সদকায়ে জারিয়ার ফযিলত- অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ আবু তৈয়ব চৌধুরী

0

‘একজন আনসারী সাহাবী প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট জানতে চাইলেন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে জ্ঞানী ও সম্মানিত ব্যক্তি কে? রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বললেন, যারা মৃত্যুকে সর্বাধিক স্মরণ করে এবং এর জন্য সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করে তারাই সর্বাধিক জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান; তারাই দুনিয়ার সম্মান ও আখেরাতের মর্যাদা অর্জন করে।’
দুনিয়ার জীবন আখেরাতের জীবনের তুলনায় অত্যন্ত ছোট হলেও এ ক্ষুদ্র জীবনের অর্জনের উপরই নির্ভরশীল আখেরাতের সুদীর্ঘ জীবনের শান্তি ও মুক্তি। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম কবরে একজন মৃত মানুষকে মহা সাগরে পতিত অসহায় ব্যক্তির সাথে তুলনা করেছেন, যে সামান্য খড়কুটা আকঁড়ে ধরেও বাঁচার প্রাণপণ চেষ্টা করে। এ চরম অসহায়ত্বের মাঝে ঘোর অন্ধকার কবরে মানুষের একমাত্র সঙ্গী তার নেক আমল। বান্দা মৃত্যুর পর কোন নেক আমল করতে অক্ষম হলেও চলমান থাকবে সাদ্কায়ে জারিয়ার সাওয়াব।
নবী আকরম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন-
اِذَا مَاتَ الاِنْسَانُ اِنْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلَهُ اِلَّا مِنْ ثَلَاثَةٍ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ اَوْعِلْمٍ يُنْفَعُ بِهِ اَوْوَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُوْلَهُ- (رواه مسلم)
অর্থ: ‘যখন আদম সন্তান মারা যায় তখন তার সকল আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি বিষয় ব্যতীত। ১. সদকায়ে জারিয়াহ্, ২. এমন ইলম বা জ্ঞান যা দ্বারা মানব জাতি উপকৃত হয়, ৩. এমন সুসন্তান যে তার জন্য দো‘আ করে। [মুসলিম শরীফ] সদকায়ে জারিয়া কী
প্রবহমান সদকা তথা সদকায়ে জারিয়া হলো এমন সদকা যার ফলে বান্দাহর নেক আমলনামা মৃত্যুর পরও চলমান থাকে। আল্লাহর পথে এমন কিছু সদকাহ বা দান করা যার ফলাফল দ্রুত মিলে। যেমন কোন অনাহারী কে খাবার দান করা, যা দ্বারা সে একবার ক্ষুধা মেটাল। দাতা একবারই সাওয়াব পাবেন। পক্ষান্তরে এমন কিছু দান আছে ফলাফল বা সাওয়াব দীর্ঘস্থায়ী হয়। যেমন কোন অভাবীকে স্থায়ী আয়বর্ধক সম্পদ দান করা, যা দিয়ে আয় করে সে তার সাময়িক প্রয়োজন পূরণ করতে পারে এবং দীর্ঘ মেয়াদে এর দ্বারা অর্জিত সম্পদ দিয়ে প্রয়োজন পূরণের পাশাপাশি নিজেও যাকাত দিতে ও দান সদকা করতে পারে। যার সাওয়াব উক্ত দানকারীর আমলনামায় মৃত্যুর পরও পৌঁছে দেয়া হয়। তাছাড়া মসজিদ, রাস্তা, ঘাট, সাঁকো নির্মাণ করলে কিংবা জায়গা জমি ওয়াকফ করলে যতদিন পর্যন্ত তা কায়েম থাকবে ততদিন দাতার আমলনামায় সাওয়াব পৌঁছতে থাকবে। এভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মাদরাসা, মসজিদ, এতিমখানা, হাসপাতাল নির্মাণ করলে বা নির্মাণে বিভিন্নভাবে সাহায্য করলে, এসব প্রতিষ্ঠান যতদিন জারি থাকবে শিক্ষার্থীরা সুশিক্ষা অর্জন করবে, রোগাক্রান্তরা চিকিৎসা সেবা পাবে ততদিন ওই দাতার আমলনামায় সাওয়াব পৌঁছতে থাকবে। আর ওই জ্ঞান যার দ্বারা মানব জাতি উপকৃত হয়, যতদিন জ্ঞানের চর্চা থাকবে কিংবা ঐ জ্ঞান দ্বারা আমলের সিলসিলা জারি থাকবে ততদিন ওই জ্ঞানদাতার আমলনামায় সাওয়াব পৌঁছতে থাকবে।
সদকায়ে জারিয়ার গুরুত্ব
পবিত্র ক্বোরআনে আল্লাহ্ তা‘আলা পরকালীন অনন্ত জীবনের সুখ স্বাচ্ছন্দ, নিরাপত্তার জন্য বান্দাহদেরকে দান-সদকার ব্যাপারে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন-
اَلَّذِيْنَ يُنْفِقُوْنَ اَمْوالَهُمْ بِاللَّيْلِ وَالنَّهَارِ سِرًّا وَعَلَانِيَةً فَلَهُمْ اَجْرُهُمْ عِنْدَ رَبِّهِمْ وَلَاخَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَاهُمْ يَخْزَنُوْنَ- (سورة البقرة)
