দা’ওয়াতে খায়র তাৎপর্য ও পদ্ধতি

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

দা’ওয়াতে খায়র তাৎপর্য ও পদ্ধতি

 লেখক- এডভোকেট মোছাহেব উদ্দিন বখতিয়ার

যুগ্ম মহাসচিব-গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ

সম্পাদনায়- মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল মান্নান

মহাপরিচালক, আনজুমান রিসার্চ সেন্টার

দা’ওয়াতে খায়র’ গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ কর্তৃক অনুসৃত ও পালিতব্য একটি সময়োপযোগী কর্মসূচি। ‘দা’ওয়াত’ বলতে বুঝায়- আহ্বান করা, আমন্ত্রণ জানানো আর ‘খায়র’ মানে হলো- উত্তম, ভালো, কল্যাণ ইত্যাদি। সুতরাং ‘দাওয়াতে খায়র’ বলতে বুঝায় ‘কল্যাণের প্রতি আহ্বান করা’ বা আমন্ত্রণ জানানো।

কুরআনে করীমের সূরা আল-ই ইমরান, আয়াত-১০৪-এ আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ করেন-

وَلْتَكُن مِّنكُمْ أُمَّةٌ يَّدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ ۚ وَأُولَـٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ

উচ্চারণ:‘‘ওয়ালতাকুম্ মিন্কুম উম্মাতুইঁ ইয়াদ্‘ঊ-না ইলাল খায়রি ওয়া ইয়া’মুরূ-না বিল্ মা’রূ-ফি ওয়া ইয়ান্হাউনা ’আনিল্ মুন্কার। ওয়া উলা—-ইকা হুমুল মুফলিহু-ন।’’

তরজমা: ‘তোমাদের মধ্যে একটা দল এমন থাকা চাই, যারা কল্যাণের প্রতি আহ্বান জানাবে, ভালো কাজের নির্দেশ দেবে এবং মন্দ থেকে নিষেধ করবে, আর এসব লোকই লক্ষ্যস্থলে পৌঁছে।’                        [সূরা আল-ই ইমরান: আয়াত-১০৪, কান্যুল ঈমান]

দা’ওয়াতে খায়র’শিরোনামটি মূলত: উক্ত আয়াত থেকেই নেওয়া হয়েছে। এ আয়াত শরীফে দা’ওয়াত এবং খায়র শব্দযুগল যেমন রয়েছে, ঠিক তেমনি এ কাজের প্রকৃতি সম্পর্কেও বর্ণনা রয়েছে। তাই দরবার-এ আলিয়া কাদেরিয়া, সিরিকোটিয়া শরীফের অন্যতম সাজ্জাদানশীন এবং আনজুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট’র নির্বাহী সভাপতি হযরতুলহাজ্ব আল্লামা পীর সৈয়দ মুহাম্মদ সাবির শাহ্ (মু.যি.আ.) এ কর্মসূচির নাম দিয়েছেন ‘দা’ওয়াতুল খায়র’ বা দা’ওয়াতে খায়র’ অর্থাৎ ‘কল্যাণের পথে আহ্বান করা’ বা ‘কল্যাণের পথে দাওয়াত দেওয়া।’

কুরআনে করিমের অন্যত্র একই বিষয়ে বর্ণনা এসেছে-

كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ

وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللّهِ

উচ্চারণ: ‘কুনতুম খায়রা উম্মাতিন উখরিজাত লিন্না-সি তা’মুরূ-না বিল মা’রূ-ফি ওয়া তান্হাউনা ’আনিল মুন্কারি ওয়া তু’মিনূ-না বিল্লা-হ্’।

তরজমা: তোমরা হলে শ্রেষ্ঠতম ওইসব উম্মতের মধ্যে, যাদের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে মানবজাতির জন্য; (যেহেতু) প্রকৃত সৎ কাজের নির্দেশ তোমরাই দিচ্ছো আর মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখছো এবং আল্লাহর উপর (যথার্থ) ঈমান রাখছো’।

[সূরা আল-ই ইমরান, আয়াত ১১০, কান্যুল ঈমান]

সুতরাং ‘দা’ওয়াতে খায়র’-এর উদ্দেশ্য হলো এমন একটি দল তৈরী করা, ‘যারা সৎকাজের আদেশ দেবে এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখবে’। এ কাজটি তারা প্রত্যক্ষভাবে করবে- জনে জনে গিয়ে দাওয়াত করবে, প্রয়োজনে সাথে করে কিছু লোককে এক জায়গায় নিয়ে আসবে এবং সেখানে দ্বীনি তালিম দেবে। এই দ্বীনি তালিমের বিষয় হবে জরুরি মাস্আলা-মাসা-ইল ও ফাযাইল। শরিয়তের এ মাসায়েল-ফাযায়েল শিক্ষার প্রারম্ভে কুরআনে করীমের দরস এবং হাদিস শরীফ থেকেও আলোচনা করা হবে। স্থানীয় মসজিদ বা অন্য কোন উপযোগী স্থানে এ দাওয়াতি মজলিস অনুষ্ঠিত হবে।

কেন এ মজলিস, কেন এ দাওয়াত?

