গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ-এর ২৫ বছর পূর্তি সম্মেলন: একটি পর্যালোচনা- অধ্যাপক আবু তালেব বেলাল

0

রাহনুমায়ে শরিয়ত ও তরিক্বত মুর্শিদে বরহক হাদ্বীয়ে দ্বীন-ও মিল্লাত, গাউসে জামান আল্লামা হাফেজ ক্বারী সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ রহমাতুল্লাহি আলায়হির নির্দেশে ১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ। আনজুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্টের একমাত্র অঙ্গসংগঠন গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ সুন্নি মতাদর্শের আলোকে সমাজ সংস্কারকমূলক একটি অরাজনৈতিক আধ্যাত্মিক সংগঠন। এ সংগঠন প্রতিষ্ঠার ২৫ বছর অতিক্রম হয়ে ২৬ বছরে পদার্পণের শুভ মুহূর্তে ঘটা করে উদ্যাপন করা হলো ২৫বছর পূর্তি সম্মেলন।
গাউসিয়া কমিটির ২৫ বছর পূর্তি উৎসব বা রজতজয়ন্তী উদ্যাপন করবে এমন একটি কর্মসূচী এ বছরের শুরুতে নেয়া হয়েছিল। এ ব্যাপারে ব্যাপক কর্মযজ্ঞও হাতে নেয়া হয়েছিল। এমনকি রাজধানী ঢাকার মতিঝিল মডেল স্কুলের মাঠের অনুমোদনসহ প্রাসঙ্গিক অনেক কর্মসূচী হাতে নেয়া হয়েছিল। এজন্য ঢাকায় বসবাসরত কেন্দ্রীয় গাউসিয়া কমিটির নেতৃবৃন্দ ও ঢাকা মহানগর নেতৃবৃন্দ অনেক পরিশ্রমও করেছিলেন কিন্তু বিভিন্ন যৌক্তিক কারণে ওই কর্মসূচী স্থগিত করা হয়েছিল। এরপর মূলতঃ রজতজয়ন্তী বা ২৫ বছর পূর্তি উৎসব আদৌ হবে কিনা তা নিয়ে সবাই দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ছিল। বিষয়টি একসময় যখন ভুলে যেতে বসেছিল তখন পবিত্র আশুরা উপলক্ষে জমিয়তুল ফালাহ্ মসজিদে ও আনজুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট আয়োজিত মাহফিলে অংশগ্রহণ করতে মুর্শিদে বরহক্ব আওলাদে রাসূল আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ সাবির শাহ্ (মা.জি.আ.) ও আওলাদে রাসূল, আল্লামা হাফেজ ক্বারী সৈয়দ মুহাম্মদ আহমদ শাহ্ (মা.জি.আ.) এর আগমনের কথা শুনে গাউসিয়া কমিটির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ নড়ে-চড়ে বসেন এবং আনজুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্টের সিনিয়র সহ সভাপতি আলহাজ্ব মুহাম্মদ মহসিনসহ নেতৃবৃন্দের শরণাপন্ন হলে তাঁরা তাৎক্ষণিক সম্মতি প্রদান করেন বার আউলিয়ার পুণ্যভূমি চট্টগ্রামেই একটি ২৫ বছর পূর্তি সম্মেলনের আয়োজন করার। পীর সাহেব হুজুর কিবলাও ছাহেবজাদা হুজুর কিবলার উপস্থিতিতে গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশের ২৫ বছর পূর্তি সম্মেলন হবে কথাটি তাৎক্ষণিক দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার পর গাউসিয়া কমিটির সর্বস্তরের ভাই-বোনসহ সকল সুন্নি মহলে যেন এক আনন্দের ঢেউ উঠে।