অর্থাৎ- ‘যারা রাতে ও দিনে প্রকাশ্যে ও গোপনে আল্লাহর পথে স্বীয় সম্পদ ব্যয় করে, তাদের জন্য পুরস্কার রয়েছে তাদের প্রভুর নিকট। তাদের কোন ভয় নেই আর তারা চিন্তিতও হবে না।’ [সূরা বাক্বারা: ২৭৪] অন্যত্র আল্লাহ্ এরশাদ করেন-
مَثَلُ الَّذِيْنَ يُنْفِقُوْنَ اَمْوَالَهُمْ فِى سَبِيْلِ اللهِ كَمَثَلِ حَبَّةٍ اَنْبَتَتْ سَبْعَ سَنَابِلَ فِىْ كُلِّ سُنْبُلَةٍ مِأَئَةَ حَبَّةٍ وَاللهُ يُضَاعِفُ لِمَنْ يَّشَاء وَاللهُ وَاسِعٌ عَلِيْمٌ- (سورة البقرة)
অর্থ: ‘যারা নিজেদের সহায় সম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয় করে, তাদের উপমা হল, একটি শস্য দানা যা সাতটি শিষ উৎপাদন করে, প্রত্যেক শিষে একশত শস্যদানা হয়, আল্লাহ্ যাকে ইচ্ছা বহুগুণে বাড়িয়ে দেন। আল্লাহ্ প্রাচুর্যময় ও জ্ঞানী। [সূরা বাক্বারা: ২৬১] নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম উম্মতদেরকে সদকায়ে জারিয়ার জন্য নানাভাবে উৎসাহিত করেছেন। এমর্মে তিনি এরশাদ করেন- হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবীজী এরশাদ করেন, ‘‘মানুষ বলে আমার সম্পদ আমার সম্পদ, আসলে সে ধরনের সম্পদই তার নিজের যা সে খেয়ে ফেলেছে, যা সে পরিধান করেছে। অতঃপর যা সে দান করেছে এবং মানুষকে সন্তুষ্ট করেছে, এতদ্ব্যতীত যে সম্পদ রয়েছে তাতো পড়ে থাকবে।’’ [মুসলিম শরীফ] অন্যত্র নবী করিম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন- ‘মানুষের বিচার ফায়সালা না হওয়া পর্যন্ত অর্থাৎ ক্বিয়ামতের ময়দানে উপস্থিত না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেকেই তার সদকার ছায়ায় অবস্থান করবে।
[আহমদ] সাহাবীদের জীবনে সদকার আমল
একদিন হযরত উমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু খাইবর এলাকায় একখন্ড জমি পেলেন, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে বললেন, আমি ‘খাইবরে’ একখন্ড জমি পেয়েছি, এর চেয়ে উত্তম কোন সম্পদ আমি কখনো পাইনি। এ ব্যাপারে কী করা আমার জন্য উত্তম হবে? তখন রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি তোমার মালিকানা অক্ষুণœ রেখে একে সদকা করে দিতে পার। অতঃপর হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু এটি দরিদ্র, নিকটাত্মীয়, দাস-দাসী, দুর্বল ও অসহায় মুসাফিরদের কল্যাণে সদকা করলেন এবং শর্তারোপ করলেন যে, এটি কখনো বিক্রি করা যাবে না।’
এ মর্মে আল্লাহ্ তা‘আলার বাণী-
مَنْ ذَا الَّذِىْ يُقْرِضُ اللهَ قَرْضًا حَسَنًا فَيُضَاعَفه لَهُ اَضْعَافًا كثيرة وَاللهُ يَقْبِضُ وَيَسْبُطُ وَاِلَيْهِ تُرْجَعُوْنَ-
অর্থ: কে সে যে আল্লাহ্ কে করযে হাসানা প্রদান করবে? তিনি তার জন্য তা বহুগুণে বৃদ্ধি করে দেবেন। আর আল্লাহ্ সংকুচিত ও সম্প্রসারিত করেন এবং তাঁর দিকেই তোমাদেরকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে।
[সূরা বাক্বারা: আয়াত ২৪৫] তাফসিরে ইবনে কাছিরে বর্ণিত আছে, হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে মাসঊদ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, উক্ত আয়াত অবতীর্ণের পর হযরত আবু দাহদাহ্ আনসারী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেন, হে রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম! আল্লাহ্ তা‘আলা কি আমাদের নিকট করযে হাসানা চান? রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ। তখন হযরত আবু দাহদাহ্ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেন, হে রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আপনার হাত মোবারক প্রদর্শন করুন, রাসূল আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম হযরত আবু দাহদাহ্ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু-এর সামনে স্বীয় হাত মোবারক বের করে ধরলেন। তখন হযরত আবু দাহদাহ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বললেন, আমি আমার প্রভুকে বাগানটি ‘‘করযে হাসানা’’ দিলাম। বর্ণনাকারী হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে মাসঊদ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেন, তাঁর বাগানে ছয়শতটি খেজুর গাছ ছিল।
