্থ হন। আবার কখনো নিদ্রা এবং জাগ্রত অবস্থার মাঝামাঝি অবস্থায় প্রত্যক্ষ দর্শনের আস্বাদ অনুভব করেন। এমতাবস্থায় রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর দর্শন লাভ তদ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় হয়ে থাকে। মোটকথা, এই পরিবেশে প্রেমিক এবং প্রেমাস্পদের মধ্যে যে দর্শনজনিত আনন্দ ও শান্তির ঝর্ণাধারা বইতে থাকে, তা বাইরে থেকে উপলব্ধি করা মোটেই সম্ভব নয়। এজন্যই মরমী কবি গেয়েছেন-
‘মিয়ানে আশেক ও মাশুক কেহ রমজিস্ত,
কিরামান কাতিবীন রা হাম খবর নিস্ত’-
অর্থাৎ প্রেমিক ও প্রেমাস্পদের মধ্যে যে গোপন রহস্য প্রবাহ হতে থাকে, তার খবর কিরামান কাতেবীন ফিরিশতাও সংগ্রহ করতে পারে না।

শেয়ার
  •  
  •  
  •  
  •