দাওয়াতে খায়র’র গুরুত্ব ও আমাদের দায়িত্ব – মাওলানা আবু যাহরা মুহাম্মদ মোজাম্মেল হক

0

একজন মুসলমানের মহামূল্যবান সম্পদ হচ্ছে তার ঈমান। এটা আল্লাহ্ প্রদত্ত সর্বশ্রেষ্ঠ নি’মাত। এ নি’মাতের শোকর আদায় করে, তৃপ্ত হওয়া যে, সারাজীবন এ নি’মাতের শোকরিয়া আদায় করে তার হক্ব আদায় করা পরিপূর্ণ হলো এ ধারণা করা নিছক ভুল। বান্দার কর্তব্য হচ্ছে আজীবন এ নি’মাতের শোকর আদায় করতে থাকা এবং মাওলার দরবারে ফরিয়াদ করতে থাকা যেন এ নি’মাত কখনো ছিনিয়ে নেয়া না হয়। আর মহামূল্যবান সম্পদের কদর করা, তা রক্ষার জন্য সচেষ্ট থাকা বান্দার জন্য অপরিহার্য। সুতরাং আল্লাহ্ তা‘আলার অবাধ্যতা থেকে নিজেকে রক্ষা করে তাঁর গোলামীতে নিজেকে সঁপে দেয়া একান্ত কর্তব্য। কথিত আছে, যে নি’মাতের সম্মান মানুষ করে না ঐ নি’মাত তার কাছ থেকে কেড়ে নেয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া কতিপয় ওলামায়ে কিরাম বলেন, যার জীবনে নিজ ঈমানের চিন্তা-ভাবনা থাকবে না, মৃত্যুর সময় তার ঈমান ছিনিয়ে নেয়ার ভয় রয়েছে। কিন্তু আফসোস হচ্ছে যে, আমাদের মাঝে এ নি’মাতের চিন্তা ভাবনা নিু পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। আজ আমরা আমাদের মূল্যবান বস্তু রক্ষায় কতো সুরক্ষিত ব্যবস্থা গ্রহণ করি অথচ ঈমানের ব্যাপারে চরম উদাসীনতা।
উদাহরণ স্বরূপ, একটি দামী মোবাইল সেট যদি আমাদের পকেটে থাকে তবে গাড়ীতে বারবার হাত নিজ পকেটের দিকে অগ্রসর হবে যে, মোবাইল স্বস্থানে আছে, না ছিনতাই হয়ে গেছে। কেবল মোবাইল নয় সারা জাহানের সম্পদের চেয়ে অধিক মূল্যবান আমাদের ঈমান। অথচ এতো দামী নি’মাত’র চিন্তা আজ আমাদের কাছ থেকে নিঃশেষ হতে চলেছে। কেননা ঈমান রক্ষার চিন্তা যদি থাকতো, তাহলে একজন মুসলমান কখনো নামায কাযা করতো না। অন্যান্য ফরযসমূহ পালন করত এবং হারাম কাজগুলো বর্জনে এতো অলসতা প্রদর্শন করতো না, দুনিয়াকে আখিরাতের উপর প্রাধান্য দেয়া হতো না। বর্তমানে অধিকাংশ মুসলমানের একটা উন্নত জীবন মান ভবিষ্যৎ গঠনের পরিকল্পনায় ঝোঁক বেশি। কবর ও হাশরের চিন্তা-ভাবনা কোথায়? আখিরাতে সফলতার পরিকল্পনা কোথায়? অথচ আখিরাতের ভাবনাকে ইহকালের চিন্তার উপর প্রাধান্য দেয়া হলে দুনিয়া ও পরকাল উভয় জগতে সাফল্য নিহিত।
আল্লাহ্ জাল্লাশানুহুর মহান দয়ায় ঈমানের ন্যায় আযীমুশ্শান নি’মাত আমরা লাভ করেছি। এটা কতো মূল্যবান নি’মাত-এর কিছু বর্ণনা নিুে উল্লেখ করছি। কীমীয়ায়ে সা‘দাত গ্রন্থে হযরত সাইয়্যিদুনা ইমাম মুহাম্মদ গাযালী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি উদ্ধৃত করেছেন, একদিন হযরত সাইয়্যিদুনা ঈসা রূহুল্লাহ্ আলায়হিস্ সালাম এক ব্যক্তিকে দেখলেন যে, সে অন্ধ ও কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত। এ ছাড়া তার সর্বাঙ্গ অবশ হয়ে গেছে। এতদসত্ত্বেও সে তার মুখ দিয়ে বলছে ‘হে আল্লাহ্! তোমার বড়ই শোকর, হে মালিক! তোমার বড়ই শোকর।’ হযরত ঈসা আলায়হিস্ সালাম জিজ্ঞাসা করলেন, এমন কোন মুসিবত রয়েছে, যা আল্লাহ্ তোমাকে দেননি। এরপরও তুমি কোন নি’মাতের শোকর আদায় করছো? জবাব দিলো, ‘এটা ঠিক যে, আমি অন্ধ, কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত এবং পক্ষাঘাত গ্রস্তও। কিন্তু আল্লাহ্ তা‘আলা কি আমাকে ঈমানের দৌলত দ্বারা ধন্য করেননি? আমি তার জন্য শোকর আদায় করছি।’
হযরত ঈসা আলায়হিস্ সালাম বললেন, ‘তুমি যথার্থই বলেছো।’ অতঃপর তিনি আপন হাত মোবারক তার দেহে বুলিয়ে দিলেন তৎক্ষণাৎ সে সুস্থ হয়ে উঠে বসলো, এবং তাঁর চোখের জ্যোতিও ফিরে এলো। [ইহ্সাসে নি’মাত] আল্লাহ্ তা‘আলা’র একান্ত দয়ায় আমরা মুসলমানের ঘরে জন্ম নেয়া নিশ্চয় তাঁর অনেক বড় ইহসান আমাদের প্রতি। তিনি যদি চাইতেন, আমাদের কোন ইয়াহুদির ঘরে পাঠিয়ে দিতেন আর আমরাও আল্লাহর পানাহ! হযরত সাইয়্যিদুনা উযাইর আলায়হিস্ সালামকে আল্লাহ’র পুত্র মেনে নিজ আখিরাতকে বরবাদ করতাম। অথবা যদি চাইতেন কোন খ্রিস্টানের ঘরে পাঠিয়ে দিতেন আর আমরাও আল্লাহ’র পানাহ! হযরত সাইয়্যিদুনা ঈসা আলায়হিস্ সালামকে তাঁর সন্তান কিংবা খোদার পুত্র খোদা হিসেবে মেনে চিরস্থায়ী জাহান্নামের ঠিকানা করে নিতাম। অথবা যদি চাইতেন, তবে কোন হিন্দু কিংবা অগ্নি পুজারীর ঘরে সৃষ্টি করতেন তাহলে আমরা মূর্তি ও আগুনের পূজার মধ্যে জীবন অতিবাহিত করতাম। পক্ষান্তরে ঈমান ও ইসলামের বদৌলতে আখিরাতের চিরস্থায়ী শাস্তি থেকে আল্লাহ্ তা‘আলার দয়ায় রক্ষা পাওয়া যায়। কেননা কাফির ও মুশরিকদের চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামে অবস্থান ক্বোরআনুল করীমের আয়াত দ্বারা প্রমাণিত। আল্লাহ্ তা‘আলা সূরা নিসার ৪৮ নম্বর আয়াতে এরশাদ করেন-
اِنَّ اللهَ لَايَغْفِرُ اَنْ يُّشْرِكْ بِهِ وَيَغْفِرُ مَادُوْنَ ذَالِكَ لِمَنْ يَّشَاءُ-
আ‘লা হযরত ইমাম আহমদ রযা রাহমাতুল্লাহি আলায়হি তাঁর বিশ্ববরেণ্য তরজমা ক্বোরআন ‘কান্যুল ঈমান’-এ উক্ত আয়াতের এরূপ অনুবাদ করেন- নিশ্চয় আল্লাহ্ তাঁর সাথে কুফর (শিরক) করার অপরাধ ক্ষমা করেন না। এবং কুফরের নিু পর্যায়ের যা কিছু আছে তা যাকে চান ক্ষমা করে দেন; [ইহসাসে নি’মাত: পৃষ্ঠা ২১] আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য
একজন ঈমানদারের ইসলামের মৌলিক বিষয়াবলীর উপর ঈমান আনার পর তার প্রতি ইসলামের কিছু দায়িত্ব বর্তায়। এসবের মধ্যে সর্বপ্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য হচ্ছে, নামায কায়েম করা। সকল প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমান নর-নারীর উপর তা ফরযে আইন। আর এ নামাযসহ অন্যান্য কল্যাণকর কাজের প্রতি মানুষকে আহ্বান করা বা দাওয়াত দেয়াও একজন ঈমানদারের উপর ফরয।