অন্যত্রে হযরত আনাস ইবনে মালিক রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, হযরত আবু তালহা ছিলেন আনসারী সাহাবীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী সম্পদশালী এবং তাঁর নিকট অত্যন্ত পছন্দনীয় সম্পদ ‘বাইরোছা’ নামক বাগানটি। এটি ছিল মসজিদে নববীর সামনে। রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এতে প্রবেশ করতেন এবং পানি পান করতেন। যখনই আল্ ক্বোরআনের নিম্নোক্ত আয়াতটি অবতীর্ণ হল- তা হল-
لَنْ تَنَالُ البِرَّ حَتَّى تُنْفِقُ مِمَّا تُحِبُّوْنَ-
অর্থাৎ তোমরা তোমাদের পছন্দনীয় সম্পদ থেকে ব্যয় না করা পর্যন্ত পূর্ণ সাওয়াব অর্জন করতে পারবে না।
[সূরা আলে ইমরান: আয়াত ৯২] তখন আবু তালহা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম! আমার সবচেয়ে প্রিয় সম্পদ ‘বাইরোহা’। এটি আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দান করে দিলাম।
আমি এর মাধ্যমে আল্লাহ্র নৈকট্য আশা করি। তারপর সরকারে দোজাহান সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘বাইরোহা’ লাভজনক সম্পদ। এটি তোমার গরীব নিকটাত্মীয়দের মধ্যে বন্টন করে দাও। এরপর তিনি তাদের মাঝে বন্টন করে দিলেন।
দুনিয়ায় সম্পদের পাহাড় না গড়ে পরকালীন নাজাতের নিমিত্তে সাহাবাদের ন্যায় পার্থিব সম্পদকে সৎ পথে সদকা করার সদিচ্ছা মৃত্যুর পূর্বেই বাস্তবায়ন করা ঈমানদারী কাজ। কেননা মানুষের মৃত্যু এক মুহূর্তেও বিলম্বিত হবে না। এ মর্মে পবিত্র ক্বোরআনে এসেছে-
وَاَنْفِقُوْا مِنْ مَّا رَزَقْنَاكُمْ مِنْ قَبْلِ اَنْ يَّاتِىَ اَحَدُكُمُ الْمَوْتُ فَيَقُوْلُ رِبِّ لَوْلَ اَخَّرْتَنِىْ اِلَى اَجَلٍ قَرِيْبٍ فَاَصَدَّقَ وَاَكُنْ مِنَ الصَّالِحِيْنَ وَلَنْ يُّوَخَّرَ اللهُ نَفْسًا اِذَا جَاءَ اَجَلُهَا وَاللهُ خَبِيْرٌ بِمَا تَعْمَلُوْن-
অর্থ: তোমরা মৃত্যু আসার পূর্বেই আল্লাহ্ প্রদত্ত রিযিক থেকে ব্যয় কর, যখন তোমরা এই বলে আফসোস করবে এবং বলবে হে আমার প্রভু আমাকে যদি অল্প সময়ের অবকাশ দেয়া হতো তাহলে আমি সদকা করতাম এবং নেককারদের অন্তর্ভুক্ত হতাম। কিন্তু কারো মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলে আল্লাহ্ তা কখনো এক মুহূর্তের জন্যও পিছিয়ে দেননা। তোমরা যে আমল কর আল্লাহ্ সে সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত আছেন। [সূরা মুনাফিকুন: ১০/১১] ইসলামী সভ্যতার বিকাশ, দ্বীনি শিক্ষার প্রসার, দাওয়াতে খাইরের খেদমত জরি রাখার নিমিত্ত মসজিদ, মাদরাসা, এতিমখানা তৈরি, রাস্তাঘাট তৈরি বা মেরামত, দান-খায়রাত করা এবং ভারসাম্য পূর্ণ আর্থ সামাজিক ব্যবস্থার ভূমিকা অনস্বীকার্য।
একটি প্রস্তাবনা: দেশের বৃহত্তম দ্বীনি সংস্থা আনজুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট কর্তৃক পরিচালিত ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি প্রতিষ্ঠানসমূহ আমাদের দ্বীনিয়াত, সঠিক আক্বিদা বিশ্বাস পোষণ এবং অকৃত্রিম ভালবাসার প্রাণ কেন্দ্র। এ প্রাণ প্রিয় প্রতিষ্ঠান সমূহের কাছে আমরা চিরঋণী। যা হাজার হাজার শিক্ষার্থী সঠিক আক্বিদা পোষণের মাধ্যমে প্রকৃত আলেম হয়ে বিশ্বের প্রত্যন্ত অঞ্চলে দ্বীনের আলো ছড়াচ্ছে। এ সব প্রতিষ্ঠানে সদকায়ে জারিয়ার মাধ্যমে ইহকালীন শান্তি পরকালীন মুক্তি অর্জনে সবাই সাধ্যমতো এগিয়ে আসতে পারেন।