বাদশা আওরঙ্গজেবের কর্ম, জীবনের শেষপ্রান্তে অছিয়ত – আহমদুল ইসলাম চৌধুরী

0

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে দুই খণ্ডে প্রকাশিত সৈয়দ আবদুল হালিম রচিত ‘ইসলামের ইতিহাস’ গ্রন্থ আমার হস্তগত হয়। ভারতের মুর্শিদাবাদ থেকে ঢাকায় বসবাসকারী নুরুল আজিম কাদেরী আমাকে এ ইতিহাসগ্রন্থ প্রদান করেন। এখানে লেখক গোমল পূর্ববর্তী সুলতানী শাসকগণের নানান উদ্ধৃতির মাধ্যমে কড়া সমালোচনা করেন, তেমনি মোগল বাদশাগণের সমালোচনা করতে কুন্ঠাবোধ করেননি তিনি। আওরঙ্গজেব তাঁর ভ্রাতা দারা শুকোহকে আকবরের মত ধর্মত্যাগী বলে উল্লেখ করেছিলেন। বাদশা আওরঙ্গজেব মসনদে বসার পর নিুলিখিত নির্দেশনা জারি করেন।
১. নববর্ষ বা নওরোজ উৎসব বন্ধ করে দেওয়া হয়। যেহেতু তার ভাবাদর্শের অনুকুলে ছিল না।
২. মুসলমানগণের নৈতিক উন্নতির জন্য (শরীয়ত) অনুযায়ী ‘মুহতাসিব’ নামক কর্মচারী নিয়োগ করেন। পূর্বে এ পদ ছিল। কিন্তু তা যথাযথ কার্যকর অবস্থায় ছিল না।
৩. মদ্যপান নিষিদ্ধ করেন পরিপূর্ণ ভাবে।
৪. যেসব মসজিদ খানকাহ মেরামতের প্রয়োজন তা করার নির্দেশ দেন।
৫. মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনের নিয়মিত বেতন দেয়ার ব্যবস্থা করেন।
৬. দারা শুকোহ এর সঙ্গী সাথীদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। আর তাদের নেতা সারসাদকে প্রাণদণ্ড দেন।
৭. তাঁর শাসনের একাদশ বছরে তিনি রাজসভা থেকে গান বাজনা তুলে দেন।
৮. বাদশাহের জন্মদিনে তাকে বহু মুল্যবান পাথর ও সোনা রূপা দিয়ে ওজন করার প্রথা তুলে দেন।
৯. রাজ সভায় পরস্পরকে সম্বোধনের ইসলাম বিরোধী রীতি তুলে দিয়ে ইসলাম তথা মুসলমান রীতি ‘আস্সালামু আলায়কুম’ রীতি চালু করেন।
১০. জ্যোতির্বিদদের রাজসভা থেকে সরিয়ে দেন।
১১. বাদশার ঝরোকা (ছোট জানালা) দেখার প্রথা বাতিল করেন।
১২. সাধু সন্ন্যাসীদের ভাং তথা সিদ্ধি গাছের দ্বারা প্রস্তুত মাদকবিশেষ সেবন করা নিষিদ্ধ করেন দেন।
১৩. সুফি দরবেশের দরগায় নারীদের যাওয়া বন্ধ করে দেন।
১৪. রাজকীয় মুদ্রা থেকে কালিমা শরীফ তুলে দেন যাতে অপবিত্র অবস্থায় কেউ হাত দিতে না পারে।
১৫. জুয়া খেলা বন্ধ করে দেন।
১৬. হোলির দিন প্রকাশ্যে নৃত্যগীতাদি ও অশ্লীল আচরণ তুলে দেন।
১৭. মহরমের শোভাযাত্রা নিষিদ্ধ করেন।
১৮. নাচোয়ালী ও বেশ্যাদের নির্বাসন ও বিবাহ্ এ দুইটির মধ্যে একটিকে বেছে নেয়ার নির্দেশ দেন।
১৯. তৎকালে প্রচলিত লোক দেখানো প্রথা উপেক্ষা করে এমন পোশাক পড়তে নির্দেশ দেয়া হয় যাতে মেয়েলীপনাকে প্রশ্রয় দেয়া না হয়।
২০. সাধারণভাবে চিত্রকলা প্রদর্শনী নিষিদ্ধ করা হয়।
২১. ইসলামে পদার্পণে পদোন্নতি ও পুরষ্কারের ব্যবস্থা করা হয়।
২২. বিশৃঙ্খলা ও বিদ্রোহ দমনের উদ্দেশ্যে ১৬৬৯ খ্রিস্টাব্দে পুনরায় জিজিয়া কর প্রবর্তন করেন।
২৩. চব্বিশ জন মুসলিম জ্ঞানীর সহযোগিতা নিয়ে ভারতীয় মুসলমানদের জন্য ফতোয়া-ই আলমগীরি সংকলন করেন।
ভারতের লেখক সৈয়দ আবদুল হালিম বাদশা আওরঙ্গজেবের শাসনের উপর নানান বিশ্লেষণ করে উক্ত বিষয়গুলো উল্লেখ করেন। বাদশা আওরঙ্গজেব জীবনের শেষপ্রান্তে এসে একটি অছিয়তনামা রেখে যান-
১. হযরত খাজা মঈন উদ্দীন চিশতী রাহমাতুল্লাহি আলায়হির মাজারের উপর ছদর/ছাদুয়া বিছাতে বলেন। এর জন্য তার সন্তান আজমের কাছে অর্থ রেখে যান।
২. নিজে টুপি সেলাই করে তার মূল্য হিসেবে ৪টাকা ৬ আনা মতান্তরে ২ আনা উপার্জন করেছিলেন। এর দ্বারা তার ইন্তেকাল পরবর্তী কাফনের কাপড়ের জন্য খরচ করতে বলেন। পবিত্র ক্বোরআন মাজীদ লিখে তিন শত পাঁচ টাকা জমা থাকে। ঐ টাকা ইন্তেকালের দিন খচর করতে বলেন।
৩. তাঁর ইন্তেকাল পরবর্তী জানাযা দাফনের ব্যবস্থা করবেন তাঁর পুত্র মুহাম্মদ আজম।
৪. মৃত্যু পরবর্তী অবস্থায় তথা জানাযা দাফনের সময় তার মাথা খোলা রাখতে বলেন।
৫. তাঁর কাফনের দামি কাপড় পরিহার করে সাদা মোটা কাপড় দিতে বলেন। বাদ্যকরদের বাজনা ইত্যাদি পরিহার করতে বলেন।
৬. তাঁর শাসনকালে তাঁর সহযোগীদের নিকট ক্ষমার আবেদন রেখে যান।
৭. তিনি পারস্য ভাষীদের খুবই ভাল জানতেন। বাদশা আওরঙ্গজেবের মতে তারা বিশ্বাসঘাতকতা করেনি বা আনুগত্যহীনতার দোষে দোষী হয়নি ভবিষ্যতে এদের প্রতি বিশ্বাস রাখতে বলেন।
৮. যুদ্ধক্ষেত্রে ভারতভাষীর চেয়ে পারস্য/তুরান দেশের লোকদেরকে গুরুত্ব দিতে হবে।
৯. নবী পাক সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর বংশধরদের প্রতি বিশেষ সম্মান ও সাহায্য সহযোগিতা করতে বলেন। কিন্তু তারা যাতে রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে না পারে সে জন্য সাবধান থাকতে বলেন।
১০. ঘরের তথা রাজপ্রাসাদে বসে সাম্রাজ্য পরিচালনা না করে ঘুরে ফিরে থাকতে বলেন।
১১. সন্তানদের সাথে বেশি অন্তরঙ্গ মেলামেশা না করতে বলেন। উদাহরণ দেন তাঁর পিতা বাদশা শাহজাহান দারা শুকোহর সাথে ঐ রকম না করলে তার পরিণতিটা এমন দুঃখজনক হত না।
১২. সাম্রাজ্যের নানা খবরা খবর ভালভাবে অভিহিত হওয়াকে গুরুত্ব দিতে বলেন। এ ব্যাপারে মুহূর্তের জন্যে সামান্য অবহেলা বহু জনের বহু বিপদের কারণ হতে পারে। তিনি এতে উদাহরণ স্বরূপ উল্লেখ করেন তার অসাবধানতার জন্য শিবাজী পালিয়ে গিয়েছিল। ফলে তাঁকে শেষ দিন পর্যন্ত মারাঠাদের বিরুদ্ধে কঠিন পরিশ্রম করতে হয়েছিল।
তিনি বার সংখ্যাকে পবিত্র বলে উল্লেখ করেন এবং বারটি উপদেশ দিয়ে শেষ করেন।
বাদশা আওরঙ্গজেব দীর্ঘ প্রায় ৫০ বছর বিশাল ভারতবর্ষ শাসন করে গেছেন। তিনি গোমল শাসকগণের মধ্যে ব্যতিক্রম ছিলেন। তাঁর সাম্রাজ্যের শাসন কার্য পরিচালনায় তার অত্যধিক কঠোর ছিল বলে দুর্নাম রয়েছে। একাধিক ইতিহাসবিদ তাঁকে উগ্র ধার্মিক বলে উল্লেখ করেছেন। তবে তিনি অগ্রজগণের মত অত্যধিক বিলাসিতা, বেপোরোয়া জীবনযাপন পরিহার করে ইসলামের মহান চার খলিফাগণের জীবন আদর্শকে বুকে ধারণ করে জীবন অতিবাহিত করেন। ৮৯ বছর বয়সে ১৭০৭ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণাত্যের আহমদ নগরে ইন্তেকাল করেন।
দৌলতাবাদের ২৮ কি. মি. দূরত্বে হুলদাবাদে একটি পাহাড়ের ওপর সাদামাটা কবর নিয়ে তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন।