মানবজীবনে তাকওয়ার প্রভাব – কাজী আবুল কালাম সিদ্দীক

0

মানুষের জীবনে সাফল্য অর্জনে তাকওয়ার প্রভাব অনবদ্য ও অপরিমেয়। বিশেষ করে সকল মুসলিমের ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে তাকওয়ার সুদূর প্রসারী প্রভাব অনস্বীকার্য। সামাজিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা আনয়নে তাকওয়া তথা সুস্থ মানসিকতা, মননশীলতা ও আল্লাহ্্ ভীতির কোনো বিকল্প হয় না। সকল মুসলিমকেই তাকওয়া অবলম্বন করতে হয়। ঈমানের পরেই একজন মুমিনকে সর্বক্ষেত্রে যে নীতি অবলম্বন করতে হয় তার নাম তাকওয়া। আমরা ইবাদত-বন্দেগিসহ যেসব ভালো কাজ করি তা কিন্তু তাকওয়ার ভিত্তিতেই সম্পাদন করি। ভাবি, আমি যা করছি তা আল্লাহ্্ দেখছেন। তাই তা সুন্দর করে আদায় করতে হবে। এমনইভাবে আমরা যখন পাপাচার থেকে বিরত থাকছি তখনও কিন্তু তাকওয়ার নীতি অবলম্বন করেই বিরত থাকছি। পাপ কাজ করলে আল্লাহ্্ অসন্তুষ্ট হবেন, শাস্তি দেবেন তাই পাপাচারে লিপ্ত হওয়া যাবে না। এমন একটি ভাবনা নিয়ে আমরা পথ চলে থাকি। কাজেই তাকওয়া এমন একটি নীতি, একজন মুমিন ব্যক্তি একটি মুহূর্তও এ নীতির বাইরে কাটাতে পারে না।

ইসলামী পরিভাষায় তাকওয়া
ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় তাকওয়া অর্থ হলোÑ “আল্লাহ্্্ তা‘আলার ভয়ে নিষিদ্ধ বস্তুসমূহ হতে দূরে থেকে ইসলাম নির্ধারিত পথে চলার আপ্রাণ চেষ্টা করা। অথবা, যে কাজ করার কারণে মানুষকে আল্লাহ্্র শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে, তা থেকে নিজেকে রক্ষা করা হচ্ছে তাকওয়া। আল্লাহ্্র পক্ষ থেকে প্রাপ্ত করুণা, ভালোবাসা, দয়া ও অনুগ্রহ হারানোর ভয় অন্তরে সদা জাগ্রত থাকার নাম তাকওয়া।” [ইসলামী বিশ্বকোষ : ১২শ খ-, পৃ. ১০৭।]

সাহাবাদের দৃষ্টিতে তাকওয়া
তাকওয়া সব কল্যাণের আধার, আল কোরানে সর্বাধিক উল্লিখিত একটি মহৎ গুণ। প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য, কাছের অথবা দূরের সকল কল্যাণের মূল হলো তাকওয়া। অনুরূপভাবে প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য, কাছের অথবা দূরের সকল অন্যায় ও পাপাচারের বিরুদ্ধে তাকওয়া হলো প্রতিরোধক দূর্গ। ঈমান হলো তাকওয়ার প্রথম ধাপ। অর্থাৎ এক আল্লাহ্্র প্রতি বিশ্বাস করার মাধ্যমে তাকওয়ার জগতে একজন মবনুষের প্রবেশ ঘটে। যাদের ঈমান নেই তারা মুত্তাকিদের দলভুক্ত নয়। কেননা তাকওয়া হলো আল্লাহ্্কে ভয় করার নাম। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ্্কে চেনে না, বিশ্বাস করে না; তার আল্লাহ্্কে ভয় করার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। তাকওয়ার কারণে আল্লাহ্্র কাছে একজন মুত্তাকি ব্যক্তির মর্যাদা বেড়ে যায়।
১. হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু একবার উবাই ইব্নু কা’ব রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বললেন, “আপনি তাকওয়া সম্পর্কে আমাকে বলুন। জবাবে তিনি বললেন, ‘আপনি কি কখনও কণ্টকাকীর্ণ পথ দিয়ে চলেছেন? আমীরুল মুমিনীন হযরত ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, কাপড় চোপড় গুটিয়ে অত্যন্ত সাবধানে চলেছি। কা’ব রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ওটাই তো তাকওয়া।” [তাফসীর খাযেন : পৃ. ২৮; মা’আলিমুত তানযীল : পৃ. ৩৫] বস্তত বিবেকের সার্বক্ষণিক সচেতনতা ও সতর্কতা, চেতনা ও অনুভূতির স্বচ্ছতা, নিরবচ্ছিন্ন সাবধানতা, জীবন পথের কণ্টকসমূহ থেকে আত্মরক্ষার প্রবণতা, অব্যাহত ভীতিÑ এ সবেরই নাম তাকওয়া। জীবন পথের কণ্টকসমূহ হচ্ছে প্রবৃত্তির কুৎসিত কামনা, বাসনা ও প্ররোচনা। অন্যায় লোভ-লালসা, মোহ, ভয়-ভীতি ও শংকা, আশা পূরণে সক্ষম নয় এমন কারো কাছে মিথ্যা আশা পোষণ করা, ক্ষতি বা উপকার সাধনে সক্ষম নয় এমন কারো মিথ্যা ভয়ে আক্রান্ত হওয়া ইত্যাদি।