কুরআনে করীমের উক্ত নির্দেশ অনুসারে এ দায়িত্বটি ‘ফরজে কেফায়া’। সমাজের কেউ না কেউ এ দায়িত্ব পালন না করলে সবাই গুনাহ্গার হবে। ‘যে সমাজের বা জনপদের কেউ এ দাওয়াতী কাজটি করে না, সেখানে বিদ্যমান কোনো বুযুর্গ ব্যক্তির দো‘আও কবুল হয়না’ বলে ইমাম গাযালী রহমাতুল্লাহি আলায়হি মন্তব্য করেন। সুতরাং এটি পুরো মুসলিম মিল্লাতের জিম্মাদারী। তারা বড়ই ভাগ্যবান, যারা এ জিম্মাদারী নিজেদের কাঁধে নিতে পেরেছে।

পীর সৈয়দ মুহাম্মদ সাবির শাহ্ সাহেব ক্বেবলা বলেন, ‘আমরা কতইনা ভাগ্যবান যে, আল্লাহ্ পাক এ মহান কাজের জন্য আমাদেরকে বাছাই (বা পছন্দ) করেছেন। যদি আমরা এ কাজে গাফিলতি করি, অলসতা করি, তবে তা আমাদের জন্য হবে ভয়াবহ্ পরিণামের কারণ।’ তিনি কুরআনে করিমের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন-

وَإِن تَتَوَلَّوْا يَسْتَبْدِلْ قَوْمًا غَيْرَكُمْ ثُمَّ لَا يَكُونُوا أَمْثَالَكُم (سورة محمد   -آية ৩৮)

উচ্চারণঃ ‘ওয়া ইন্ তাতাওয়াল্লাউ ইয়াস্তাব্দিল ক্বাউমান্ গায়রাকুম সুম্মা লা-ইয়াকূ-নূ- আম্সা-লাকুম।’

তরজমা: যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে তিনি তোমাদের ব্যতীত অন্য লোকদেরকে তোমাদের স্থলবর্তী করবেন। অতঃপর তারা তোমাদের মত হবেনা।

[সূরা মুহাম্মদ: আয়াত: ৩৮, কান্যুল ঈমান]

অর্থাৎ অন্য কোন সম্প্রদায়কে দিয়ে দেওয়া হবে এ সৌভাগ্যের মুকুট, যা হবে আমাদের জন্য বড়ই দুর্ভাগ্যজনক। আল্লাহ্, আমাদের তৌফিক দিন, আ-মী-ন।

এ দা’ওয়াত ও মাসায়েল শিক্ষার মজলিস আমাদের সাধারণ মুসলমানদের জন্যও অতীব জরুরি এবং অলংঘনীয় একটি বিষয়। কারণ, আল্লাহ্ পাক প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর উপর জ্ঞানার্জনকে ফরয করে দিয়েছেন। এখন প্রশ্ন হলো- কী পরিমাণ জ্ঞানার্জন ফরয? ফরয, ওয়াজিব, পাক, নাপাক ইত্যাদি অতি প্রয়োজনীয় বিষয়াদি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞানার্জন ‘ফরযে আইন’ আর সব প্রয়োজনীয় বিষয়ে বিস্তারিত জ্ঞানার্জন ‘ফরযে কেফায়া’। যেমন- কামিল মাদরাসায় ভর্তি হয়ে, নিয়মিত পাঠ গ্রহণ করে, কামিল পাশ করা, পূর্ণাঙ্গ আলিম ও হাফেয হওয়া কিংবা কোন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী নেওয়া ইত্যাদি। তদুপরি, মানুষের জীবনে সাফল্য লাভের জন্য ‘তাক্বওয়া’ও অপরিহার্য। যেমন- কুরআনে করিমে এরশাদ হয়েছে-

يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنْتُمْ مُسْلِمُونَ

তরজমা: ‘হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো যেমনিভাবে তাঁকে ভয় করা অপরিহার্য এবং মৃত্যুবরণ করোনা, কিন্তু মুসলমান হয়ে।

[সূরা আল-ই ইমরান: আয়াত – ১০২, কান্যুল ঈমান]

সুতরাং মুসলমান হিসেবে জীবন-যাপন করতে যতটুকু জ্ঞান দরকার অন্তত: ততটুকু জ্ঞান অর্জনের জন্যই ‘দা’ওয়াতে খায়র’ মজলিসের আয়োজন।

আমরা জানাযার নামাযে পড়ি ‘আল্লা-হুম্মা মান আহ্ইয়ায়তাহু মিন্না ফাআহ্য়িহি আলাল ইসলামি ওয়ামান তাওয়াফ্ফাইতাহু মিন্না ফাতাওয়াফ্ফাহু আলাল ঈমান’। অর্থাৎ হে আল্লাহ্, আমাদের মধ্যে যাকে তুমি জীবিত রাখবে তাকে ইসলামের উপর জীবিত রাখো আর যাকে মৃত্যু দান করবে তাকে ঈমানের উপর জীবনের অবসান ঘটাও।

সুতরাং শেষ সময়ের এই দো‘আ ‘জীবন ইসলামের উপর আর মৃত্যু ঈমানের উপর’ নিশ্চিত করার জন্যই। কাজেই এ জন্য যতটুকু জ্ঞান ও তাক্বওয়ার দরকার ততটুকু সহজ ভাষায়, হাতে কলমে শেখানো ও বুঝানোর মজলিসই ‘দা’ওয়াতে খায়র’।

আল্লাহ্ আমাদের জন্য যা ফরয করেছেন- যেমন কলেমা, নামায, রোযা, হজ্ব, যাকাত ইত্যাদি, তা সম্পর্কে যে মৌলিক জ্ঞান থাকা চাই, তা অর্জন করা অপরিহার্য। অথচ, আমরা ক’জন এতোটুকু মাসআলা-মাসা-ইল জানি? সুতরাং যারা জানেনা তাদের জানানোর জন্য যত ধরনের চেষ্টা-তদবির আছে ততটুকু আমাদেরকে অবশ্যই করতে হবে। আর সেটাই হলো ‘দা’ওয়াতে খায়র’, যাকে কোনভাবেই অবহেলা করা যাবেনা।

আমাদের চলমান অন্যান্য দা’ওয়াতি কর্মসূচির সাথে এ নতুন কর্মসূচির পার্থক্য হলো-‘দা’ওয়াতে খায়র’ একেবারে প্রত্যক্ষ দাওয়াত, সরাসরি নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে গিয়ে দাওয়াত দেওয়া। এ জন্য আমাদেরকে দলবদ্ধভাবে হাটে-বাজারে, অলিতে-গলিতে, ব্যবসায়িক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, যেখানে যাকে পাওয়া যাবে সরাসরি তার নিকট গিয়ে দাওয়াত দিতে হবে, যা ওয়াজ-মাহফিল বা অন্য কোন দাওয়াতে সাধারণত পরোক্ষভাবেই করা হয়।

দাওয়াতী কাজে হিক্মত অবলম্বন

এ কাজে হিকমত অবলম্বন আল্লাহরই নির্দেশ। আল্লাহ্ পাক কুরআনে করিমের মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছেন-

اُدْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ ط إِنَّ رَبَّكَ

هُوَ أَعْلَمُ بِمَنْ ضَلَّ عَنْ سَبِيلِهِ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ

উচ্চারণ: ‘উদ্’উ ইলা- সাবী-লি রাব্বিকা বিল্ হিকমতে ওয়াল্ মাউ‘ইযাতিল হাসানাতি ওয়া জা-দিল্হুম বিল্লাতী- হিয়া আহ্সানু; ইন্না রাব্বাকা হুয়া আ’লামু বিমান্ দ্বোয়াল্লা ’আন সাবী-লিহী- ওয়া হুয়া আ’লামু বিল্ মুহ্তাদী-ন।

তরজমা: (আপনি) আপন প্রতিপালকের পথের দিকে আহ্বান করুন পরিপক্ক কলা-কৌশল ও সদুপদেশ দ্বারা এবং তাদের সাথে ওই  পন্থায় তর্ক করুন, যা সর্বাধিক উত্তম হয়। নিশ্চয় আপনার প্রতিপালক ভালভাবে জানেন সৎ পথ প্রাপ্তদেরকে।

[সূরা নাহ্ল: আয়াত-১২৫, তরজমা: কানযুল ঈমান]

তাই, এ কাজে আমাদেরকে সবসময় সচেতন থাকতে হবে, যেন আমাদের আবেগ আমাদের হুঁশ ও বিবেককে অতিক্রম না করে। পরম শ্রদ্ধেয় পীর সাহেব হযরত সাবির শাহ্ (মু.যি.আ.) বলেন- ‘কাজ করার জন্য জোশ থাকতে হয়, কিন্তু কাজের সময় হুঁশ বহাল রাখতে হয়’। সুতরাং জোশ, হুঁশ, হিকমত এবং পরিকল্পিত কৌশল অবলম্বন করেই এ মহান জিম্মাদারী পালন করতে হবে, যেন দাওয়াত কম সময়ে বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে যায় এবং মিশনটি উদারতার দলীল হিসেবে গণ্য হয়। মনে রাখতে হবে, এ মিশন সকল বে-খবর বান্দার ঘুম ভাঙ্গানোর এক মহা আয়োজন। এ জন্য নাফ্সের সাথে যুদ্ধ করতে হবে, যা জিহাদে আকবরই। এ কাজ করবো আমরা কিন্তু উপকৃত হবো সকলে। সমাজে যেসব দ্বন্দ্ব-সংঘাত চলমান রয়েছে, তন্মধ্যে আক্বিদাগত দ্বন্দ্ব অন্যতম। যথাসম্ভব দাওয়াতি কাজ আঞ্জাম দিতে গিয়ে আমরা ইসলামি জীবন-যাপন তথা মাসআলা-মাসা-ইল শিক্ষাকে প্রাধান্য দিয়েই এগিয়ে যাবো।

দাঈ এবং মুয়াল্লিম পরিচয়

মানুষকে দা’ওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে দা‘ঈ ও মু‘আল্লিম-এর ভূমিকা অনিবার্য। দা’ঈ হলেন দাওয়াতদাতা, আহ্বানকারী আর মু‘আল্লিম হলেন তিনি, যিনি তালিম দেন,  শিক্ষা দেন। আমাদের কর্মসূচিতে সকলে দা’ঈ হিসেবে অংশগ্রহণ করতে পারবেন। সকলে মানুষকে কল্যাণের দিকে আহ্বান জানাতে পারবেন। আর তা’লিম দেওয়ার ব্যাপারে এ নিয়মটুকু মেনে চলতে হবে যে, তা’লিম দেবেন দক্ষ আলিম কিংবা জ্ঞান সম্পন্নগণ অথবা তিনি, যিনি তাঁর আলোচ্য বিষয় সম্পর্কে উত্তমরূপে অবগত। অথবা নেসাব কিংবা সংশ্লিষ্ট বিষয়ের কিতাব বা পুস্তক থেকে দেখে দেখে উত্তমরূপে পড়ে শুনাতে সক্ষম। সুতরাং এ কথা আমরা এভাবেও বলতে পারি যে, সকল দা’ঈ মুয়াল্লিম নাও হতে পারেন, তবে সকল মু‘আল্লিম দা’ঈও হবেন। আমাদের রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহ্ পাক দা’ঈ এবং মু‘আল্লিম উভয় উপাধিতেই ভূষিত করেছেন। যেমন এরশাদ হয়েছে-

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِنَّا أَرْسَلْناكَ شَاهِدًا وَمُبَشِّرًا وَنَذِيرًا وَدَاعِيًا إِلَى اللَّهِ بِإِذْنِه وَسِرَاجًا مُّنِيرًا

উচ্চারণ:‘ইয়া— আইয়্যুহান্নাবিয়্যু ইন্না— র্আসালনা-কা শা-হিদাওঁ ওয়া মুবাশ্শিরাওঁ ওয়া নাযী-রাওঁ ওয়া দা-’ইয়ান ইলাল্লা-হি বিইয্নিহী- ওয়া সিরা-জাম মুনী-রা-।’

তরজমা: ৪৫. হে অদৃশ্যের সংবাদদাতা (নবী), নিশ্চয় আমি আপনাকে প্রেরণ করেছি- উপস্থিত-পর্যবেক্ষণকারী (হাযির-নাযির) করে, সুসংবাদদাতা এবং সতর্ককারীরূপে;

৪৬. এবং আল্লাহর প্রতি তাঁর নির্দেশে আহ্বানকারী আর আলোকোজ্জ্বলকারী সূর্যরূপে।

[সূরা আহযাব, আয়াত-৪৫-৪৬, তরজমা: কান্যুল ঈমান]

এখানে দা’ঈ পরিচয়টি পরিস্কার। আর নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন-

وخرج يوماً على أصحابه فوجدهم يقرؤون القرآن ويتعلمون فكان مما قال لهم: وإنما بعثت معلما).  رواه ابن ماجة برقم ২২৯ في حديث عبد الله بن عمرو ،.

وقال صلى الله عليه وسلم: إن الله لم يبعثني معنتاً ولا متعنتاً ولكن بعثني معلماً وميسراً)  رواه مسلم برقم ১৪৭৮ من حديث جابر)

উচ্চারণ: …ইন্নামা বু‘ইস্তু মু‘আল্লিমান। অর্থাৎ নিশ্চয় আমি মু‘আল্লিম (শিক্ষাদাতা) হিসেবে প্রেরিত।

অর্থাৎ হুযূর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম একদিন বাইরে তশরীফ আনলেন। অতঃপর তিনি তাঁদেরকে (সাহাবা-ই কেরাম) পেলেন যে, তাঁরা ক্বোরআন তেলাওয়াত ও শিক্ষা করছেন। অতঃপর তিনি তাঁদের উদ্দেশ্যে যা এরশাদ করেছেন তন্মধ্যে এটাও রয়েছে-  ‘নিশ্চয় আমি মু‘আল্লিম (শিক্ষাদাতা) হিসেবে প্রেরিত হয়েছি।’   [ইবনে মাজাহ্, হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুমা থেকে বর্ণনা করেছেন। হাদিস নম্বর ২২৯]

হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আরো এরশাদ করেন-

উচ্চারণঃ ইন্নাল্লা-হা লাম্ ইয়াব্‘আসনি মু’নিতান্ ওয়া লা- মুতা’আন্নিতান্ ওয়ালা-কিন্ বা’আসানী- মু’আল্লিমান ওয়া মুইয়াস্সিরান।

[মুসলিম, হযরত জাবির রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, হাদীস নং ১৪৭৮]

অর্থাৎ নিশ্চয় আল্লাহ্ তা‘আলা আমাকে কঠোরতা অবলম্বনকারী ও কষ্টদাতা হিসেবে প্রেরণ করেননি বরং আমাকে শিক্ষাদাতা ও সহজকারী হিসেবে প্রেরণ করেছেন।

এখানে ‘মু‘আল্লিম’ আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখা যাচ্ছে। সুতরাং আমরা কতই না ভাগ্যবান যে, অতীব এ সম্মানজনক এবং সমধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও পদবী ধারনের সুযোগ লাভ করছি। মসজিদে ইলম চর্চার মজলিস কায়েম করা অন্যান্য নফল ইবাদতের চেয়ে উত্তম। হুযূর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীস শরীফ থেকে একথা প্রমাণিত হয়। হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুমা থেকে বর্ণিত-

اِنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَىْهِ وَسَلَّمَ مَرَّ بَمَجْلِسِىْنَ فِىْ مَسْجِدِه فَقَالَ كِلاَهُمَا عَلى خَىْرٍ فِى اَحْدَهُمَا اَفْضَلُ مِنْ صَاحِبهِ ـ اَمَّا هؤُلاءِ فَيَدْعُوْنَ اللهَ وَىَرْغَبُوْنَ اِلَىْهِ فَاِنْ شَآءَ اَعْطَاهُمْ وَاِنْ شَآءَ مَنَعَهُمْ  وَاَمَّا هؤُلآءِ فَىُعَلِّمُوْنَ الْفِقْهَ اَوْ الْعِلْمَ وَىُعَلِّمُوْنَ الْجَاهِلَ فَهُمْ اَفْضَلُ وَاِنَّمَا بُعِثْتُ مُعَلِّمًا ثُمَّ جَلَسَ فِيْهِمْ ـ رَوَاهُ الدَّارِمِىُّ

অর্থাৎ রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম স্বীয় মসজিদে দু’টি মজলিসের পাশ দিয়ে তাশরীফ নিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি এরশাদ করলেন, উভয় মজলিসই কল্যাণের উপর আছে। কিন্তু একটি মজলিস অপরটি থেকে উত্তম। এ মজলিসের লোকেরা আল্লাহর কাছে দো‘আ করছে; তারা তাঁরই প্রতি মনোনিবেশকারী। যদি তিনি ইচ্ছা করেন, তবে তাদেরকে দান করবেন। যদি চান দান নাও করতে পারেন। কিন্তু ওই সব লোক, ফিক্বহ্ ও ইল্ম নিজেও শিক্ষা করছে, অজ্ঞদেরকেও শিক্ষা দিচ্ছে। তারাই উত্তম। আমি শিক্ষা দাতা হিসেবে প্রেরিত হয়েছি। অতঃপর তিনি তাঁদেরই মধ্যে বসে পড়েছেন।

         [দারেমী শরীফ, মিরআত শরহে মিশকাত, ২য় খন্ড, বাংলা সংস্করণ: পৃ. ২৩১]

অর্থাৎ মসজিদে নবভী শরীফে সাহাবা-ই কেরামের দু’টি দল তখন দু’প্রান্তে ছিলেন। একপ্রান্তে একদল নফল ইবাদতে রত ছিলেন। অপর প্রান্তে অপর দলে ইল্মে দ্বীনের আলোচনা, পাঠ দান ও পর্যালোচনা করছিলেন। হুযূর করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম উভয় দলের প্রতি কৃপাদৃষ্টি দিলেন। আর ইল্মের মজলিসকে ইবাদতের মজলিস অপেক্ষা উত্তম বলেছেন।

[মিরআত শরহে মিশকাত, ১ম খন্ড: বাংলা সংস্করণ: পৃ. ২৩১]

এ মিশনের কর্মি হবার সুবাদে দা’ঈগণ যথেষ্ট জ্ঞানার্জনে ব্রতী হবেন, যাতে তাঁরাও ‘মু‘আল্লিম’-এর দায়িত্ব পালন করতে পারেন। আবার, মু‘আল্লিম বলে তিনি দা’ঈর কাজ করবেন না, তাও হতে পারেনা। কারণ, দা’ঈ এবং মু‘আল্লিম হওয়া উভয়টি সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং ‘মু‘আল্লিম’ দা‘ঈও, তবে সব দা‘ঈ ‘মু‘আল্লিম’ না হলেও তা’লীমের মজলিস তৈরীতে ভূমিকা রাখতে পারেন। তাই প্রত্যেকে জ্ঞানার্জন করে এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নিয়েই দা‘ঈ ও ‘মু‘আল্লিম’-এর দায়িত্ব পালনে ব্রতী হবেন।

বাকী রইলো দা‘ঈ এবং মু‘আল্লিমের উপযুক্ততা। এ প্রসঙ্গে দু’ধরনের উপযুক্ততা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য- জ্ঞানগত আর তাক্বওয়াগত। ‘দা‘ঈ’ ও ‘মু‘আল্লিম’ উভয়ে মুত্তাক্বী (পরহেযগার বা খোদাভীরু) তো অবশ্যই হবেন। আর ‘মু‘আল্লিম’র জন্য জ্ঞান অনিবার্য। এখানে মসজিদের খতীব ও ইমাম এবং মু‘আয্যিনের যোগ্যতার বিষয়টা প্রণিধানযোগ্য হতে পারে। খতীব ও ইমাম সাহেব জ্ঞানী অবশ্যই হবেন। কারণ দ্বীনী বিষয়াদির জ্ঞান ব্যতীত এ দায়িত্ব পালন করা সম্ভবই নয়। আর কথিত আছে যে, ইমাম হন জ্ঞানী, আর ‘মু‘আয্যিন হন মুত্তাক্বী বা পরহেযগার। এ প্রসঙ্গে নি¤œলিখিত হাদীস শরীফও উপস্থাপন করা যায়-

قال رسول الله-صلى الله عليه وسلم : ليؤذن لكم خياركم وليؤمكم قراؤكم” (أبو داؤد، في كتاب الصلاة، باب من أحق بالإمامة، وابن ماجه ، كتاب الأذان والسنة فيها، باب فضل الأذان وثواب المؤذنين . حديث أبى داؤد رقم (১১৮)وابن ماجه رقم(১৫৪) –

 قال رسول الله صلى الله عليه وسلم يؤم القوم أقرؤهم لكتاب الله فإن كانوا في القراءة سواء فأعلمهم بالسنة فإن كانوا في السنة سواء فأقدمهم هجرة فإن كانوا في الهجرة سواء فأكبرهم سنا ولا يؤم الرجل في سلطانه ولا يجلس على تكرمته في بيته إلا بإذنه ( سنن الترمذي গ্ধ كتاب الصلاة গ্ধ باب ما جاء في فضل الجماعة গ্ধ باب ما جاء من أحق بالإمامة)

অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন- সম্প্রদায়ের ইমাম হবেন যিনি আল্লাহর কিতাব  তেলাওয়াত সম্পর্কে অধিক জ্ঞানী। তাদের মধ্যে সবাই তেলাওয়াতের বিষয়ে সমমানের হলে ওই ব্যক্তি ইমাম হবেন, যিনি সুন্নাহ্ সম্পর্কে অধিক জ্ঞানী। আর সুন্নাহ্ সম্পর্কিত জ্ঞানে সবাই সমান হলে… আল হাদিস। [আবূ দাঊদ, তিরমিযী ও ইবনে মাজাহ্]