গাউসিয়া কমিটির নিরুত্তাপ কেন্দ্রীয় অফিস যেন সরব হয়ে উঠল। উচ্ছ্বাস ও কর্মের উত্তাপ ছড়াতে দিন-রাত চলছে প্রস্তুতির কর্মযজ্ঞ। বিশাল আয়োজন সময় মাত্র ১৫ দিন। বিশাল প্রাচীর ডিঙ্গিয়ে অভিযাত্রাকে সফল করতে হবে। মহা টেনশন আর বিরতিহীন কাজে একাকার গাউসিয়া কমিটির নেতৃবৃন্দ। পাশে উৎসাহ ও আশ্বাস এমনকি বহু কাজ নিরবে সম্পাদন করেছেন আনজুমান ট্রাস্টের এডিশনাল সেক্রেটারি জেনারেল আলহাজ্ব মুহাম্মদ সামশুদ্দিন। যখনি যাই তরজুমানের কম্পিউটার ল্যাবে বসা তিনি। কাজ একমাত্র হুজুর কেবলার আগমন ও ২৫ বছরপূর্তি সম্মেলন সংক্রান্ত প্রসেসিং চিঠি-পত্র ওয়েভসাইট, ফেসবুক ও মেইলের মাধ্যমে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেয়া।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশের ১১জন কর্মকর্তা ও সদস্যের মধ্যে ২জন পবিত্র হজ্ব সম্পাদনে সাউদি আরবে, বাকী চারজন চট্টগ্রামের বাইরের বিভিন্ন জেলার অধিবাসী হওয়ায় অন্য ছয়জনকে মূলত বিশাল এ কাজ আনজাম দিতে হচ্ছিল। ১৭ নভেম্বর অবশ্যই মহাসচিব সাহজাদা ইবনে দিদার হজ্ব সম্পাদন শেষে ফিরে এসে দেরী না করেই যোগ দেন সম্মেলনের কার্যক্রমে।
বলাবাহুল্য গাউসিয়া কমিটির এ সম্মেলনের বিভিন্ন কার্যক্রমে স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতায় দিনরাত কাজ করেছেন মহানগর কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক আলহাজ্ব সাদেক হোসেন পাপ্পুর নেতৃত্বে এ.এস.এফ এবং নগর উত্তর ও দক্ষিণ জেলার নেতৃবৃন্দ। সাথে এরশাদ খতিবি ভাই এবং আমি অধম।
ইতোমধ্যে পুরো চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর আইল্যাণ্ড রং-বেরং এর ফেস্টুনে ঢাকা পড়েছে, চারদিক থেকে সম্মেলনের ডিজিটাল প্রচার এবং মিডিয়াগুলোতে সংবাদ সম্মেলনের প্রচারসহ বিভিন্ন মাধ্যমে সম্মেলনের ব্যাপক প্রচার ভিন্নমাত্রা যোগ দিয়েছে। যদিও এ আনন্দ ও উচ্ছ্বাসের যাত্রায় মাঝে মধ্যে হোঁচট খেতে হয়েছিল। এক সপ্তাহ্ কাজ চালিয়ে প্রায় ৭০ ভাগ কাজ শেষ হওয়ার পর যখন কেন্দ্রীয় চেয়ারম্যান আলহাজ্ব পেয়ার মোহাম্মদ সাহেব সঙ্গত কারণে স্মরণিকা আপাততঃ না ছাপানোর সিদ্ধান্ত দিলেন তখন ক্ষণিকের জন্য মন খারাপ হয়েছিল বটে। দৈনিক ইনকিলাবে ক্রোড়পত্র প্রকাশ, চেয়ারম্যানের বক্তব্য ও যুগ্ন মহাসচিব এ্যাডভোকেট মোছাহেব উদ্দিন বখতেয়ারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ সম্বলিত ‘বুকলেট’ প্রকাশের সিদ্ধান্তে দুর্ভাবনা সব উধাও হয়ে গেল, প্রকাশনা পরিষদের প্রধান এম. মাহবুব খান, আমি এবং এরাশদ খতিবী আর ভাতিজা জয়নাল আবেদীন (জনাব সামশুদ্দিন আহমদের ছেলে) আবারও উচ্ছ্বাসিত মন নিয়ে কাজে নেমে পড়লাম।
স্মরণিকার প্রকাশ আপাততঃ হচ্ছে না কথাটি শুনে সবচেয়ে বেশী মনোকষ্ট পেয়েছেন সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক আলহাজ্ব মাহবুব এলাহী শিকদার ভাই। স্মরণিকার জন্য দেশব্যাপী শাখাসমূহের বিভিন্ন কমিটি প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত তিনি নিষ্ঠার সাথে সম্পন্ন করেছিলেন। আশা করি পবিত্র জশনে জুলুসের আগেই এ স্মরণিকা সবার হাতে পৌঁছিয়ে দিতে পারবে কেন্দ্রীয় গাউসিয়া কমিটি। সম্মলনের প্রস্তুতির কথা বলতে বলতেই কলেবর শেষ হচ্ছে। পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচী অনুযায়ী সম্মেলনের মহামান্য অতিথিদ্বয় আওলাদে রাসূল আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ সাবির শাহ্ (মা.জি.আ.) ও সৈয়দ মুহাম্মদ আহমদ শাহ্ (মা.জি.আ.) ২০ নভেম্বর ১১-১৫ মিনিট চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। এদিকে গাউসিয়া কমিটি সকাল সাড়ে ৯ টায় নগরীর জমিয়তুল ফালাহ্ মসজিদ ময়দান থেকে ২৫ বছরপূর্তি উপলক্ষে বিশাল মটর শোভাযাত্রাসহ বিমানবন্দরে উপস্থিত হয়। আনজুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট কর্মকর্তাসহ গাউসিয়া কমিটির চেয়ারম্যান আলহাজ্ব পেয়ার মোহাম্মদ ও মহাসচিব আলহাজ্ব সাহজাদ ইবনে দিদারের নেতৃত্বে হুজুর কেবলাদ্বয়কে ফুলেল অভিনন্দন জানিয়ে মোটর শোভাযাত্রায় পবিত্র আলমগীর খানকায় লালগালিচা সম্বর্ধনার মাধ্যমে হুযুর ক্বেবলাদ্বয়কে বরণ করে নেয়া হয়।
কালকের সম্মেলন কেমন হবে? উপস্থিতি কেমন হবে, সবকিছু ঠিক ঠাক মতো হবে তো..। সবাই স্ব স্ব কাজে লিপ্ত হয়ে গেল। সন্ধ্যার পর থেকে চট্টগ্রামের বাইরের টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার প্রতিটি জেলা থেকে আমাদের প্রাণপ্রিয় মুর্শিদ কিবলার মুরীদান গাউসিয়া কমিটির ভাইরা ছুটে আসছিলেন পূণ্যভূমি চট্টগ্রামের আলমগীর খানকা শরীফে।
২১ নভেম্বর বিকাল ২.১৫ মিনিটে মহাসচিব সাহজাদ ইবনে দিদার ও আমি পৌঁছলাম ‘দি কিং অব চিটাগাং’-এ আমাদের পূর্বেই চেয়ারম্যান, যুগ্ন মহাসচিব এ্যাডভোকেট বখতেয়ারসহ কেন্দ্রীয় ও জেলা নেতৃবৃন্দসহ শতশত ভাইয়ের উপস্থিতি লক্ষ্য করার মত।
একেবারে সাজ-সাজ রব। সুশৃংখল সদস্যবৃন্দ। বিকাল তিনটায় যুগ্ন মহাসচিব মোছাহেব উদ্দিন বখতেয়ার জাতীয় ও সংগঠনের পতাকা উত্তোলনের কর্মসূচীর কথা ঘোষণা করার সাথে সাথে সবাই সুশৃংখলভাবে দাঁড়িয়ে প্রস্তুতি সম্পন্ন করলেন। কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ একে একে সামনের সারিতে দাড়ানোর পর জামেয়ার কৃতী ছাত্র ক্বারী ও না’ত খা তারেক আবেদীনের সুমধুর কণ্ঠে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত এবং ইমদাদ ও তার সহযোগিদের সুলিল কণ্ঠের না’ত পরিবেশনার সাথে সাথে চেয়ারম্যান ও মহাসচিব পতাকা উত্তোলন করার পরপর সম্মেলনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করলেন। ৩.