তবে তা হলো ফরযে কিফায়া অর্থাৎ ঈমানদারদের মধ্য থেকে একটি অংশ এ দায়িত্ব পালন করলে বাকীরা এ ফরযের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাবে। অন্যথায় সকলেই এ দায়িত্বে অবহেলার কারণে গুনাহগার হবে। সুতরাং মহান দয়ালু মালিক ক্বোরআন মজীদের মধ্যে বিভিন্ন স্থানে এ দায়িত্বের প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছেন। যেমন, সূরা আলে ইমরান’র ১০৪ নম্বর আয়াতে করীমায় এরশাদ করেন-
وَلْتَكُنْ مِّنْكُمْ اُمَّةُ يَّدْعُوْنَ اِلَى الْخَيْرِ وَيَاْمُرُونَ بِالْمَعْرُوْفِ وَيْنْهَوْنَ عَنِ المُنْكَرِ وَاُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْن-
অনুবাদ: এবং তোমাদের মধ্যে একটা দল এমন হওয়া চাই, যারা কল্যাণের প্রতি আহ্বান জানাবে, ভাল কাজের নির্দেশ দেবে এবং মন্দ থেকে নিষেধ করবে। আর এসব লোকই লক্ষ্য স্থলে পৌঁছেছে। [কান্যুল ঈমান] এ পবিত্র আয়াতের তাফসীর বর্ণনায় প্রসিদ্ধ মুফাস্সির হাক্বীমুল উম্মত মুফতি আহমদ ইয়ার খান নঈমী রাহমাতুল্লাহি আলায়হির তাফসীরে নঈমীতে লিখেছেন, ‘হে মুসলমানরা! তোমাদের সবাইকে এমন দলে পরিণত হওয়া চাই, তোমরা এমনই দল হও, কিংবা এমন দল হয়েই থাকো, যারা সমস্ত বক্র লোককে সৎকাজের দাওয়াত দেবে- কাফিরদের ঈমানের, ফাসিক্বদের তাক্বওয়ার, উদাসীনদেরকে জাগ্রত হবার, অজ্ঞলোকদেরকে ইল্ম ও মা’রিফাতের, রুক্ষ মেজাজের লোকদেরকে ইশ্বক্বের তৃপ্তির, শয়নকারীদেরকে জাগ্রত হবার, আর সৎ কাজের ও বিশুদ্ধ আক্বিদার- মৌখিকভাবে, কলম দিয়ে, কর্ম ও শক্তি দিয়ে, নম্রতা সহকারে, (আর শাসক, শাসিতদেরকে) কড়াভাবে নির্দেশ দেবে। তাছাড়া, মন্দ কথা ও মন্দ আক্বিদা, মন্দ কাজ, ও মন্দ ইচ্ছা এবং মন্দ ধারণাদি থেকে লোকদেরকে মুখে, অন্তরে, কলম ও তরবারি দ্বারা, (নিজ নিজ পদ মর্যাদা অনুসারে) রুখবে।
তিনি আরো লিখেছেন, ‘‘সমস্ত মুসলমান দ্বীনি প্রচারক। সবারই উপর ফরয হচ্ছে লোক-জনকে সৎ কাজের নির্দেশ দেয়া, মন্দ কার্যে বাধা দেয়া।’’
আল্লাহ্ জাল্লাশানুহু সবকিছু করতে পারেন, তিনি কোন বিষয়েই কখনো কারো মুখাপেক্ষী নন। তিনি পৃথিবী সৃষ্টি করে সেটাকে বিভিন্নভাবে সাজিয়ে তাতে মানব জাতিকে বসবাসের ব্যবস্থা করেছেন। আর মানুষের হিদায়তের জন্য সময়ে সময়ে রসূল ও নবীগণ আলায়হিমুস্ সালামকে প্রেরণ করেছেন। তিনি ইচ্ছা করলে নবীগণ আলায়হিমুস্ সালাম ছাড়াও মানুষের সংশোধন করতে পারতেন। কিন্তু তিনি এটাই পছন্দ করেছেন, তার বান্দাই সৎ কাজের নির্দেশ দেবে। অসৎ কর্মে বাধা দেবে, তার পথে কষ্ট সহ্য করে তার মহান দরবারে উচ্চ মর্যাদা লাভ করে উভয় জগতে সফলতা লাভ করে। তাফসীরে নঈমী শরীফে রয়েছে যে, হুযূর তাজদারে রিসালাত সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
بَلِّغُوْا عَنِىْ وَلَوْ اَيَةً-
অর্থাৎ- আমার পক্ষ থেকে পৌঁছিয়ে দাও, যদিও হয় একটা মাত্র আয়াত।
কাজেই প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য হচ্ছে, অপর মুসলমানকে সৎ পথের নির্দেশ দেয়া এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখা কিন্তু আফসোস বর্তমান যুগে অসংখ্য মুসলমান এ কাজ থেকে একেবারে উদাসীন, এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয়। আজ এক মুসলমান অপরকে কিভাবে সৎ কাজের নির্দেশ ও অসৎ কাজে বাধা দেবে, নিজেই নানা অসৎ কাজে লিপ্ত এবং বিজাতীয় পশ্চিমা সংস্কৃতির মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছে। আর এটাকেই উন্নতির সোপান গণ্য করেছে।
نه سمجوگے تو مٹ جاؤگے اے مسلمانو!
تمهارى داستاں تك بهى نه هوگى داستانوں ميں-
উচ্চারণ:
নাহ্ সামঝো গে তো মিট জাওগে আয় মুসলমানো
তোমহারী দাস্তাঁ তক্ভী নাহ্ হোগী দাস্তানোঁ মে।
অর্থাৎ যদি অনুধাবন না করো, তবে হে মুসলমানরা! তোমরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। কিংবদন্তীর মধ্যে তোমাদের নাম নিশানা টুকুও অবশিষ্ট থাকবে না।
অথচ আমরাই ইতিহাস, আমরাই কিংবদন্তী- চতুর্দিকে আমাদেরই জয় জয় কার। আল্লাহ্ পাক এ উম্মতের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে ক্বোরআন মজীদে ইরশাদ করেন-
كُنْتُمْ خَيْرَ اُمَّةٍ اُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَاْمُرُوْنَ باِلْمَعْرُوْفِ وَتَنْهَوْنَ عِنِ المُنْكَرِ وَتُوْمِنُوْنَ بِاللهِ-
তোমরা শ্রেষ্ঠতম ঐসব উম্মতের মধ্যে, যাদের আত্ম প্রকাশ ঘটেছে মানব জাতির মধ্যে, সৎ কাজের নির্দেশ দিচ্ছে এবং মন্দ কাজ থেকে বারণ করছে, আর আল্লাহ্র উপর ঈমান রাখছে। [কান্যুল ঈমান] তাফসীরে নুরুল ইরফানে উল্লেখ করা হয়েছে এ থেকে বুঝা গেলো যে, প্রত্যেক মুসলমানকেই ধর্মের প্রচারক হওয়া চাই। যে মাসয়ালা জানা থাকে তা সবাইকে বলবে আর নিজেও তদনুযায়ী আমল করবে (কাজের মাধ্যমে) প্রচার করবে। আর যে ব্যক্তি কথা কাজের মাধ্যমে প্রকাশ করতে সক্ষম হবে সে-ই উত্তম মানুষ। আর এ গুণের ধারক হিসেবে তিনি আল্লাহ্ পাকের প্রিয় বান্দায় পরিণত হন। তাই তার মুখ নিঃসৃত কথাগুলো বা আল্লাহর বান্দাদের সৎ পথে আনার জন্য কিংবা মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখার জন্য তাঁর মুখ থেকে বের হয় তাও আল্লাহ্ পাকের এতই পছন্দ যে, রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-
وَمَنْ اَحْسَنَ قَوْلًا مِمَّنْ دَعَا اِلَى اللهِ-
এবং তার চেয়ে কার কথা অধিক উত্তম যে আল্লাহর প্রতি আহ্বান করেছে। [সূরা হা-মীম: আয়াত- ৩৩, কান্যুল ঈমান] (চলবে)