২. হযরত আলী ইবনে আবী তালিব রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “তাকওয়া হচ্ছে পাপ কাজে জড়িয়ে থাকাকে ছেড়ে দেয়া এবং সৎকাজে প্রতারিত হওয়াকে ছেড়ে দেয়া।”
[ইমাম ফখরুদ্দীন আল রাযী, বৈরুত, দার ইহইয়াউত
তুরাছ আল আরাবী, ১৯৯৭, খ–১, পৃ. ২৬৮] কোরআনে কারীমের বাণীÑ
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اعْبُدُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ وَالَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
“হে মানবসমাজ! তোমরা তোমাদের প্রভুর ইবাদত কর, যিনি তোমাদেরকে এবং তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে সৃষ্টি করেছেন, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।” (সূরা বাকারাহ্ : আয়াত ২১) এর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে আল্লামা কাযী নাসিরুদ্দীন বায়যাবী রহ. বলেন, “এর দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ্্র পথের পথিকদের সর্বশেষ স্তর। আল্লাহ্্ ব্যতীত সবকিছু থেকে মুক্ত হয়ে কেবল আল্লাহ্্মুখী হয়ে জীবন যাপন করা এবং ইবাদতকারী যেন তার ইবাদত দ্বারা প্রতারিত না হয়; বরং সে ভয় ও আশা নিয়ে ইবাদত করবে। যেমন আল্লাহ্্্ তা’আলা অন্যত্র বলেছেনÑ “তারা তাদের প্রভুর ইবাদত করে ভয়ে ভয়ে ও আশায় আশায়। তারা তাঁর রহমতের প্রত্যাশা করে এবং তাঁর শাস্তিকে ভয় করে।”
[তাফসীরে বায়যাবী : পৃ. ৪১]

৩. হযরত আবদুল্লাহ ইবন ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “তাকওয়া হচ্ছে নিজেকে অন্য যে কারোর তুলনায় উত্তম মনে না করা।” [তাফসীরে খাযেন : খ- ১, পৃ. ৩৫] এ কথার অর্থ এ নয় যে, একজন মানুষ নিজেকে হীন, তুচ্ছ, নিকৃষ্ট ও অবহেলিত মনে করবে; বরং এ কথার প্রকৃত মর্ম হচ্ছে, আল্লাহ্্্র নির্দেশ পালন তথা ব্যক্তি জীবন থেকে রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইসলামের যে বিধি-নিষেধ রয়েছে তা মানার ক্ষেত্রে সে ইবলিসের মতো এ কথা বলবে না যে, “আমি তার (আদম আলাইহিস সালাম) চেয়ে উত্তম-শ্রেষ্ঠ; আপনি আমাকে আগুন দিয়ে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে মাটি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন।” (আল কোরআন, ৭ : ১২) অর্থাৎ সে অহংকারী হবে না।
৪. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু মুত্তাকীদের পরিচয় দিয়ে বলেন, “যারা মহান আল্লাহ্্র শাস্তিকে ভয় করে এমন সব কর্মকাণ্ড ছেড়ে দিয়ে, যেগুলোর হারাম হওয়া সম্পর্কিত বিধান আল্লাহ্্র দেয়া হেদায়েত তথা কোরআন ও হাদীস থেকে তারা জানে এবং অনুসরণের জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা নিয়ে এসেছেন তার প্রতি দৃঢ় বিশ্বাসী হয়ে আল্লাহ্র রহমত কামনা করে।”
[তাফসীরে তাবারী : খ- ১, পৃ. ১৪; আদ্দুররুল মানসূর : পৃ ৬০] তিনি আরো বলেন, “যে ব্যক্তি নিজেকে শিরক, কবীরা গুনাহ্ ও অশ্লীল কাজকর্ম ও কথাবার্তা থেকে বিরত রাখে, তাকে মুত্তাকী বলা হয়।” [দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম : পৃ. ৬৯৫] ৫. হযরত আবদুল্লাহ ইব্ন মুবারক রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “যদি কোন ব্যক্তি পরিহারযোগ্য একটি বিষয়ও করে তাহলে সে ব্যক্তি মুত্তাকীদের অন্তর্ভুক্ত হবে না।” [আদ্দুররুল মানসূর : পৃ. ৬১] ৬. হযরত আবূ দারদা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “সম্পূর্ণ তাকওয়া হলোÑ বান্দা আল্লাহ্্কে ভয় করবে (করণীয় বিষয়) ত্যাগ করতে গিয়ে কিছু হালালও বর্জন করবে এই ভয়ে যেন তাকে হারামে পড়তে না হয়; আর সামান্য হালাল বর্জন যেন হারাম এবং হালালের মাঝখানে পর্দা-দেয়াল হয়ে যায়।” [আদ্দুররুল মানসূর : পৃ. ৬১]