২৫ মি. এ কার্যক্রম শুরু হল। ঘোষণামঞ্চ থেকে সঞ্চালক এডভোকেট বখতেয়ার আহ্বান জানানোর পরপর একে একে গাউসিয়া কমিটির নেতৃবৃন্দ মঞ্চে উপবিষ্ট হলেন এবং ২৫টি জেলার প্রতিনিধি একে একে শুভেচ্ছা ও প্রস্তাবনা উপস্থাপন করলেন। এরপর কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুব এলাহী সিকদার, মহাসচিব আলহাজ্ব সাহজাদ ইবনে দিদারের সাংগঠনিক রিপোর্ট উপস্থাপনসহ যুগ্ন মহাসচিব এম. মাহবুব খান, ভাইস চেয়ারম্যান আলহাজ্ব আব্দুল হামিদ, আলহাজ্ব আনোয়ারুল হকের বক্তব্য শেষ হতে চলেছে। এ.এস.এফের হুইসেলের আওয়াজে জানান দেয়া হল হুজুর ক্বেবলাদ্বয় আসছেন। পীর-ভাইরো আনন্দের জোয়ার, কোথায় রাখি এ আবেগ। এ যেন ‘শের-ই জাহানের’ আগমন মঞ্চে আরোহন করেই দু’হাত নাড়তেই মঞ্চে চারপাশ থেকে অগণিত তাক করা ক্যামেরার ক্লিক। ওহ কী আনন্দ। উচ্ছ্বসিত সাংবাদিকের অনুনয়-বিনয় হুজুর সাবির শাহ্ যেন আরেকটু হাত নাড়ে একটা হাসে। হঠাৎ স্তব্ধ, চারদিকে যেন পিনপতন নিরবতা সবার চোখ, ধ্যান যেন হুযুরের দিকে। সিরিকোট দরবারের এ শাহেনশাহ আমাদের আজ কী দেবেন? কী বলবেন? গাউসিয়া কমিটির জন্যে ঘোষণা করবেন কোন কর্মসূচী?
হ্যাঁ তাই হল, ৮.২৫ মি. সিংহের গর্জনে যেন প্রকম্পিত ‘কিং অব চিটাগাং’ বজ্র-কঠিন অথচ প্রত্যাশা ও প্রত্যয়ের এক অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য দিলেন আনজুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্টের সিনিয়র সহ সভাপতি আলহাজ্ব মুহাম্মদ মহসিন, সেক্রেটারী জেনারেল আলহাজ্ব মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন ও পিএইচপি গ্র“পের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব সূফি মিজানুর রহমান। এর মধ্যে মঞ্চ থেকে ঘোষণা দেয়া হল বিশেষ অতিথি ছাহেবযাদা হযরতুল আল্লামা আলহাজ্ব হাফেজ ক্বারী সৈয়দ মুহাম্মদ আহমদ শাহ্ (মা.জি.আ.) বক্তব্য রাখবেন।
তিনি গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে সর্বস্তরের নেতৃবৃন্দ, কর্মী ও সদস্যদের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, অনেক পথ-পাড়ি দিয়ে, বহু বাধা-বিঘœ উতরিয়ে গাউসিয়া কমিটি আজ যে অবস্থায় এসেছে তাতে মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের অশেষ শুকরিয়া আদায় করি। তিনি বলেন, হুজুর আল্লামা হাফেজ ক্বারী সৈয়দ মুহাম্মদ তৈয়ব শাহ্ (রহ.) যে মহান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে গাউসিয়া কমিটি গঠন করেছেন তা পূরণে সকলকে ভ্রাতৃত্ববোধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। তিনি ভাইদের মধ্যে কোন রকম ভেদাভেদ ও মতানৈক্য যেন না হয় সে দিকে সবার মনোযোগ আকর্ষণ করতে বলেন, মুসলমানরা যখন ঐক্যবদ্ধ ছিল তখন পুরো পৃথিবী তাদের হাতের মুঠোয় ছিল পৃথিবীর দিক-দিগন্তে বিজয়ের পতাকা উড্ডীন হয়েছিল গোটা পৃথিবীর দুই তৃতীয়াংশ মুসলমানরা শাসন করেছিল। আজ সে ঐক্য নেই বলে মুসলমানদের সব অর্জন ইহুদি-খ্রিষ্টানরা ছিনিয়ে নিয়েছে। দেশে দেশে মুসলমানরা নির্যাতিত ও নিস্পেষিত হচ্ছে। তিনি গাউসিয়া কমিটির অভিযাত্রার সফলতা কামনা করে বলেন, এ কাফেলা ইসলামের সঠিক রূপরেখা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের আদর্শ প্রচারে উত্তরোত্তর এগিয়ে যাবে।
ঘড়ির কাঁটা প্রায় ৭টার ঘরে, ছাহেবযাদা (ম.জি.আ.) বক্তব্য শেষে সম্মেলনের প্রধান মেহমান, রহনুমায়ে শরীয়ত ও ত্বরীকত, রওনাকে আহলে সুন্নাত পাকিস্তান উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী, আওলাদে রাসূল, আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ সাবির শাহ্ (মা.জি.আ.) বক্তব্য দেয়ার জন্য উঠার সাথে সাথে মুর্হুমুহূ শ্লোগানে মুখরিত হল। দীপ্তময় চেহারার এক নূরানী সন্তানের বজ্র-কঠিন আউয়াজ এ যেন
‘জাগিয়া মেলিনু আঁখি চমকিয়া পুন: দেখি,
কঠিন কর্তব্য ব্রত তাঁর মুখনিসৃত বাণি’
গাউসিয়া কমিটির ২৫ বছর পূর্তিতে তাঁর বক্তব্যে যেমন রয়েছে উচ্ছ্বাস ও আনন্দের জয়গান পাশাপাশি বলেছেন, যেন আমরা আরো সতর্ক হই, পথ চলায় যেন হোঁচট খেতে না হয়। তিনি বলেন, বাঙলার মুসলমানরা অত্যন্ত ভাগ্যবান যে, আপনারা সিলসিলায়ে আলিয়া কাদেরিয়ার হযরাতে কেরামের বরহক্ব সিলসিলা পেয়েছেন, গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ পেয়েছেন। সর্বোপরি জামেয়া, আনজুমান, খানকাহ্ মাসিক তরজুমান ও জশনে জুলুস পেয়েছেন, যেগুলোর খিদমত করে ইহ ও পরকালের উন্নতি ও মুক্তি লাভ সম্ভব। তিনি বলেন হযরাতে কিরামের পক্ষ থেকে যে নি‘আমত আপনাদের দেয়া হয়েছে তা কৃতজ্ঞতা চিত্তে গ্রহণ, অতি যতœ সহকারে এর সংরক্ষণ এবং যিম্মাদারী ও আমানতদারীর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানসমূহের দায়িত্ব ও কতর্ব্য পালন করতে পারলেই কেবল হযরাতে কিরাম, হুজুর গাউসুল আজম দস্তগীর, রাসুলে পাক সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম ও মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা যাবে।
তিনি গাউসিয়া কমিটির ভাইদের উদ্দেশ্যে বলেন, গাউসিয়া কমিটি হুযুর আল্লামা তৈয়ব শাহ্ রহমাতুল্লাহি আলায়হি এমনিই প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেননি; এর পেছনে ব্যাপক রহস্য ও প্রত্যয় রয়েছে। এজন্য গাউসিয়া কমিটির সর্বোচ্চ নেতৃত্ব থেকে তৃণমূল পর্যায়ের সকলকে সাংগঠনিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রস্তুত হতে হবে। তিনি বলেন, সংগঠনের ২৫ বছর বড় কথা নয়। এর মধ্যে অর্জন এবং সাংগঠনিক পরিধি কতটুকু সম্প্রসারিত হল তাই বড় কথা। তিনি গাউসিয়া কমিটির কার্যক্রমের ব্যাপ্তির ইঙ্গিত দিতে গিয়ে বলেন, এটি শুধু বাংলাদেশেই সুপ্রতিষ্ঠিত হবে তাই নয়। এর সাংগঠনিক পরিধি হবে বিশ্বব্যাপী। গাউসিয়া কমিটির নেতৃত্বে একদিন নির্যাতিত ও নীপীড়িত মুসলমানগণ ঐক্যবদ্ধ হবে। রসূলে পাক ও মহান আউলিয়ায়ে কেরামের আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে মুসলমানদের হারানো গৌরব ইনশাআল্লাহ্ ফিরে পাবে। তিনি দাওরায়ে দাওয়াতে খায়ের কর্মসূচীর কথা মনে করিয়ে দিয়ে গাউসিয়া কমিটির উদ্দেশ্যে বলেন দাওরায়ে দাওয়াতে খায়ের কর্মসূচীই হবে এ সংগঠনের প্রধান কর্মসূচী। সংগঠন মানেই একটি সুনির্দিষ্ট আদর্শ প্রতিষ্ঠার দাওয়াত সাধারণের নিকট পৌঁছিয়ে দেয়া। দাওয়াতি কার্যক্রম না থাকলে সংগঠন মজবুত হবে না। তিনি দাওরায়ে দাওয়াতে খায়ের এর বরকত ও তাৎপর্য তুলে ধরে বলেন, এ কার্যক্রম হুযুর কেবলায়ে আলমের মিশনকে সফলতার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যেতে পারে। মুসলমানদের অন্তরে যে মলিনতা ও আল্লাহর বিধান ও রাসূলের ইশক ও মুহাব্বতহীন যে ক্বলব তা দূরীভূত করে সত্যিকারের মুসলমান হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে দাওয়াতে খায়ের কর্মসূচী অনন্য ভূমিকা রাখবে। তিনি বলেন এ কর্মসূচীর সফল বাস্তবায়নের ফলে গাউসিয়া কমিটির কার্যক্রম বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে। দাওয়াতে খায়ের কর্মসূচীর জন্য প্রণীত গাউসিয়া তারবীয়াতি নিসাব এর প্রণেতা বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক আলহাজ্ব মাওলানা এম.এ. মান্নানের প্রশংসা করেন এবং তার জীবনের উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি কামনা করেন। এ সময় হুজুর কেবলা গাউসিয়া কমিটির নেতৃত্বের দৃঢ়তা, যিম্মাদারী ও আমানতদারীতা রক্ষা এবং কর্মীদের আনুগত্যের গুরুত্বও তুলে ধরেন।
অবশেষে হুজুর কেবলা গাউসিয়া কমিটি কেন্দ্রীয় পরিষদ ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে সুন্দর, সুশৃংখল ও বিশাল এ সম্মেলনের আয়োজন করায় আনজুমান, গাউসিয়া কমিটিসহ সকলকে ধন্যবাদ জানান। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন আনজুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্টের সিনিয়র সহ সভাপতি আলহাজ্ব মোহাম্মদ মহসিন, সেক্রেটারি জেনারেল আলহাজ্ব মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন, গাউসিয়া কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান আলহাজ্ব সিরাজুল হক, আনজুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্টের এডিশনাল সেক্রেটারি আলহাজ্ব মোহাম্মদ সামশুদ্দিন।
সম্মেলনে সাংগঠনিক প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন মহাসচিব আলহাজ্ব সাহজাদ ইবনে দিদার। কেন্দ্রীয় পরিষদ থেকে বক্তব্য রাখেন আলহাজ্ব আনোয়ারুল হক, আলহাজ্ব এম.এ. হামিদ, আলহাজ্ব মাহবুবুল হক খান, আলহাজ্ব মাহবুব এলাহী শিকদার, কর্মীদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন আলহাজ্ব সুফী মুহাম্মদ মিজানুর রহমান, অধ্যক্ষ আল্লামা জালালুদ্দিন আলকাদেরী, উপাধ্যক্ষ মাওলানা ছগীর ওসমানী, শেরে মিল্লাত মুফতি ওবাইদুল হক নঈমী, মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ অছিয়র রহমান, মাওলানা আব্দুল মান্নান, মাওলানা সোলায়মান আনসারী, মাওলানা হাফেজ আশরাফুজ্জামান আলকাদেরী, উপজেলা চেয়ারম্যান আফতাব উদ্দিন চৌধুরী, ওমান প্রতিনিধি আলহাজ্ব মুহাম্মদ হোসাইন, ইউএই আলহাজ্ব জানে আলম।
এ সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত প্রতিনিধিদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন ও বিভিন্ন প্রস্তাবনা পেশ করেন, সিলেট জেলার সাংগঠনিক সম্পাদক শাহ্ মুহাম্মদ গিয়াসুদ্দিন, হবিগঞ্জের সেক্রেটারি অধ্যক্ষ গোলাম সারোয়ার, গাজীপুর জেলার মোহাম্মদ মোতাহার হোসাইন পাটোয়ারী, নারায়ণগঞ্জ জেলার সেক্রেটারি মুখলেসুর রহমান, ফেনী জেলার সিনিয়র সহ সভাপতি অধ্যাপক মাওলানা কাজী নুরুল আলম, গাইবান্ধা জেলা সেক্রেটারি মুহাম্মদ মাহতাব উদ্দিন, বি-বাড়িয়া জেলা সভাপতি কাজী মুহাম্মদ আবু কাউসার, কক্সবাজার জেলার সহ সভাপতি শফিকুর রহমান, রাজশাহী জেলার মুহাম্মদ রমিজ উদ্দিন, কুমিল্লা জেলার সভাপতি অধ্যক্ষ আল্লামা আলী হোসাইন, ঢাকা মহানগর সেক্রেটারি আব্দুল মালেক বুলবুল, ময়মনসিংহ জেলার প্রতিনিধি মহিবুর রহমান, রংপুর জেলার প্রতিনিধি আবদুল কাদের খোকন, লক্ষীপুর জেলার সেক্রেটারি জালাল আহমদ, তেতুলিয়া জেলার সাংগঠনিক সম্পাদক মুহাম্মদ আজিজুল হক, শাহজাদপুর জেলার প্রতিনিধি আলাউদ্দিন, চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতি আলহাজ্ব আবুল মনসুর, সেক্রেটারি মাহবুবুল আলম, চট্টগ্রাম উত্তর জেলার সেক্রেটারী আলহাজ্ব আব্দুল শুক্কুর, দক্ষিণ জেলার সেক্রেটারি মাষ্টার মুহাম্মদ হাবিবুল্লাহ্, খাগড়াছড়ি জেলা সেক্রেটারি আজিমূল হক, রাঙ্গামাটি জেলার প্রতিনিধি হাবিবুর রহমান সেলিম।
সমাপনী বক্তব্যে গাউসিয়া কমিটির চেয়ারম্যান আলহাজ্ব পেয়ার মোহাম্মদ আগামী পাঁচ বছরের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচী ঘোষণার পাশা-পাশি হুজুর ক্বেবলাদ্বয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং উপস্থিত সকলের প্রতি ধন্যবাদ ও মোবারকবাদ জ্ঞাপন করেন। শেষে কিয়াম ও মুনাজাতের পরে হুযুর আল্লামা সাবির শাহ্ (মা.জি.আ.) দেশ-জাতি ও মুসলিম বিশ্বের শান্তি, কল্যাণ ও সমৃদ্ধি কামনা করে মোনাজাত করেন।

শেয়ার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •