বেলায়তের নক্ষত্র খাজা আব্দুর রহমান চৌহরভী-আলহাজ্ব মুহাম্মদ সিরাজুল হক

0

(লেখক- ফ্যাইনেন্স সেক্রেটারি-আনজুমান)

‘হাম তো তাজ্জব হো গিয়া, হাম তো হামারে আন্দর না থা আয়ছে আজিমুশশান হাস্তি হামকো নসীব হুয়া, লেকিন আপনে আপকো ছুপায়া, উম্মী থে, লেকিন তিস পারা দরূদ শরিফ লিখা, ‘জো দুনিয়া মে বে মেছাল হ্যায়।’

উল্লিখিত মন্তব্য রাহনুমায়ে শরিয়ত ও তরিকত হযরতুল আল্লামা সৈয়দ আহমদ শাহ্ সিরিকোটি রাহমাতুল্লাহি তাআলা আলায়হির। তাঁর পীর ছাহেব কেবলার মাধ্যমে বিশ্বের এক অদ্বিতীয় দরূদ শরিফ রচনার খবর জ্ঞাত হবার পর বিস্ময়ে বিমুগ্ধ হযরত সৈয়দ আহমদ শাহ্ সিরিকোটি রাহমাতুল্লাহি তাআলা আলায়হি এ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। এ বরকতময় দরূদ গ্রন্থ হল ‘মজমুয়ায়ে সালাওয়াতে রাসূল’ আর এটার রচয়িতা হলেন এলমে লাদুন্নীর ধারক খাজায়ে খাজেগান হযরত আব্দুর রহমান চৌহরভী রাহমাতুল্লাহি তাআলা আলায়হি। তিনি তাঁর প্রধান খলিফা রেঙ্গুনে অবস্থানরত হযরত সৈয়দ আহমদ শাহ্ ছিরিকোটি রাহমাতুল্লাহি তাআলা আলায়হিকে তাঁর রচিত ত্রিশ পারা এ দরূদ শরিফের কাজ শেষ হওয়ার পর চিঠি মারফতে এটা ছাপানোর নির্দেশ দেন। চিঠি পাওয়ার পর পীর ছাহেব কেবলার এ অনবদ্য অনুপম সৃষ্টিশীল রচনায় বিস্ময়ে হতবাক হযরত ছিরিকোটি রাহমাতুল্লাহি তাআলা আলায়হি এ মন্তব্য করেন।

 ‘আমি তো আশ্চার্যান্বিত হয়ে গেলাম। আমার মধ্যে আমি ছিলাম না। এমন মহা-মর্যাদাবান ব্যক্তি (মুর্শিদ) আমাদের ভাগ্যে জুটেছে। কিন্তু তিনি নিজেই নিজেকে গোপন করেছেন। ‘উম্মী’ ছিলেন। (অর্থাৎ যাহেরীভাবে কোন মাদরাসা কিংবা উস্তাদের নিকট পড়েননি) অথচ ত্রিশপারা সম্বলিত দুরূদ শরিফ গ্রন্থ প্রণয়ন করেছেন, গোটা দুনিয়ায় যার কোন উপমা নেই।’’

কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ ছাড়া এ ধরনের ভাষার চমৎকারিত্ব, উপমার অভিনবত্ব, ভাবের গভীরতা, বিষয়বস্তুর ব্যাপকতা সম্বলিত বিশাল দরূদ শরিফ রচনা মহান আল্লাহ পাক প্রদত্ত জ্ঞান ও কৃপাদৃষ্টিরই পরিচায়ক।

মোর্শেদে বরহক আলহাজ্ব হাফেজ ক্বারি সৈয়দ আহমদ শাহ্ ছিরিকোটি রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হির পবিত্র জবানে শুনা দাদাপীর হযরত চৌহরভী রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি’র নূরানী জীবনের উপর সামান্য আলোকপাত প্রয়াসে এ লেখা।

হযরত খাজা আব্দুর রহমান চৌহরভী রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি ১৮৪৩ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তানের হাজারা জেলার হরিপুরের চৌহর শরিফে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মাযহাবগত হানাফি আর তরিকতগত কাদেরী ছিলেন। মাত্র ৮ বৎসর বয়সে তাঁর পিতা হযরত খাজা খিজরি আলায়হির রাহমাহকে হারান। বাবা মার নিকট কোরআন করিম ছাড়া অন্য কিছু শিক্ষা গ্রহণ সুযোগ হয়নি তাঁর। পিতার ইন্তিকালের পর হযরত খাজা আবদুর রহমান চৌহরভী রিয়াজতের প্রতি মনোনিবেশ করেন। অল্প বয়সেই এমন কঠিন চিল্লা-সাধনা করেন যা বিস্ময়কর এবং সাধারণ মানুষের ধারণার বাইরে। একাধারে ৪০ দিন চিল্লা সাধন করেন। এমনকি পানাহার পর্যন্ত বন্ধ করে দেন। এক পর্যায়ে রক্তবমি করতে লাগলেন। একসময় দেখা যায় রক্ত বন্ধ হয়ে শুধু পানি বের হয়ে আসতে থাকে মুখ থেকে। এভাবে অন্তরাত্মাকে পরিশুদ্ধ করে বেলায়ত লাভের যোগ্য করে তোলেন।

চিল্লা সাধনার পর কামিলপীরের সন্ধানে সোয়াতের রাজধানী মাইদু শরীফে গমন করেন। তথায় শায়খ হযরত খাজা গফুর প্রকাশ আখুন শাহ্ রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হির দরবারে যান। সেখানে হাজার হাজার ভক্ত অনুরক্তের সমাগম ছিল। ভিড়ের কারণে তার সঙ্গে গমনকারী সঙ্গীরা একদিন এক রাত অবস্থান করার পর আখুন শাহ্ রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি এর সঙ্গে দেখা না করে দেশে ফিরে যেতে পীড়াপীড়ি করতে থাকেন। বালক আব্দুর রহমান চৌহরভী সঙ্গীদের বলেন, এতো দূরে এসে এ মহান বুজুর্গের দোয়া নেয়া ছাড়া যাওয়া সমীচীন হবে না। মহান আধ্যাত্ম সাধক হযরত আখুন শাহ্ রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি এর অন্তর্দৃষ্টিতে এটা ধরা পড়ল। তিনি দরবারের খাদেমকে আদেশ দিলেন বাইরে গিয়ে দেখ হাজারা জেলা থেকে অল্পবয়সী এক ছেলে এসেছে। তাঁকে খুঁজে নিয়ে এসো। খাদেম বাইরে গিয়ে এক জ্যোর্তিময় ছেলেকে নিয়ে আসার পর হযরত আখুন শাহ্ রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি পশতু ভাষায় বলে উঠলেন দাগাদি, দাগাদি, দাগাদি অর্থাৎ ইনিই তিনি, ইনিই তিনি। (যার খোঁজ করছিলাম) এভাবে সাক্ষাৎ হল আধ্যাত্মিক জগতের বর্তমান ও ভবিষ্যতের সেতুবন্ধনকারী দুই মহাত্মার।

কাজেই এ ঘটনা থেকে প্রতিভাত হয় হযরত আখুন শাহ্ রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি হযরত খাজা আবদুর রহমান চৌহরভী রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হির অপেক্ষায় ছিলেন।

এরপর হযরত আখুন শাহ্ রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি দোয়া করলেন যার প্রভাব হযরত খাজা চৌহরভী সাথে সাথে অনুভব করেছেন। তাঁর ভাষায়, হযরত আখুন শাহ্ দোয়ার জন্য হাত মুবারক উঠালে মনে হল সমস্ত আসমানের ভার আমার উপর এসে গেছে। আর যখন দোয়া শেষ করলেন তখন ওই ভার হালকা ও মহা আনন্দে পরিবর্তন হয়ে গেল। এরপর হযরত চৌহরভী রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি বায়আত গ্রহণের আবেদন জানালে তিনি জিজ্ঞেসা করলেন রাতে স্বপ্নের মধ্যে কিছু দেখেছেন কিনা?

হযরত খাজা চৌহরভী আরজ করলেন। আমি যে স্থানে চিল্লা করি ওই স্থানকেই দেখেছি। হযরত আখুন শাহ্ রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি বললেন ওই স্থানে গিয়ে অবস্থান করুন, অন্য কোথায়ও যাবেন না। আপনার পীর আপনার কাছে এসেই মুরিদ করাবেন। তিনি চৌহর শরিফে ফিরে এসে তার চিল্লাস্থলে ইবাদত-বন্দেগিতে নিমগ্ন হলেন। কিছুদিন পর কাশ্মীর থেকে প্রখ্যাত অলী হযরত এয়াকুব শাহ্ গিনছাতরী রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি চৌহর শরিফে তাশরিফ আনেন এবং হযরত খাজা চৌহরভী রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হিকে বায়আত করান। আর রূহানী ফয়ুজাত ও তাওয়াজ্জুহ প্রদান করেন। এরপর ইবাদত-রিয়াজতের মাধ্যমে আধ্যাত্মিকতার উচ্চ মার্গে সমাসীন হন। এমনকি আল্লাহর অশেষ কৃপা দৃষ্টিতে এলমে লাদুন্নীর জ্ঞানে উদ্ভাসিত হন। হযরত খাজা চৌহরভী রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি প্রধান ও প্রিয় খলিফা হযরত মাওলানা হাফেজ ক্বারী সৈয়দ আহমদ শাহ্ ছিরিকোটি রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি তাঁর পীরের রূহানী স্তরের বর্ণনায় বলতেন তিনি এত বড় অলীয়ে কামেল হয়েও নিজের বুজর্গীকে সর্বদা গোপন করতেন। এ বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে এমন অসীম জ্ঞান শক্তি দান করেছেন যাতে তাঁর মুহব্বত এশ্ক পরিচিতি এবং জাহেরী ও বাতেনী কামালিয়াত সম্পূর্ণরূপে গোপনীয়তার পর্দায় আবৃত রাখতেন। তিনি নিজের জবানে এটা কখনো বলেন নি যে আমি কিছু জানি। আল্লাহর ওলীগণের স্বভাব হলো তাঁরা জজবাতে এসে কিছু না কিছু জবানে বলে দেন। মাঝে মধ্যে কোন কারণে তাদের কামালিয়াত ও কারামাত প্রকাশ হয়ে পড়ে। আর মাখলুক তাঁদের অনুরক্ত হয়ে যায়। কিন্তু হুজুর খাজা চৌহরভী রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি নিজ কর্মকাণ্ড গুণাবলী এবং কামালিয়াতকে প্রকাশ করা এবং না করা সম্পূর্ণরূপে তাঁর আওতাধীন রাখেন।

একদিন দাদা হুজুর কেবলা আসর নামাযের পর হাতে তসবীহ্ রেখে রাস্তায় পায়চারী করছিলেন। এ সময় এক ব্যক্তি দাদা হুজুরকে সালাম দিয়ে বলেন আপনি তো বুজর্গ লোক আমার জন্য একটু দোয়া করুন। হযরত চৌহরভী রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি দোয়া করার পর জানতে চাইলে লোকটি বলেন তসবী হাতে আপনাকে বুজর্গ মনে হচ্ছে। তাঁর মুখে এ কথা শুনার পর চৌহরভী রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি তসবীহ্ রেখে দেন এবং বাকী জীবন তসবীহ্ ছাড়া আল্লাহর এবাদত, করেন এমনভাবে নিজেকে গোপন রাখতেন যেন তাকে কেউ চিনতে না পারে।

সূর্য উদিত হওয়াই সূর্যের অস্তিত্বের প্রমাণ। কামালিয়াত প্রকাশ না করলেও ঘটনাক্রমে তা প্রকাশ হয়ে যায়। একবার এক ভক্ত চৌহরভী রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হিকে জিজ্ঞাসা করলেন অলি কাকে বলে? অলিদের চেনার উপায় কি? এর উত্তরে খাজা চৌহরভী রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি বলেন মহান আল্লাহ যার উপর রাজি তিনি কামিল অলি। তিনি যা ইচ্ছা করেন আল্লাহর হুকুমে তা হয়ে যায়। যেমন সামনে যে তুঁত গাছ আছে সেটাকে বললে চলে আসবে। এ কথা বলা মাত্র সামনের তুত গাছটি শেকড়সহ চলে আসতে লাগল। তখন হুজুর চৌহরভী রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি ওটাকে থামানোর ইশারা দিয়ে বলল- আমিতো তোমাকে আসতে বলিনি, দৃষ্টান্ত হিসেবে বলছিলাম মাত্র। গাছটি পুনরায় যথাস্থানে চলে গেল। দাদা হুজুর প্রতিষ্ঠিত হরিপুর ইসলামিয়া মাদরাসার সামনে ওই তুত গাছ পাকিস্তানে হরিপুর সফরকালে আমি (লেখক) দেখেছি। এ সব কথা তরিকতপন্থী লোক ছাড়া সাধারণ মানুষের হয়তো বোধগম্য হওয়ার নয়। অথচ এ ধরনের ঘটনা থেকে প্রতীয়মান হয় শুধু মানুষ নয় জীব জন্তু এবং উদ্ভিদের উপরও তাঁর আধ্যাত্মিক প্রভাব ছিল।

এ ছাড়া অন্য একটা তুত গাছ নিয়ে রয়েছে বিস্ময়কর ঘটনা। হযরতুল আল্লামা সৈয়দ আহমদ শাহ্ ছিরিকোটি রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি পবিত্র জবান থেকে শুনা কথা। তিনি বলেন ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দে আমি রেঙ্গুন থেকে দেশে গেলাম। তখন পীর ছাহেব হুজুর কেবলার ইন্তিকালের কয়েক মাস অতিক্রান্ত হয়। দরবার শরীফে দেখি ঘরে বাইরে ভক্ত অনুরক্ত এবং মুরিদানদের বিপুল সমাবেশ। এক ব্যক্তি আমার নিকট এসে কাঁদছিলেন, তিনি আমাকে বলেন, আপনি কোথা থেকে এসেছেন? আমি বললাম রেঙ্গুন শহর থেকে। এ কথা বলার পর একটি তুত গাছের প্রতি ইঙ্গিত করে বললেন ওই গাছটি দেখলে আমার কান্না আসে। এরপর বর্ণনা করলেন এর কারণ ও ঘটনা।

একদিন হযরত খাজা চৌহরভী রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি আমাকে বললেন, আমার কাছ থেকে কিছু হাদিয়া নিয়ে পবিত্র মক্কা-মদীনা শরীফে জিয়ারত করে এস এবং আমার কিছু উপঢৌকন অমুক অমুক লোকদের দিয়ে আসবে। এটা শুনে ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেলাম কারণ আমি ছিলাম ঘুমকাতুর লোক হুকুম মোতাবেক এ দায়িত্ব সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে পারবো কিনা এ চিন্তায় বিভোর ছিলাম। শেষ পর্যন্ত সফরের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে হযরত খাজা চৌহরভী রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি এর নিকট থেকে বিদায় নিতে আসি। হুজুর আমাকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও উপঢৌকন বুঝিয়ে দেয়ার পর আমার সঙ্গে কিছুটা অগ্রসর হলেন এবং গাছটার সামনে এসে বললেন, হে তুত গাছ সফরে গমনকারী ব্যক্তির ঘুম তুমি আমানত রাখ। সফর নির্বিঘ্ন হওয়ার জন্য হুজুর দোয়া করার পর যাত্রা শুরু করি। সেখানে গিয়ে সমস্ত কাজ সুচারুরূপে সম্পন্ন করি। ২-৩ মাস পরে দেশে ফিরে আসি। হুজুর কেবলার কাছে উপস্থিত হয়ে সালাম করি। তারপর তিনি বললেন তুমি তোমার আমানত এ গাছ থেকে নিয়ে যাও। এটা বলার সাথে সাথে পূর্বের মত নিদ্রায় আমাকে আচ্ছন্ন করে। এক নাগাড়ে ঘুমিয়ে থাকার পর অর্ধরাতে হুজুর আমাকে জাগিয়ে তুলে বললেন উঠ রুটি খেয়ে নাও। পরে আবার ঘুমাতে পারবে। গাছ গাছালি বা মানুষের আবেগ-অনুভূতি ও ইন্দ্রিয়ের উপরত তাঁর আধ্যাত্মিক প্রভাব ছিল। এটাই এ ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠে। এ মহান মনীষীর আধ্যাত্মিক শক্তির প্রভাব হাজার হাজার মাইল দূরবর্তী রেঙ্গুন ও বাংলাদেশের মধ্যে তাঁর গায়বী বায়আতের মাধ্যমে অনেকেই নেককার তাহাজ্জুদ গুজার এবং কামেল ওলীতে পরিণত হন।

হাফেজ সৈয়দ আহমদ শাহ্ ছিরিকোটি রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি ১৯২০ সালে শরিয়ত ও তরিকতের প্রচারে বার্মার (মায়ানমার) রেঙ্গুন শহরে তাশরিফ নিয়ে যান। সেখানে হুজুর কেবলার মুখে তরিকতের গুরুত্ব মনোযোগ সহকারে শুনতেন। আলোচনায় হযরত খাজা আবদুর রহমান চৌহরভীর বেলায়তের উচ্চ মকাম সম্পর্কে শুনলে তা বায়আত গ্রহণের জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়েন। উৎসাহী ধর্মপ্রাণ মানুষের এ আগ্রহের কথা বর্ণনা করে হযরত ছিরিকোটি রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি রেঙ্গুন থেকে হযরত চৌহরভী রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি এর নিকট একটি চিঠি লিখেন। ওই চিঠি পাবার পর হযরত চৌহরভী রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি একটা সাদা রুমাল পাঠালেন এবং তার পেয়ে বায়আত করানোর অনুমতি দিলেন হযরত ছিরিকোটি রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হিকে। এরপর সেখানে তরিকতের প্রচার-প্রসার হতে থাকে। বিভিন্ন ধরনের মানুষ তরিকতের সুধা পান করে পরিবর্তিত হয়ে যায়। আচার আচারণে সুন্দর হয়ে উঠে।

এভাবে খাজা চৌহরভী রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি পাকিস্তানের চৌহর শরিফ থেকে বার্মার মুরিদদের ফয়েজ দান করেছেন। কিছুদিন পর হাফেজ ক্বারী সৈয়দ আহমদ শাহ্ ছিরিকোটি রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হিকে রুমালের পরিবর্তে নিজ হাতে মুরিদ বা বায়আত করার অনুমতি দেন।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য-দাদাপীর চৌহরভী রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি রেঙ্গুন শহরে পবিত্র রুমাল মারফতে ১৯২০ সালে যে নিয়ম নীতি চালু ছিল তা বর্তমানে হুজুর কেবলা হযরতুল আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ তাহের শাহ্ (মা.জি.আ.)ও অনুসরণ করছেন। হয়তো তিনি তখন দিব্যদৃষ্টিতে দেখেছিলেন, ব্যাপক মুরিদ হবার আকাঙ্ক্ষকে পূরণে হাতের উপর হাত দিয়ে বায়আত করানো কঠিন হয়ে পড়বে। অলী আল্লাহদের অন্তরের রাডারে সবকিছু ধরা পড়ে।

এলমে লাদুন্নীর মহান ধারক খাজা আব্দুর রহমান চৌহরভী রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি মাজমুয়ায়ে সালাওয়াতে রাসুল নামে দরূদ শরিফের এক বিস্ময়কর গ্রন্থ রচনা করেন। যেটা রচনায় সময় লেগেছিল ১২ বছর ৮ মাস ২০ দিন। অথচ তার আপন লোকদের মধ্যে ঘুর্ণারেও কেউ জানতে পারেন নি। এমন এক বিশাল গ্রন্থ রচনায় তিনি হাত দিয়েছেন। হুজুরের কামালিয়াত জাহেরী ও বাতেনী ইলমের দর্পণ হল হুজুরের রচিত গ্রন্থ মাজমুয়ায়ে সালাওয়াতে রাসুল। সৃষ্টির পূর্বাপর দুনিয়া ও আখিরাত জান্নাত ও দোজখ, মানুষ ও ফিরিস্তা সুলভ কামালিয়াত, সৃষ্টির পূর্বাপর জ্ঞান লাওহে মাহফুজ আরশ কুরসি, পৃথিবীর গুপ্ত ভাণ্ডার ও আসমানের আশ্চর্যতম বিষয়াদি সব বিষয়ের উপর এমনভাবে বর্ণনা করেছেন তা অনেক প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি ও গবেষকদের ভেদ-রহস্য বের করা অত্যন্ত দূরূহ হয়ে পড়েছে।

এটা হল আল্লাহ প্রদত্ত ইলমের এক অনন্য দৃষ্টান্ত আধ্যাত্মিক তাঁর মানদণ্ডে অপ্রতিদ্বন্দ্বী এ গ্রন্থের আবেদন চিরন্তন। বর্তমান পৃথিবীতে তিনটি ত্রিশ পারা সম্বলিত গ্রন্থ রয়েছে।

১. পবিত্র কোরআন করিম,

২. পবিত্র বোখারী শরিফ ও

৩. দাদাপীর রচিত মাজমুয়ায়ে সালাওয়াতে রাসুল।

হযরত চৌহরভী রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি শরিয়তের সঠিক জ্ঞানার্জন করে সাচ্চা আলেম গড়ার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করেন হরিপুর শহরে জামেয়া ইসলামিয়া রহমানিয়া। বর্তমানে পাকিস্তানে এটা অদ্বিতীয় স্বনামধন্য কামিল মাদরাসা। হযরত চৌহরভী রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি দুনিয়া থেকে পর্দা করার পর তাঁর প্রধান খলিফা হাফেজ ক্বারী সৈয়দ আহমদ শাহ্ ছিরিকোটি রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি এ মাদরাসার পৃষ্ঠপোষকতায় ছিলেন। পরবর্তীতে হযরতুল আল্লামা ক্বারী সৈয়দ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হির সুযোগ্য পরিচালনায় এটা উন্নতির শিখরে পৌঁছে। হরিপুর মাদরাসার যাবতীয় কাজ ও মাজমুয়ায়ে সালাওয়াতে রাসুল ছাপানোর কাজ ইত্যাদির খেদমত হুজুর কেবলা বাঙ্গালীদের থেকেই নিয়েছেন। হযরত খাজা চৌহরভী রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি এর নির্দেশে হযরত সৈয়দ আহমদ শাহ্ ছিরিকোটি রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হির তত্ত্বাবধানে ১৯৩৩ সালে প্রথম বার্মার রেঙ্গুনে মাজমুয়ায়ে সালাওয়াতে রাসুল প্রকাশ করা হয়। এরপর দ্বিতীয় বার মুদ্রিত হয় ১৯৫৩ সালের মাওলানা মুহাম্মদ আমীর আলী শাহ্ রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি’র তদারকিতে। এরপর ১৯৮২ সালে হযরতুল আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি’র নির্দেশে আনজুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়ার ব্যবস্থাপনায় বাংলা, উর্দু ও ইংরেজি ভূমিকাসহ তৃতীয় সংস্করণ মুদ্রিত হয়। বর্তমানে আনজুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্টে’র তত্ত্বাবধানে উর্দুতে ৫ম সংস্করণ পর্যন্ত হয়েছে। এ ছাড়া বাংলা ভাষাভাষীদের দীর্ঘদিনের চাহিদা অনুযায়ী এ পর্যন্ত ৯ম পারা বাংলায় অনূদিত হয়েছে। পরবর্তী পারাগুলোও অতি শীঘ্রই প্রকাশ হবে ইনশাল্লাহ্।

হরিপুর মাদরাসার পরিচালনার দায়িত্বও হযরত ছিরকোটি রাহমাতুল্লাহ তা‘আলা আলায়হির উপর ন্যস্ত ছিল। তাঁর ওফাতের পর এ দায়িত্ব অর্পিত হয় হযরত সৈয়দ মুহাম্মদ তৈয়ব শাহ্ রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি’র উপর। তিনি জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এ মাদরাসার অধ্য হিসেবে সুচারুভাবে দায়িত্ব পালন করে গেছেন। দাদাপীর চৌহরভী রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হির জীবনী ও কর্মের উপর আলোকপাত করতে গিয়ে প্রসঙ্গক্রমে মোর্শেদে বরহক হাফেজ ক্বারী সৈয়দ আহমদ শাহ্ এবং হাফেজ ক্বারী সৈয়দ মুহাম্মদ তৈয়ব শাহ্ রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হিম এর নাম অনিবার্যভাবে এসে যায়। এ তিন পুণ্যাত্মা মনীষী মাজহাব ও মিল্লাত তথা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের যে খেদমত আনজাম দিয়েছেন তা কেয়ামত পর্যন্ত জারি থাকবে। পীর আউলিয়াদের কাজে ভৌগলিক কোন সীমারেখা থাকে না। সময়ের প্রয়োজনে অবস্থার কারণে তারা বিভিন্ন দেশে জাহেরীভাবে মাদরাসা, বাতেনীভাবে খানকাহ্ প্রতিষ্ঠা করে নবী প্রেমিকদের প্রাণের চাহিদা পূরণ করে থাকেন।

প্রকৃতপক্ষে বর্তমানেও এ ভৌগোলিক রেখা সত্ত্বেও দু’দেশের মুসলমানগণ একই রূহানী আত্মীয়তার অভিন্ন সূত্রে গ্রথিত। যার প্রকৃষ্ট প্রমাণ হল হযরত চৌহরভী রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি রচিত মাজমুয়ায়ে সালাওয়াতে রাসূল এর বাংলা ও উর্দু তরজমাসহ মুদ্রণ ও পুণঃমুদ্রণ প্রকাশ যা বাংলাদেশী ভাইদের আন্তরিকতা নিষ্ঠা ও ভালোবাসার জীবন্ত দলিল হয়ে আছে। এ আন্তরিক ভালোবাসা ও হৃদ্যতা মহান আল্লাহর মতাধীন। যেখানে কারো শক্তি চলে না। চলতে পারে না।