তাকওয়ার গুরুত্ব
তাকওয়া হচ্ছে মূল্যবোধ, মানসিক শুদ্ধতা ও দৃঢ়তা। এটি যে কোন ধরনের পদঙ্খলন থেকে মানুষকে রক্ষা করে; সকল মন্দ অশালীন কথা, কাজ ও পরিবেশ থেকে ফিরিয়ে রাখে; ‘খাহেশাতে নাফসানী’ তথা প্রবৃত্তির খেয়াল-খুশি বা অভিলাষ ও দুষ্টচক্রের ফাঁদে পড়ে নিজের ক্ষতি করা থেকে এবং পরিবার, সমাজ ও দেশের ক্ষতি করা থেকে রক্ষা করে। জনমানব শূন্য নির্জন স্থানে বা দুর্নীতি করার অসংখ্য সহজ পথ উন্মুক্ত থাকার পরও যে শক্তি মানুষকে তাতে লিপ্ত হওয়া থেকে বিরত রাখে তা-ই তাকওয়া।
তাকওয়া মানুষের মধ্যে ন্যায়-অন্যায় ও সত্য-মিথ্যা পার্থক্য করার শক্তি জাগ্রত করে। তাই সে সত্য-মিথ্যা ন্যায়-অন্যায় ও ভালো-মন্দ চিনতে এবং তা অনুধাবন করতে ভুল করে না। তার হাতে তাকওয়ার আলোকবর্তিকা থাকার ফলে জীবন পথের মন্দ দিকসমূহ সে স্পষ্টত দেখতে পায়। বিবেচনার শক্তির প্রখরতা ও বুদ্ধিদীপ্ততা তার মধ্যে এমনভাবে কাজ করে যে, তার কাছে তখন ইহ-পারলৌকিক যে কোন বিষয়ের কোনটি সঠিক আর কোনটি ভুল তা স্পষ্টতই ধরা পড়ে। ফলে সে কোন সংশয়, দ্বিধা-দ্বন্ধ, ইতস্তত, দুর্বলতা ও হীনমন্যতা ছাড়াই দিবালোকের মত সুস্পষ্ট ও সঠিক পথে চলতে সক্ষম হয়। অন্ধকারাচ্ছন্ন গভীর সমুদ্রে কম্পাস বা দিক-দর্শন যন্ত্র যেমন সমুদ্রাভযাত্রীকে সঠিক দিক-নির্দেশনা দিয়ে থাকে, সমস্যা-সংকুল জীবন পথে তাকওয়াও তেমনি মানুষকে নির্ভুল পথের সন্ধান দেয়। মানুষের ব্যক্তি ও সামাজিক চরিত্র গঠনে তাকওয়ার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব অপরিসীম।

তাকওয়ার ফলাফল
মানুষের মনের রাজ্য নিয়ন্ত্রক তাকওয়া কারো ভেতরে থাকলে সে অসদাচরণ করতে পারবে না। সে দুর্নীতি করবে না, মানুষকে ঠকাবে না, প্রতারণা করবে না, সুদ-ঘুষের বাণিজ্য করবে না, কালোবাজারির আশ্রয় নেবে না, মিথ্যা কথা বলবে না ও অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে হরণ করবে না। ইসলামের সোনালী যুগে শক্তিশালী আইন-প্রশাসন তেমন ছিল না, কিন্তু মানুষের ভেতরে ছিল তাকওয়ার প্রভাব। আজও একটি সুষ্ঠু, সুন্দর, সুশীল ও কাক্সিক্ষত সমাজের জন্য তাকওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
হযরত আবু সাঈদ খুদরী রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, বনী ইসরাঈলের জনৈক ব্যক্তি নিরানব্বই জন মানুষকে হত্যা করে দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ আলেমের সন্ধান করল। অতঃপর তাকে একজন খ্রিস্টান পাদ্রীর কথা বলা হলে সে তার নিকট এসে বলল যে, সে নিরানব্বইজন ব্যক্তিকে হত্যা করেছে। এমতাবস্থায় তার জন্য তওবার কোন সুযোগ আছে কি? পাদ্রী বলল, নেই। ফলে লোকটি পাদ্রীকেও হত্যা করল। এভাবে তাকে হত্যা করে সে একশত সংখ্যা পূর্ণ করল। অতঃপর পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আলেমের সন্ধান করায় তাকে একজন আলেমের কথা বলা হল। সে তাঁর নিকট গিয়ে বলল যে, সে একশ’জনকে হত্যা করেছে, এখন তার জন্য তওবার কোন সুযোগ আছে কি? আলেম বললেন, ‘হ্যাঁ, আছে। তার ও তার তওবার মাঝে কিসে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করল? তুমি অমুক জায়গায় চলে যাও। সেখানে কিছু লোক আল্লাহ্্র ইবাদত করছে। তুমিও তাদের সাথে ইবাদত কর। আর তোমার দেশে ফিরে যাবে না। কেননা ওটা খারাপ জায়গা। লোকটি নির্দেশিত জায়গার দিকে চলতে থাকল।
অর্ধেক পথ অতিক্রম করলে তার মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলো। সে তার বক্ষদেশ দ্বারা সে স্থানটির দিকে ঘুরে গেল। মৃত্যুর পর রহমতের ও আযাবের ফেরেশতামণ্ডলীর মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিল। রহমতের ফেরেশতা বললো, এ লোকটি নিখাদ তওবার মাধ্যমে আল্লাহ্্র দিকে ফিরে এসেছে। পক্ষান্তরে আযাবের ফেরেশতা বলল, লোকটিতো কখনও কোন ভালো কাজ করেনি। এমন সময় অন্য এক ফেরেশতা মানুষের রূপ ধারণ করে তাদের নিকট আগমন করলেন। তখন তারা তাকেই এ বিষয়ের শালিস নিযুক্ত করল। তিনি বললেন, ‘তোমরা উভয় দিকের জায়গার দূরত্ব মেপে দেখ। যে দিকটি নিকটবর্তী হবে, সে দিকেরই সে অন্তর্ভুক্ত হবে’। আল্লাহ্ তা‘আলা সামনের ভূমিকে আদেশ করলেন, তুমি মৃত ব্যক্তির নিকটবর্তী হয়ে যাও এবং পেছনে ফেলে আসা স্থানকে আদেশ দিলেন, তুমি দূরে সরে যাও। অতঃপর জায়গা পরিমাপের পর যেদিকের উদ্দেশ্যে সে যাত্রা করেছিল, তারা তাকে সেদিকেরই এক বিঘত পরিমাণ নিকটবর্তী পেল। ফলে তাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হ’ল এবং রহমতের ফেরেশতা তার জান কবয করল।
[সহীহ্ বোখারী : হাদীস নম্বর ৩৪৭০, সহীহ্ মুসলিম : হাদীস নম্বর ২৭৬৬] উপরিউক্ত হাদীস থেকে এ কথা সহজেই প্রতীয়মান হয় যে, পাপী যদি পাহাড় পরিমাণও পাপ করে তবুও সে আল্লাহ্্র রহমত থেকে নিরাশ না হয়ে খালেস অন্তরে তওবা করলে আল্লাহ্ তাকে ক্ষমা করতে পারেন। যেমন তিনি বলেনÑ
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
‘বল, হে আমার বান্দাগণ! তোমরা যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ আল্লাহ্্র অনুগ্রহ হ’তে নিরাশ হয়ো না; আল্লাহ্ সমুদয় পাপ ক্ষমা করে দেবেন। তিনি তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’। [সূরা যুমার : আয়াত ৫৩] এ হাদীস থেকে আমরা আরও শিখতে পারলাম যে, মূর্খ ব্যক্তি কোন সমস্যায় পড়লে কুরআন-সুন্নাহ্তে অভিজ্ঞ কোন আলেমের কাছে জিজ্ঞেস করে তার সমস্যার সমাধান করে নেবে। মহান আল্লাহ্ বলেনÑ
فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ
‘যদি তোমরা না জান তাহ’লে সুস্পষ্ট দলীল-প্রমাণসহ জ্ঞানীদের কাছে জিজ্ঞেস কর’। [সূরা নাহ্ল : আয়াত ৪৪]

তাকওয়া অর্জনের উপায়
তাকওয়া অর্জনের উপায় হচ্ছেÑ মানুষ এই চিন্তা করবে যে, আমি আমার অনিবার্য পরিণতি মৃত্যু পরবর্তী অবধারিত যিন্দেগীর জন্য কী প্রস্তুতি গ্রহণ করেছি? আখিরাতের জন্য কী করলাম? উদাহরণ প্রতি রাতে নিয়মিত বিছানায় শুতে যাওয়ার পূর্বে কিছুক্ষণ বসে এই চিন্তা করা, কিয়ামত ও হিসাব দিবস কী জিনিস। মৃত্যুর পর আমাদের কী কী পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে, মৃত্যু থেকে নিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করা পর্যন্ত কী কী দুঃসহ অবর্ণনীয় অবস্থার মুখে পড়তে হবে, সেই দিন সুনিশ্চিতই সমাগত যে দিন অবশ্যই আমাকে এই নশ্বর ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীকে চিরবিদায় জানাতে হবে, ধন-সম্পদ, অর্থবিত্ত বাড়ি-গাড়ি, বাগ-বাগিচা, চাকর-নফর, সন্তান-সন্ততি, স্ত্রী-পরিজন, পিতা-মাতা, ভাই-বোন শত্রু-মিত্র সবই প্রতারণার এই খেলাঘরে রয়ে যাবে, আমাকে সহায় সম্বলহীন হয়ে সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ ও একাকী অবস্থায় কবর-গর্তে পড়ে থাকতে হবে, যেখানে দু’জন ফেরেশতা আসবে, আমার আমলনামা ভালো হলে সুন্দর আকৃতি ধারণ করে আসবে, মন্দ হলে অত্যন্ত ভয়ঙ্কর আকৃতি নিয়ে হাজির হবে, ততোধিক ভীতিকর ভাষায় প্রশ্ন করবে, কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করবে, তাই হে মানুষ! তখন সেখানে তোমার কোন সহায় সম্বল ও বন্ধু-বান্ধব থাকবে না যারা তোমাকে সাহায্য করবে, সেখানে শুধু