আহলে বায়তে রাসূল- মাওলানা মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজভী

0

عن ابن عباس رضى الله عنه قال لما نزلت هذه الاية (قُلْ لَا اَسْئَلُكُمْ عَلَيْهِ اَجَرًا اِلَّا الْمُوَدَّةَ فِىْ الْقُرْبَى) قَالُوْا يَارَسُوْلَ اللهِ صَلى الله عليه وسلم مَنْ قَرَبَتُكَ صِؤَلَاءِ الَّذِيْنَ وَجَبَتْ عَلَيْنَا مَوَدَّتُهُمْ قَالَ عَلِىٌّ وَفَاطِمَةُ وَاَبْنَاهُمَا- (المعجم الكبير)

অনুবাদ: হযরত ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন এ আয়াত নাযিল হয় (হে প্রিয় হাবীব! আপনি বলুন আমি তোমাদের কাছে শুধুমাত্র আমার নিকটাত্মীয়দের প্রতি ভালোবাসা চাই) তখন সাহাবায়ে কেরাম আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আপনার নিকটাত্মীয় কারা? যাদের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন করা আমাদের উপর ওয়াজিব করা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, আলী, ফাতেমা এবং তাদের পুত্রদ্বয় (হাসান ও হোসাইন)।১

রাভী পরিচিতি
ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু। তাঁর নাম আবদুল্লাহ্ কুনিয়াত আবুল আব্বাস, পিতার নাম আব্বাস, দাদার নাম আবদুল মুত্তালিব। মাতার নাম লুবাবাহ্ বিনতে হারিস তিনি হুযূরের চাচাত ভাই। তিনি হিজরতের তিন বৎসর পূর্বে জন্ম গ্রহণ করেন। হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর ওফাতের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ১৩ বৎসর। তাঁর উপাধি حبر الامة । অর্থাৎ মুসলিম উম্মাহ্র বড় আলিম। তিনি তীক্ষèমেধা ও স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিলেন। তাফসীর ও ফিকহ শাস্ত্রে তাঁর অসাধারণ পাণ্ডিত্য ও ব্যুৎপত্তি ছিল।
প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম তাঁর জন্য দু’আ করেছিলেন- اللهم عَلِّمْهُ الْحِكْمَةَ وَعَلِمْهُ الْتَاوِيْلَ হে আল্লাহ্ তুমি তাঁকে প্রজ্ঞা ও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের জ্ঞান দান করো। রাসূলে পাকের দু’আর বদৌলতে তিনি তাফসীর শাস্ত্রে অসীম প্রজ্ঞা ও পাণ্ডিত্যের স্বাক্ষর রেখে গেছেন। হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ও হযরত ওসমান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু তাঁর পরামর্শ গ্রহণ করতেন। তিনি ছিলেন রঈসুল মুফাস্সিরিন তথা মুফাস্সির কুল শিরোমণি। তাঁর অনবদ্য তাফসীর গ্রন্থ ‘তাসফসিরে ইবনে আব্বাস’ নামে ইসলামী বিশ্বের সর্বত্র সমাদৃত। সাতজন সাহাবী রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম থেকে সর্বাধিক হাদীস বর্ণনা করেন তন্মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু অন্যতম। তাঁর বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা ১৬৬০ বোখারী শরীফ ও মুসলিম শরীফে যৌথভাবে ৯৫টি এককভাবে বোখারী শরীফে ১২০টি এবং মুসলিম শরীফে ৪৯টি তাঁর বর্ণিত হাদীস উল্লেখ হয়েছে।
জীবনের শেষ দিকে চোখের দৃষ্টিশক্তি হারান। হিজরি ৬৮ সনে ৭১ বছর বয়সে তায়েফে ইন্তেকাল করেন।

