হিজরি নববর্ষ :  মহানবীর ত্যাগের ঐতিহাসিক স্মারক-কাশেম শাহ

0

লেখক: দৈনিক আজাদীর সিনিয়র সহ সম্পাদক

হিজরি নববর্ষ মুসলিম জাতির এক অনন্যোজ্জ্বল গৌরবগাথা ও ইতিহাসের দিন। নিজেদের অস্তিত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বিশ্ব মুসলিমকে নব চেতনায় উদ্দীপ্ত করতে হিজরি নববর্ষ অতীব গুরুত্বপূর্ণ। মুসলমানদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় সকল আচার অনুষ্ঠান ও ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিধি-বিধান বা ইবাদত এই হিজরি তারিখের উপর নির্ভরশীল। ইসলামের পালনীয় গুরুত্বপূর্ণ যেমন- রোজা, ঈদ, হজ, ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম, লাইলাতুল কদর, লাইলাতুল বরাত, লাইলাতুল মিরাজ, আশুরাসহ সকল ধর্মীয় উৎসব পালন করতে হয় হিজরী তারিখ তথা চাঁদের হিসেবের উপর। তাই ইসলামে এ সন সমগ্র মুসলিম জাতির জন্য এক বিশেষ স্মারক।

চাঁদের হিসেবে সমস্ত ইবাদত বন্দেগির প্রচলন হযরত আদম আলাইহিস সালাম এর সময় থেকে প্রচলিত ছিল। কিন্তু হিজরি বর্ষ বা সন গণনার প্রবর্তন হয় ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর ফারুক রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর খেলাফতের চতুর্থ বছর (৬৩৮ খ্রিস্টাব্দ) থেকে। তখন তিনি অর্ধ পৃথিবীর শাসনকর্তা ছিলেন।

হিজরি সন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ত্যাগের ঐতিহাসিক স্মারক। এ সন আমাদের মনে করিয়ে দেয় কিভাবে অবিশ্বাসীরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পৃথিবী হতে সরিয়ে দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল। মহররম মাস শুধু কারবালার ঘটনা স্মরণ করার মাসই নয় এ মাস গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার, ত্যাগের, ভালো কাজ করার, খারাপ কাজ হতে বেঁচে থাকার এবং মুসলিম বিশ্বকে নতুন করে গড়ার প্রতিজ্ঞা করার মাস। হিজরি নববর্ষ আমাদেরকে ইসলামের ত্যাগের আদর্শের দিকেই আহ্বান করে।

যেভাবে এল হিজরি সন
হিজরি সনের শুরু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মক্কা থেকে মদিনা হিজরতের সময় থেকে। হিজরি সন কবে চালু হয় তা নিয়ে অবশ্য মতভিন্নতা আছে। একটি মত হলো রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা থেকে মদিনা মুনাওয়ারায় আগমন করেন রবিউল আউয়াল মাসে। ওই সময় থেকে তারিখ গণনা শুরু হয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লালল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই তারিখ গণনার নির্দেশ দেন। ইমাম জুহরির এমন একটি বর্ণনা মুহাদ্দিস হাকিম তার ইকলিল নামের কিতাবে উল্লেখ করেছেন।

এ সম্পর্কে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ভাষ্য হলো দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর খেলাফত আমলে হিজরি সনের তারিখ গণনা শুরু হয়। একদিন হজরত আবু মুসা আশআরি রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু খলিফা হজরত উমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুকে পত্র লিখে বলেন, আপনার নির্দেশগুলো আমাদের কাছে এসে পৌঁছলেও এতে তারিখ উল্লেখ নেই। হজরত উমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু ১৭ হিজরিতে তারিখ নির্ধারণের বিষয়ে পরামর্শ করার জন্য বিশিষ্ট সাহাবায়ে কিরামদের সহযোগিতা চান। এ সম্পর্কে আয়োজিত সভায় সাহাবায়ে কিরামদের কেউ নবুওয়াতের সূচনা থেকে তারিখ গণনার প্রস্তাব দেন। কেউ প্রস্তাব দেন হিজরত থেকে আবার কেউ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের দিন থেকে তারিখ গণনার। সাহাবায়ে কিরামদের এসব প্রস্তাব শোনার পর হজরত উমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু হিজরতের দিন থেকে ইসলামী তারিখ গণনার পক্ষে বলেন। তিনি যুক্তি দেখান হিজরতের মাধ্যমে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য সূচিত হয়। সাহাবা কিরামরা এ প্রস্তাবকে সাদরে গ্রহণ করেন। হিজরতের সময়কে ইসলামী সন গণনার সূচনাকাল ধরা হলেও মহররম মাসকে প্রথম মাস হিসেবে ধরা হয়। কারণ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রবিউল আউয়াল মাসে হিজরত করলেও মক্কা থেকে মদিনা মুনাওয়ারায় যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন মহররম মাসে। মহররম মাসকে ইসলামী সন বা হিজরি সনের প্রথম মাস নির্ধারণের পেছনে পবিত্র কোরআনের একটি নির্দেশনা গুরুত্ব পেয়েছে। পবিত্র কোরআনে চারটি মাসকে সম্মানিত বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, এ চারটি মাস হলো জিলকদ, জিলহজ, মহররম ও রজব। মহররম মাসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরতের ইচ্ছা ঘোষণা করায় এবং এ চারটি সম্মানিত মাসের অন্যতম হওয়ায় তা সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।

আরেক বর্ণনায় জানা যায়, আল-উকদুদ দিরায়া নামক গ্রন্থে রয়েছে-ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা উমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর শাসনামলে উমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর কাছে একটি চুক্তিপত্র আনা হয়। সেখানে শাবান মাসের কথা উল্লেখ ছিল। তখন উমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বললেন, এটা কি গত শাবান না আগামী শাবান মাস? অতঃপর তিনি তারিখ গণনার নির্দেশ দিলেন এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মদীনায় হিজরতকে কেন্দ্র করে হিজরি সন গণনার সূচনা করেন। এসময় মুহররমকে প্রথম মাস হিসেবে গণ্য করা হয়। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিজরত করেন ৬২২ খ্রিস্টাব্দের ১৬ জুলাই। সেই দিনকে মুহাররম মাসের শুক্রবার হিসেবে ধরে হিজরি সাল গণনা শুরু হয়। উক্ত হিজরি হিসেবের প্রথম প্রয়োগ ঘটে উমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর শাসনামলের ৩০ জমাদিউল উখরা/ ১৭ হিজরি অর্থাৎ ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দের ১২ জুলাই থেকে। এরই ধারাবাহিকতায় আজও হিজরি সন চলে আসছে। হিজরি সন গণনার পূর্বে আরবরা আরবি মাসগুলো ব্যবহার করতেন। অন্যান্য সব সনের মতো হিজরি সনেও ১২টি মাস রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেন, নিশ্চই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকেই আল্লাহর বিধানে আল্লাহর নিকট মাস গণনার বারোটি মাস, তন্মধ্যে চারটি সম্মানিত। [সূরা তাওবা; আয়াত-৩৬]

এ আয়াতের চারটি সম্মানিত মাসকে চিহ্নিত করতে গিয়ে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিদায় হজের সময় মিনা প্রান্তরে দাঁড়িয়ে বলেন, তিনটি মাস হলো জিলকদ, জিলহজ ও মুহররম এবং অপরটি হলো রজব। [তাফসীর ইবনে কাসির]

আমাদের দেশে হিজরি বর্ষ
ফেলে আসা দিনগুলোর গ্নানিকে মুছে ফেলে ও দুঃখ-কষ্ট ভুলে গিয়ে নতুন পরিকল্পনা নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য নতুন বছরের শুরুর সময়টার গুরুত্ব রয়েছে। আমাদের দেশে প্রচলিত বঙ্গাব্দ বা বাংলা সন মূলত ইসলামী হিজরী সনেরই একটি রূপ। ভারতে ইসলামী শাসনামলে হিজরি পঞ্জিকা অনুসারেই সকল কাজকর্ম পরিচালিত হতো। মূল হিজরি পঞ্জিকা চান্দ্র মাসের উপর নির্ভরশীল। চান্দ্র বৎসর সৌর বৎসরের চেয়ে ১১ দিন কম হয়। কারণ সৌর বৎসর ৩৬৫ দিন, আর চান্দ্র বৎসর ৩৫৪ দিন। একারণে চান্দ্র বৎসরে ঋতুগুলো ঠিক থাকে না। আর চাষাবাদ ও এ জাতীয় অনেক কাজ ঋতুনির্ভর। এজন্য ভারতের মোগল সম্রাট আকবরের সময়ে প্রচলিত হিজরি চান্দ্র পঞ্জিকাকে সৌর পঞ্জিকায় রূপান্তরিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সম্রাট আকবর তার দরবারের বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিদ আমির ফতুল্লাহ শিরাজীকে হিজরি চান্দ্র বর্ষপঞ্জীকে সৌর বর্ষপঞ্জীতে রূপান্তরিত করার দায়িত্ব প্রদান করেন। ৯৯২ হিজরি মোতাবেক ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে স¤্রাট আকবর এ হিজরি সৌর বর্ষপঞ্জীর প্রচলন করেন। তবে তিনি ঊনত্রিশ বছর পূর্বে তার সিংহাসন আরোহনের বছর থেকে এ পঞ্জিকা প্রচলনের নির্দেশ দেন। এজন্য ৯৬৩ হিজরি সাল থেকে বঙ্গাব্দ গণনা শুরু হয়। ইতোপূর্বে বঙ্গে প্রচলিত শকাব্দ বা শক বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস ছিল চৈত্র মাস। কিন্তু ৯৬৩ হিজরি সালের মুহররাম মাস ছিল বাংলা বৈশাখ মাস, এজন্য বৈশাখ মাসকেই বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস এবং ১লা বৈশাখকে নববর্ষ ধরা হয়।

মুসলিম হিসেবে হিজরি নববর্ষ উদযাপন কিংবা মুসলিমদের গৌরবের দিনটি পালনের ঐতিহ্য আমাদের সংস্কৃতিতে ব্যাপকতা লাভ করেনি। মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশেও তেমন গুরুত্ব দিয়ে দিনটি উদযাপন করা হয় না। কয়েকটি ইসলামী সংগঠন এদিন রাষ্ট্রীয় ছুটি ঘোষণার দাবি জানিয়ে আসলেও তা সরকারের উচ্চ পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছছে না। তার চেয়েও বড় কথা, বিষয়টি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা যায়নি। অনেকে আমরা জানি না যে, মুসলিমদের নববর্ষ কোন মাসে হয়? আবার কেউ হয়তবা হিজরি বর্ষ গণনার সঠিক ইতিহাস জানেন না! হিজরি সনের তারিখের খবরও রাখেন না। এর প্রতি মানুষ আকর্ষণও অনুভব করেন না। আবার ভিন্নমতও রয়েছে। হিজরি সনের প্রথম মাস কারবালার ঐতিহাসিক হৃদয় বিদারক ঘটনার অনন্য স্মৃতি বহন করে চলেছে। মুসলিম বিশ্বে মহররম মাসকে শোকের মাস হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়। এ মাসের ১০ তারিখ কারবালা ময়দানে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামের প্রিয় দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুসহ অসংখ্য সাহাবায়ে কেরাম শাহাদাতের সুধা পান করেছেন নির্মম ইয়াজিদ বাহিনীর হাতে। তাই শোকের এ মাসটির শুরুতে অনেকেই আনন্দ উৎসব উদযাপন করাকে ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক বলেও মনে করেন। তবে অন্যায়, অসত্য ও স্বৈরাচারের কাছে মাথানত না করে ইমাম হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর সহযোগীদের নিয়ে কারবালার শিক্ষাই মুসলমানদেরকে যুগে যুগে অন্যায়, অসত্য ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রামে উৎসাহ যোগায়। এ কারণেই বলা হয়ে থাকে ‘ইসলাম জিন্দা হোতা হ্যায় হার কারবালা কি বাদ’।

কবি নজরুল ইসলাম লিখেন,
ফিরে এলো আজ সেই মোহররম মাহিনা,——
ত্যাগ চাই, মর্সিয়া-ক্রন্দন চাহি না !

তবে আশার কথা হচ্ছে চট্টগ্রামে গত কয়েক বছর ধরে ইসলামী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পালনের মধ্য দিয়ে হিজরি নববর্ষকে বরণ করে নেয়া হচ্ছে। হিজরি নববর্ষ উদযাপন পরিষদের ব্যানারে ডিসি হিল, মুসলিম হল, লালদীঘি ময়দান, শিল্পকলা একাডেমিসহ গ্রামেগঞ্জে প্রায় সব উপজেলায় হিজরি নববর্ষ পালন করা হচ্ছে। কিন্তু শুধু চট্টগ্রামে সীমাবদ্ধ থাকলে, আর একদিন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করলেই হিজরি নববর্ষের গুরুত্ব সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেয়া যাবে না। এজন্য স্কুল কলেজ, মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের জন্য সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন, পৃথক প্রকাশনা, লেখালেখি, আলোচন সভাসহ বিবিধ কর্মসূচি হাতে নিতে হবে। শুধু গণমাধ্যম নয়, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতেও জোরালো ভুমিকা রাখতে হবে। ধর্মীয় সংগঠন ছাড়াও সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে অনুষ্ঠান আয়োজনে সম্পৃক্ত করতে হবে।