তোমার আমলই কাজে আসবে, অন্য কিছু নয় এবং কিছুমাত্রও নয় যদি সকল প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দিতে পারলে কবরের দিকে জান্নাতের জানালা খুলে যাবে কিয়ামত অবধি নিশ্চিন্তে ঘুমানো যাবে। আল্লাহ্্ না করুন যদি তাদের প্রশ্নমালার সঠিক উত্তর দিতে ব্যর্থ সে নিঃসঙ্গ ‘কবরবাস’ নরককুণ্ড ও জাহান্নামগর্তে পরিণত হবে। তারপর কিয়ামতের দিন কবর থেকে উঠানো হবে, আমলনামা হাতে প্রদান করা হবে, তাতে ভালো-মন্দ, ছোট-বড় সকল আমল লিপিবদ্ধ থাকবে। গোটা জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের পাই পাই হিসাব দিতে হবে, চরম ঝুঁকিপূর্ণ পুলসিরাত পাড়ি দিতে হবে, হে দুরাত্মা নফস! তুমি কোন ধোকার ফাঁদে পড়ে আছ, এসবই তুমি বিশ্বাস কর নির্ভুল সত্য বলে জান যে, এসব ঘটবেই ঘটবে, এর বিন্দুমাত্র ব্যত্যয় হবে না। তারপরও কী করে গাফেল ও উদাসীন হয়ে থাক? কিভাবে অন্যায় ও পাপাচারে জড়িয়ে পড়ার ধৃষ্টতা প্রদর্শন কর? যেন দুনিয়ায় চিরকাল অবস্থান করবে। হে দুরাত্মা নফস! তুমি আপন মঙ্গলচিন্তা কর, তুমি যদি তোমার মঙ্গলকামী না হও তাহলে বল তোমার মঙ্গলকামী আর কে আছে। যদি এভাবে প্রতিদিন নিয়মিত ঘণ্টা দেড় ঘণ্টা চিন্তা করা হয় তাহলে আল্লাহ্্ পাকের ইচ্ছা হলে দু’চার দিনের মধ্যেই দেখা যাবে অন্তরে ভয় জন্মে গেছে আর ভয় জন্মাতেই দেখবেন অতীতকৃত গোনাহ থেকে তওবা করার ভাবনায় তাড়িত হওয়া শুরু হবে এবং আগামীতে নেককাজ করা সহজ হতে থাকবে।
যে ব্যক্তি স্বতঃস্ফূর্তভাবে আল্লাহর আনুগত্য করবে সে এই মহাদৌলত অর্জন করবে। ইশক ও মহব্বত ছাড়া স্বতঃস্ফূর্ত তাবেদারী ও আনুগত্য সম্ভব নয়। যতক্ষণ পর্যন্ত হৃদয় ও আত্মার গহীনে আল্লাহ্্ এবং তাঁর রাসূলের মহব্বত গভীরভাবে প্রথিত না হয় ততক্ষণ পর্যন্ত খুশি মনে স্বতঃস্ফূর্ত আনুগত্য সম্ভব নয়। আল্লাহ্্ এবং তাঁর রাসূলের স্বতঃস্ফূর্ত আনুগত্য তখনই সম্ভব যখন হৃদয়জুড়ে কেবল আল্লাহ্্ ও তাঁর রাসূলের ভালোবাসা থাকে। আর আল্লাহ্্ এবং আল্লাহ্্র রাসূলের ইশক ও মহব্বত সৃষ্টি করার পদ্ধতি হল- বেশি বেশি আল্লাহ্্ পাকের নেয়ামত ও অনুগ্রহসমূহ স্মরণ করা। এর জন্যেও একটি সময় নির্ধারণ করে নেয়া এবং প্রতিদিন চিন্তা করা যে, আল্লাহ্্ তাআলার কী অপরিসীম নেয়ামত ও অনুগ্রহ আমাদের ওপর বিরাজমান। এমন করে ভাবতে থাকলে দু’ চার দিনের মধ্যে দেখতে পাব যে, আমরা আল্লাহ্্ পাকের কী সীমাহীন দয়া ও অনুগ্রহে ডুবে আছি। আপাদমস্তক কেবল আল্লাহ্্ পাকের দয়া আর দয়া মায়া আর মায়া করুণা আর করুণা দেখতে পাব। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রেম ও ভালোবাসা সৃষ্টির পদ্ধতিও এটি অর্থাৎ আমাদের প্রতি তাঁর দয়া ও অনুগ্রহের বিষয়গুলো স্মরণ করা যে, তিনি আমাদের জন্য কত অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট সহ্য করেছেন তা কি বর্ণনা করে শেষ করা যাবে, উম্মতের জন্য তাঁর দরদ ব্যথা মায়া মমতার কথা হয়ত বলা কিংবা লেখা শুরু করা যাবে কিন্তু শেষ তো করা যাবে না। প্রতিদিন কিছুটা সময় নির্ধারণ করে নিয়মিত উম্মতের প্রতি তাঁর দান-অবদান দয়া ও অনুগ্রহসমূহ চিন্তা করতে থাকলে ধীরে ধীরে অন্তরে তাঁর প্রেম ভালোবাসা ও মহব্বত সৃষ্টি হবে।
হৃদয়ে যখন তাঁর প্রেমের আসন তৈরী হয়ে যাবে তখন আনুগত্যও স্বতঃস্ফূর্তভাবে হবে। একদিকে ভয় আরেক দিকে ভালোবাসা এই দুইয়ের শুভ সম্মিলন আমাদের দীন দুনিয়া সহজ সুন্দর ও সাফল্যমণ্ডিত করে তুলবে।

তাকওয়ার পথে বাধা
১. বাছ-বিচারহীন উদারতা: কেউ কেউ বলেন, ধর্ম নিয়ে খুব বেশি বাড়াবাড়ি করা উচিত না। তবে আমাদের জানা উচিত যে, ইসলামের চেয়ে উদার ও আধুনিক কোনো ধর্ম-দর্শন পৃথিবীতে আরেকটি নেই। মনোরঞ্জনের সেই সমস্ত মাধ্যম ও উপকরণকে ইসলাম অনুমোদন দিয়েছে, যা শরিয়তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয় এবং যা করতে গিয়ে কোনো হারাম ও নিষিদ্ধ কাজে জড়িয়ে পড়তে হয় না। কিন্তু যেখানে শরিয়তকে হেয় করা হয়, ইসলামের নিদর্শনাবলীকে পিষ্ট করা হয় এবং যেসব কর্মকাণ্ড আকিদায়ে তাওহিদ ও ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গির পরিপন্থী হয় সেখানে এতটুকু উদার ও শিথিল মনোভাব দেখানোর কোনো অবকাশ নেই।
মুসলমান চূড়ান্ত পর্যায়ের আধুনিক চিন্তার অধিকারী। তবে তা হবে অবশ্যই শরিয়তের অনুমোদনসাপেক্ষে। কিন্তু যেখানেই হারাম ও দীনপরিপন্থী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দেয় এবং সমাজে প্রচলিত রুসম-রেওয়াজ দীন-শরিয়তের জন্য সমূহ আশঙ্কা সৃষ্টি করে সেখানেই মুসলমান সংকীর্ণতার পরিচয় দেয় এবং চোখ বন্ধ করে শরিয়তের হুকুমের অনুগামী হয়ে যায়। আর এখানে অবশ্যই তাদের এই সংকীর্ণতা কাম্য। যেমন কেউ বলল, বর্তমান সময়ে মহিলাদের ঘরের বাইরে নিয়ে পুরুষের সমান অধিকার দেওয়া উচিত। সহশিক্ষায় ক্ষতির কোনো আশংকা নেই। যুবক-যুবতীদের একত্রে মিলে তাদের চিন্তা আদানপ্রদান করার সাধারণ অনুমোদন দেওয়া উচিত। মহিলাদের চেহারা খুলে পরপুরুষের সামনে গেলে কোনো সমস্যা নেই। এসব কথা আওড়ানো শরিয়তের দৃষ্টিতে আদৌ উদারতা বলা যেতে পারে না। শরিয়তের ব্যাপারে চরম অজ্ঞতার কারণেই কেবল একজন মানুষ এই ধরনের কথা বলতে পারে।
আধুনিকতার নামে এবং দীনের প্রতি আস্থাহীনতার কারণে মুসলিম-সমাজে দিনদিন শরিয়তবিরোধী কর্মকাণ্ড বেড়েই চলছে আর এর অন্যতম প্রধান ও মৌলিক কারণ হল আমাদের নতুন প্রজন্ম দীনি শিক্ষা থেকে যোজন যোজন দূরত্বে অবস্থান করছে। ভুল বিশ্বাসের পেছনে দৌড়াচ্ছে। তারা মনে করছে, আমাদের সন্তানরা মিশনারি, ইংলিশ-মাধ্যম ও অ-ইসলামি স্কুলে পড়াশোনা করছে, তাতে সমস্যা কোথায়! আমরা বাড়িতে তাদের জন্য আলাদা কুরআন শরিফ পড়ানোর ব্যবস্থা রেখেছি। বাড়িতে তারা নিয়মিত নামায আদায় করে। রোযা রাখে। হ্যাঁ, আপনি স্বীকার করছেন যে, সকালবেলা আপনার সন্তান স্কুলে গিয়ে শিরকি শিক্ষাব্যবস্থার অধীনে লেখাপড়া করছে। আর সন্ধ্যাবেলা বাড়িতে এসে তাওবা করছে। আপনার এই আচরণ অনেকটা এমন হয়ে যাচ্ছে যে, সকালবেলা কাউকে বিষ খাইয়ে দিলেন। তারপর তা থেকে নিরাময় লাভের জন্য সন্ধ্যাবেলা ওষুধ সেবন করালেন। বিষ তো বিষই। মৃত্যুর পূর্বে তার ক্রিয়া প্রকাশ পেয়েই যাবে। মানুষ যদি তাওবা না করে তা হলে শিরকযুক্ত চরিত্রহীন শিক্ষা-ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়া মৃত্যুর পূর্বেই প্রকাশ পাবে। এমনিভাবে আপনি যদি তাদের দীনি-তালিমের বিষয়টি ¯্রফে দেখে দেখে কুরআন পড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেন তা হলে তাকে কখনোই দীনি-তালিম বলা যাবে না এবং এর মাধ্যমে কখনোই দীনি-তালিমের মাকসাদ ও উদ্দেশ্য পূর্ণ হবে না। যতক্ষণ পর্যন্ত অন্তরে আল্লাহ তায়ালার পরিপূর্ণ কুদরত ও শক্তি, অসাধারণ ইচ্ছাশক্তি ও কর্মক্ষমতার পূর্ণ একিন ও বিশ্বাস সৃষ্টি না হবে ততক্ষণ ঈমান পূর্ণাঙ্গ হবে না।
আজকাল আবার অনেকেই এই ভেবে আনন্দিত হয় যে, আমরা আমাদের সন্তানদের এমন মুসলিম স্কুলে ভর্তি করিয়েছি, যেখানে দীনি শিক্ষার ব্যবস্থাও রয়েছে। সেসব স্কুল মেয়েদের স্কার্ফের প্রতি বেশ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। ছেলেদের মাথায় টুপি ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক। আধুনিক শিক্ষার সাথে সাথে সেসব স্কুলে কেরাত ও কুরআন হেফজ করার সুব্যবস্থা রয়েছে। আরবিভাষাও গুরুত্ব দিয়ে পড়ানো হয়। কিন্তু মনে রাখবেন, কুরআন ও হাদিসে যেই দীনি শিক্ষার ফযিলত বর্ণিত হয়েছে, তার সঙ্গে এই শিক্ষার দূরতম সম্পর্ক নেই। এসব ইসলামি স্কুলগুলোয় লেখাপড়া করার সুবাদে আপনার সন্তানের এতটুকু উপকার হবে যে, তারা মোটামুটি দীন-শরিয়ত মেনে চলার মতো যোগ্যতা অর্জন করতে পারবে। এর বেশি কিছু আশা করা যায় না। এর মাধ্যমে তারা কখনোই দীনি শিক্ষার গভীরে পৌঁছোতে পারবে না। এই অর্জন দিয়ে তারা জীবনচলার পথে হালাল ও হারাম এবং ঈমান ও কুফুরের মধ্যকার পার্থক্যও নির্ণয় করতে পারবে না।
কয়েকটি ধর্মীয় পুস্তক অধ্যয়ন, কয়েকজন মুসলিম বক্তার আলোচনা শ্রবণ ও তাদের সঙ্গদান এবং আধুনিক বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে হয়তো আপনি ইসলামকে বোঝার দাবি করতে পারেন। নিজেকে ইসলামিক স্কলার হিসাবে জাহির করতে পারেন। কিন্তু এই অসম্পূর্ণ জ্ঞান দিয়ে উম্মতকে রাহনুমায়ী ও পথপ্রদর্শনের ফরয দায়িত্ব আনজাম দেওয়া কখনোই সম্ভব না এবং পা-কাঁপানো জটিল ক্ষেত্রে জায়েয-নাজায়েযের ফতোয়া ও ফয়সালা দেওয়াও সম্ভব না। এই যোগ্যতা অর্জিত হতে পারে কেবল দীনি মাদরাসায় নিয়মতান্ত্রিক ১২-১৪ বছর গভীর মনোযোগের সাথে পড়াশোনা ও অধ্যয়নের মাধ্যমে। হালাল-হারাম, ঈমান ও কুফুর এবং জায়েয-নাজায়েযের ফতোয়া ও ফয়সালা প্রদানের ফরয দায়িত্ব আনজাম দেওয়ার যোগ্যতা, দায়িত্ব ও অধিকার একমাত্র ওলামায়ে-কেরামের। কারণ তারা সঠিক ও মূলধারার দীনি মাদরাসা থেকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে শিক্ষাসমাপন করে বেরিয়ে এসেছেন। বর্তমান সময় ও পরিস্থিতিতে ঘরে ঘরে এইসব দায়িত্ব আনজাম দেওয়ার মতো যোগ্য আলেম গড়ে তোলা ফরযে-কেফায়া নয় বরং ফরযে-আইন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যথায় হালালের নামে হারামে লিপ্ত হওয়ার এবং ঈমানের নামে শিরকে জড়িয়ে পড়ার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে। আল্লাহতায়ালা আমাদের হেফাযত করুন।
২. মুখ ও লজ্জাস্থান : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আবু হোরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ও অন্যান্য সাহাবায়ে কেরামকে লক্ষ্য করে বললেন যে, দু’টি আমল এমন আছে, যা মানুষকে বেশি বেশি জান্নাতে প্রবেশ করায়। এক. আল্লাহ্র ভয়। দুই. উত্তম চরিত্র। এ দু’টি গুণ মানুষকে বেশি বেশি জান্নাতে প্রবেশ করায়।
এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু হোরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুকে আবার জিজ্ঞাসা করলেন, বললেনÑ اتدرون ما اكثر ما يدخل الناس النار. ‘তোমরা কি বলতে পার, তোমরা কি জানো এমন পাপের কথা, এমন গুনাহের কথা, যা মানুষকে বেশি বেশি দোযখে পৌঁছায়?’ এ কথা জিজ্ঞাসা করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই উত্তর দিলেনÑ الاجوفان: الـفم والـفرج. ‘দু’টি শূন্য গর্ত মানুষকে বেশি বেশি দোযখে প্রবেশ করায়। এক. মুখ। দুই. গুপ্তাঙ্গ।’
[মিশকাতুল মাসাবীহ : পৃষ্ঠা ৪১২] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সত্যই বলেছেন। এ দু’টি বস্তুর পাপ এমন যে, মানুষকে বেশি বেশি পাপ কাজে লিপ্ত করে এবং দোযখে নিক্ষেপ করে। এ দু’টি দ্বারা আমরা পাপ কাজ বেশি করে থাকি। সাধারণত অন্য অঙ্গের তুলনায় এ দু’টি অঙ্গ দ্বারা বেশি অন্যায় হয়। অন্য অঙ্গ দ্বারা কোন পাপ হলেও তার মূলে এ দুই অঙ্গই থাকে। এজন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন যে, এ দু’টি অঙ্গের কারণে মানুষ বেশি বেশি দোযখে যাবে। অন্যত্র রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনÑ
من يضمن لى ما بـين لـحيـيه وما بين رجليه اضمن له الـجنة.
‘যে ব্যক্তি মুখ এবং গুপ্তাঙ্গের পাপ থেকে হেফাযত থাকার দায়িত্ব নেবে, আমি রাসূল তাকে জান্নাতে পৌঁছানোর দায়িত্ব নেবো।’ [সহীহ্ বোখারী : পৃষ্ঠা ৪১১] সুতরাং এ দু’টি অঙ্গকে হেফাযত করতে হবে। এই মুখ আমাদের সর্বনাশ করে ফেলছে। এই গুপ্তাঙ্গ আমাদের জন্য দোযখের পথ প্রশস্থ করছে। এজন্য মুখ ও গুপ্তাঙ্গ হেফাযত করা একান্ত কর্তব্য।
মুখ ও জিহ্বার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনÑ
اذا اصبح ابن ادم فان الاعضاء كلها تكفر اللسان، فتقول اتق الله فينا، فانا نـحن بك، فان استقـمت استقـمنا وان اعوججت اعوججنا
‘বনি আদম যখন সকালে ঘুম থেকে ওঠে, তখন তার সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ জিহ্বা ও মুখের নিকট বিনয়ের সাথে বলে- হে মুখ, হে জবান, হে জিহ্বা! তুমি আমাদের ব্যাপারে আল্লাহ্কে ভয় কর। আমাদের ভালো-মন্দের ভিত্তি হলে তুমি। তোমার ওপর আমাদের ভালো ও মন্দ নির্ভর করে। তুমি যদি সোজা থাকো, তাহলে আমরাও সোজা। আর তুমি যদি বাঁকা হয়ে যাও, তাহলে আমরাও বাঁকা।’
[মিশকাতুল মাসাবীহ্ : পৃষ্ঠা ৪১৩] তার মানে যত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আছে, সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অনিষ্ট এবং ভালো-মন্দ নির্ভর করে জিহ্বা ও মুখের ওপর। জিহ্বা যদি ভালো থাকে, মুখ যদি ভালো থাকে, তাহলে সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ভালো থাকবে। আর মুখ ও জিহ্বা যদি খারাপ হয়ে যায়, তাহলে শরীরের প্রতিটি অঙ্গই খারাপের দিকে যাবে। এজন্য মুখ ও জিহ্বা ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
কিতাবে বর্ণিত আছে। হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু চৌরাস্তায় বসে বসে জিহ্বা ধরে টানাটানি করছেন। এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করল, কি ব্যাপার! কি হয়েছে? এমন করছেন কেন?
সেই আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু উত্তরে বললেন ‘এই জিহ্বা আমাকে বিভিন্ন বিপদে ফেলেছে। বেশি বেশি কথা বলে আমাকে বিপদে ফেলানোর কারণে আমি তাকে শাস্তি দিচ্ছি।’
হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু কখনো মিথ্যা কথা বলতে পারেন না। মিথ্যা বললে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে ‘সিদ্দীক’ উপাধি দিতেন না। ‘সিদ্দীক’ বলা হয়, যে ব্যক্তি জীবনে কোন দিন মিথ্যা কথা বলেননি। কখনো কারো গীবত করেননি। কখনো কোন অন্যায় কাজ করেননি। ইচ্ছাকৃত কোন পাপ কাজে লিপ্ত হননি। তারপরও তিনি জিহ্বা ধরে টানাটানি করে তাকে শায়েস্তা করছেন।
এ ধরনের দৃষ্টান্ত তাকওয়ার সাথে সম্পর্কযুক্ত। কাজেই তাকওয়া অর্জন করতে হলে আমাদের চলাফেরা, কথা-বার্তা ও আচার আচরণে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। এবং হৃদয়কে কলুষমুক্ত করে ইবাদত-বন্দেগিতে একনিষ্ঠ হতে হবে।