প্রাসঙ্গিক আলোচনা
বর্ণিত হাদীস শরীফটি আহলে বায়ত’র মর্যাদা সম্পর্কিত। পবিত্র ক্বোরআনুল করীম ও অসংখ্য হাদীসে রাসূলের বর্ণনানুযায়ী রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম, হযরত ফাতেমা, হযরত আলী, হযরত ইমাম হাসান ও ইমাম হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুম হলেন আহলে বায়ত।
মহান আল্লাহ্ পাক নবীজির বংশধারা তথা প্রিয়জনদের পবিত্রতা বর্ণনায় এরশাদ করেন-
انما يريد الله ليذهب عنكم الرجس اهل البيت ويطهركم تطهيرا
হে আহলে বায়ত! নিশ্চয় আল্লাহ্ তা‘আলা চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে। [সূরা আহযাব: আয়াত- ৩৩] প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আহলে বায়তের পবিত্রতা প্রার্থনায় দু’আয় করেছিলেন-
اللهم هولاء اهل بيتى وحاصتى فاذهب عنهم الرجس وطهرهم تطهيرا-
হে আল্লাহ্ এরাই আমার আহলে বায়ত এবং ঘনিষ্ঠ জন। আপনি তাদের থেকে অপবিত্রতা দূরীভূত করুন এবং তাদেরকে পরিপূর্ণভাবে পবিত্র করুন।
আহলে বায়তের বর্ণিত পুণ্যাত্মা মনীষীদের সকলেই শ্রদ্ধার সাথে স্মরণীয় তাদের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন তাদের জীবনাদর্শ অনুসরণ সত্যান্বেষী মুক্তিকামী মানুষের জন্য এক অপরিহার্য অবলম্বন। সেই পরম সৌভাগ্যবান আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি নিম্নে বর্ণিত হলো।

হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু
তিনি নবূয়তের ১০ বছর পূর্বে ৬০০ খ্রিস্টাব্দে কাবা ঘরের অভ্যন্তরে ১৩ রজব জুমাবার জন্ম গ্রহণ করেন। জন্মের পর মাতা নাম রাখেন আসাদ বা হায়দার, পিতার দেয়া নাম যায়দ। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম নাম রাখেন আলী। শেষোক্ত নামেই তিনি প্রসিদ্ধ ও পরিচিত। হিজরি প্রথম অথবা দ্বিতীয় সনে হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম তাঁর কন্যা হযরত ফাতেমাকে তাঁর সাথে বিবাহ্ দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন খুলাফায়ে রাশেদার চতুর্থ খলিফা। তাঁর মর্যাদা বর্ণনায় অসংখ্য হাদীস ইরশাদ হয়েছে।
عن ابن عباس رضى الله عنه انه قال النبى صلى الله عليه وسلم انا مدينة العلم وعلىّ بابها فمن اراد العلم فليات الباب-
হযরত ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিতি নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন। আমি জ্ঞানের শহর আর আলী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু সেই শহরের দরজা। যে কেউ জ্ঞান অর্জন করতে চাইলে তাকে সে দরজায় আসতে হবে।
আরো ইরশাদ হযেছে-
عن زيد بن ارقم عن النبى صلى الله عليه وسلم قال من كنت مولاه فعلى مولاه-
অর্থাৎ হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম হতে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আমি যার মাওলা (বা অভিভাবক) আলী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু তার জন্য মাওলা।

হযরত ফাতেমা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা
হযরত ফাতেমা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা রাসূলে পাকের প্রিয় কন্যা। যিনি তাঁর প্রথমা স্ত্রী উম্মুল মুমেনীন হযরত খাদীজা বিনতে খুওয়ালিদ ইবন আযাদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহার গর্ভে মহানবীর ঔরসে জন্ম গ্রহণ ২০ জমাদিউস্ সানী নবূয়তের প্রথম বছরে মা ফাতেমা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন।
প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম তাকে সম্বোধন করে ইরশাদ করেন-
يا فاطمة الا ترضيت ان تكونى سيدة نساء العالمين وسيدة نساء هذه الامة-
ওহে ফাতেমা, তুমি কি সন্তুষ্ট হবে না! যে তুমি বিশ্বের রমনীদের সরদার হিসেবে বিবেচিত হয়েছ। আরো ইরশাদ হয়েছে-
عن مسوربن مخرمة ان رسول الله صلى الله عليه وسلم قال فاطمة بضعة منى فمن اغضبها فقد اغضبنى-
অর্থ: হযরত মিসওয়ার বিন মাখরাআ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আমার কন্যা ফাতেমা আমার কলিজার টুকরা সুতরাং তাকে যে অসন্তুষ্ট করে নিশ্চয়ই সে আমাকে অসন্তুষ্ট করল।
হযরত ফাতেমা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা ছিলেন দু’পুত্র ও দু’কন্যা সন্তানের মাতা। প্রথম সন্তান হযরত হাসানের (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) জন্ম তৃতীয় হিজরিতে। দ্বিতীয় পুত্র হযরত ইমাম হোসাইনের (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) জন্ম ৪র্থ হিজরিতে। প্রথম কন্যা হযরত যায়নাব ৬ষ্ঠ হিজরিতে এবং দ্বিতীয় কন্যা হযরত উম্মে কুলসুম ৭ম হিজরিতে জন্ম গ্রহণ করেন। আওলাদে রাসূল বলতে হযরত ফাতেমা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহার বংশধারাকে বুঝানো হয়।
বিশুদ্ধ বর্ণনা মতে রাসূলে পাকের ওফাতের পর হযরত ফাতেমা রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহা ছয় মাস জীবিত ছিলেন। ১১ হিজরির ৩ রমজান মঙ্গলবার ২৯ বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন।
নবীজির বংশধারা হযরত ফাতেমা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহার মাধ্যমে কিয়ামত পর্যন্ত পৃথিবীতে অব্যাহত থাকবে।

হযরত ইমাম হাসান রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর প্রিয় দৌহিত্র হযরত ইমাম হাসান রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু তৃতীয় হিজরিতে রমজান মাসে মদীনায় জন্ম গ্রহণ করেন। ৪৯ হিজরিতে জা’দাহ বিনতে আশয়াস ইবন কায়স আল্ কিন্দি কর্তৃক গোপনে বিষপান করানোর কারণে ইন্তেকাল করেন।

হযরত ইমাম হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু
রাসূলুল্লাহু সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর প্রিয় দৌহিত্র খাতুনে জান্নাত মা ফাতেমাতুয যাহরা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা’র কলিজার টুকরা নয়ন মনি হযরত ইমাম হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু ৩ শা’বান ৪ হিজরিতে মদীনা মুনাওয়ারায় জন্ম গ্রহণ করেন। ১০ মুহররম ৬১ হিজরতে কারবালার মরু প্রান্তরে ফোরাত নদীর তীরে জুমাবার নরাধম পাষাণ্ড জালেম ইয়াজিদের নির্দেশে শিমর ইবনে যি-জাওশানের হাতে শাহাদাত বরণ করেন।
হযরত ইমাম হাসান ও ইমাম হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা’র মর্যাদা বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক অসংখ্য হাদীস শরীফ বর্ণিত হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে-
عن ابى سعيد الخدرى رضى الله عنه قال قال رسول الله صلى عليه وسلم الحسن والحسين سيدا شباب اهل الجنة- (رواه الترمزى وابن ماجه عن ابن عمر)
অর্থ: হযরত আবু সাঈদ খুদরী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী করিম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, হাসান এবং হোসাইন বেহেশতবাসী যুবকদের সর্দার। এ হাদীস ইমাম তিরমিযী বর্ণনা করেন।
আরো ইরশাদ হয়েছে হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত,
ان الحسن والحسين هما ريحانتى من الدنيا-
অর্থ: নিঃসন্দেহে হাসান ও হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু দুনিয়াতে আমার বেহেশতী দু’টি ফুল।
যাদের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন মুমিনের পরিচায়ক, ঈমানের দাবী ও ইসলামের আবেদন, তাঁদের প্রতি ধৃষ্টতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করার প্রচেষ্টা আজো বিভিন্নভাবে অব্যাহত রয়েছে। তাই আসুন সৃদৃঢ় ঈমান ও নবী প্রেম বুকে ধারণ করে আকিদা ভিত্তিক ঐক্যের ভিত্তিতে নবী মোস্তফার নূরানী আওলাদ আহলে বায়তের তথা নবীজির বংশধরগণের প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীদের বিষদাঁত ভেঙ্গে দেয়াই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
পরিশেষে আহলে বায়তে রাসূলের শানে মহান ইমাম হযরত ইমাম শাফেয়ী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি কর্তৃক আরবী ভাষায় রচিত কাব্যের দু’টি পংক্তি উল্লেখ রা হলো।
يا اهل بيت رسول الله حبكم- فرض من الله فى القران انزله
كفاكم من عظيم القدر انكم- من لم يصل عليكم لا صلوة له-
অর্থ: ওহে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামার বংশধরগণ! আপনাদের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন করাকে ফরজ স্বরূপ ঘোষণা করে আল্লাহ্ তা‘আলা ক্বোরআন করীমের আয়াত নাযিল করেছেন। আপনাদের সুমহান মর্যাদার জন্য এতটুকু যথেষ্ট, যে ব্যক্তি আপনাদের প্রতি দুরূদ শরীফ পাঠ করবে না তার নামাযই হবে না।
হে আল্লাহ্ আমাদেরকে তোমার প্রিয় মাহবূব সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর নূরানী বংশধরগণের প্রতি অকৃত্রিম মুহব্বত প্রদর্শন করার তাওফিক দান করুন। আ-মী-ন।

শেয়ার
  • 8
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    8
    Shares