যেহেতু মুয়াজ্জিন দা‘ঈর কাজ করেন, আহ্বান করেন তাই তাঁকে হতে হবে পরহেযগার। তবেই তাঁর আহ্বান বেশি ফলপ্রসূ হয়, বিশেষত: গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে বেশি। আর যেহেতু ইমাম বা খতিবের দায়িত্ব হলো মানুষকে তা’লিম দেওয়া, ওয়াজ-নসীহত করা, সেহেতু তিনিও হবেন মুত্তাক্বী এবং যথেষ্ট জ্ঞানবান ব্যক্তি। সুতরাং দা’ঈ হবেন পরহেযগার তথা ইসলামি জীবনাচারে অভ্যস্থ, চৎধপঃরপরহম গঁংষরস আর মু‘আল্লিমরা হবেন অধিকতর মুত্তাক্বী, জ্ঞানী এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। তবে, অবশ্যই মু‘আল্লিমদেরও উচিত হবে দা’ঈগণের সাথে থেকে দ্বীনি দাওয়াতে সরাসরি অংশ নেওয়া। এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষ্যণীয় যে, কেউ যদি দ্বীনি কোন বিষয়ে নির্ভুলভাবে জানেন, তবে তিনিও তা মানুষের সামনে তুলে ধরতে পারবেন, সে বিষয়ে তা’লীম দিতে পারবেন। হাদীস শরীফে হুযূর করীম এরশাদ করেছেন, ‘‘বাল্লিগূ- ‘আন্নী ওয়া লাউ আয়াতান্’’। অর্থাৎ আমার পক্ষ থেকে একটি মাত্র আয়াত (বাক্য) হলেও পৌঁছিয়ে দাও।

দাওয়াতে খায়র কর্মকৌশল

দাওয়াতে খায়র বাস্তবায়নের দায়িত্ব স্থানীয় গাউসিয়া কমিটির উপর। প্রত্যেক কমিটি নিজস্ব সাংগঠনিক এলাকায় কোথায় কোথায় এ প্রোগ্রামটি বাস্তবায়ন করবে সে সব স্থান আগে থেকে কিংবা প্রয়োজনে তাৎক্ষণিকভাবে নির্ধারণ করবে। স্থানটি প্রথমতঃ স্থানীয় মসিজদ হবে। অবশ্য অন্য কোন স্থান, যেমন- কারো বাড়ি, স্কুল, কাবঘর বা উন্মুক্ত কোন জায়গাও হতে পারে। যেখানেই হোক না কেন, স্থানীয় কমিটি ও সংশ্লিষ্ট দাওয়াতে খায়র সম্পাদক এবং যদি দাওয়াতে খায়র বিষয়ক কোন উপকমিটি থাকে তারা পারস্পরিক পরামর্শক্রমে এ বিষয়ে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত, পরিকল্পনা, টিম গঠন, স্থানের অনুমতি গ্রহণসহ সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করবেন। দাওয়াতের কাজে কারা দা’ঈ বা দাওয়াতদাতা হবেন এবং কে কে মু‘আল্লিম বা শিক্ষক হবেন তাও নির্ধারণ করবেন। তারপর তা বাস্তবায়ন করবেন।

যে কোন দিন এ কাজ করা যায়, সেটা বৃহস্পতিবারও হতে পারে, অথবা অন্য যে কোন দিন। সময়টাও স্থানীয় পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে। মাগরিব, এশা বা অন্য যে কোন সময়ও হতে পারে। যদি কোন মসজিদে বৃহস্পতিবার মাগরিব কিংবা এশার নামাযের পর, দিন-ক্ষণ নির্ধারিত থাকে, তবে সে ক্ষেত্রে উক্ত মসজিদে আসরের পর বা অন্য কোন জামাতের পর, বা প্রত্যেক জামাতের পর এমনকি সম্ভব হলে আগের দিন অর্থাৎ বুধবারের জামাতগুলোতেও এ মজলিস সংক্রান্ত দাওয়াত বা প্রচার চালানো যেতে পারে। ওই দিন আসরের নামাযের পর দল বেঁধে পার্শ্ববর্তী এলাকার পথচারী, দোকানদার ও অবস্থানরত মুসলমানদেরকেও ওই মজলিসে অংশ গ্রহণের জন্য দাওয়াত দেবেন।

সম্বোধন রীতি

মসজিদে বা অন্য কোথাও এ দাওয়াতের প্রচারে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে, উদারভাবে এবং সহজ ও সংক্ষিপ্ত কথায় বলতে হবে। যেমন, দা‘ঈদের একজন দাঁড়িয়ে অথবা ইমাম কিংবা মুয়ায্যিন সাহেব প্রথমে, আস্সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু বলবেন, এরপর বলবেন, সম্মানিত মুসল্লি ভাইয়েরা-

আজ মাগরিব/এশার নামাযের পরপর এ মসজিদে শরিয়তের জরুরি কিছু মাসআলা/মাসায়েল ও ফাযায়েল শিক্ষার মজলিসের আয়োজন করা হয়েছে। যোগ্য আলেম-ওলামারা অত্যন্ত সহজভাবে এবং হাতে কলমে প্রয়োজনীয় মাসাআলাগুলো শিখিয়ে দেবেন- একই সাথে কুরআন শরীফের শুদ্ধ তেলাওয়াত ও তরজমা শিখানো হবে, যা আমাদের নামাজসহ যাবতীয় শরিয়তী কাজের জন্য অতীব জরুরি। আর এ জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন। তাই, আপনাদেরকে বিনীতভাবে অনুরোধ জানাচ্ছি মেহেরবাণী করে নামাযের পর কিছু সময় ওই মজলিসে বসবেন- আল্লাহ্, আমাদের সবাইকে কবুল করুন এবং ততক্ষণ পর্যন্ত সুস্থ রাখুন এবং বসার তাওফিক দিন, আমিন। ওয়াস্ সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

অন্যভাবেও বলা যায়, যেমন- মুসল্লিদের সালামের পর বলা যায়, ভাই, আসলে আমরা কি সবাই ওজু-গোসল, নামাজ, তেলাওয়াত ইত্যাদি একদম সহীহ্ভাবে আদায় করতে জানি? নিশ্চয়, সবাই জানিনা। তাই আজ এই জরুরি বিষয়গুলো অত্যন্ত যোগ্য মু‘আল্লিম দিয়ে সহজভাবে এবং হাতে-কলমে শেখানোর জন্য এ মসজিদে বাদ মাগরিব কিংবা এশা সংক্ষিপ্ত মজলিস অনুষ্ঠিত হবে। আপনারা সবাই বসার চেষ্টা করবেন, আপনাদের দাওয়াত দিচ্ছি। আল্লাহ্ আমাদের বসার তাওফিক দিন এবং ততক্ষণ পর্যন্ত সুস্থ রাখুন। আবারো সালাম দেবেন।

এভাবে, খুব সংক্ষিপ্ত আকর্ষণীয় এবং অবিতর্কিত শব্দ ও বাক্য ব্যবহার করে দাওয়াত দিতে হবে। তবে, সম্বোধনে ‘‘সুন্নি ভাইয়েরা, নবী প্রেমিক, ওলী প্রেমিক ভাইয়েরা’’ ইত্যাদির পরিবর্তে অধিকতর ব্যাপক শব্দ, সার্বজনীন সম্বোধন রীতি অনুসরণ করতে হবে। যেমন- প্রিয় ধর্মপ্রাণ মুসলিম ভাইয়েরা! কারণ আমাদের উদ্দেশ্য হলো- সকলকে এ মহৎ কাজে শামিল করা। তাই, মুসল্লি ভাইয়েরা, মু’মিন ভাইয়েরা, মুসলমান ভাইয়েরা ইত্যাদি শব্দ দ্বারা সম্বোধন করে হবে।

দাওয়াতী মহড়া: মসজিদের বাইরে

মসজিদের ভিতরে দাওয়াত দিলেই আমাদের দায়িত্ব শেষ নয়; বরং মসজিদের বাইরে হাট-বাজারে, রাস্তায়, অলি-গলিতে মহল্লায়, বাড়িতেও উক্ত দাওয়াতে খায়র সম্পন্ন করতে হবে এবং প্রয়োজনে প্রত্যক্ষভাবে জনে জনে হাত ধরে এ মজলিসে আসার জন্য অনুরোধ, অনুনয়-বিনয় করতে হবে। এ জন্য দা‘ঈ হিসেবে একদল ভাই বের হয়ে পড়বেন এবং পথে যাকেই পাবেন- সালাম, মোলাক্বাত (সুন্নতি কায়দায় মুসাফাহ্), গলাগলি করবেন এবং কুশলাদি জিজ্ঞেস করবেন- একদম ন¤্র-ভদ্রভাবে, আন্তরিকভাবে, যাতে কোন কৃত্রিমতা বা যান্ত্রিকতা প্রকাশ না পায় আপনার আচরণে। তারপর বলবেন, আজ মাগরিবের পর আমাদের সাথে কিছুক্ষণ সময় দিতে পারবেন কি? বা আমরা কি আপনার মূল্যবান সময়ের কিছুক্ষণ আজ আমাদের সাথে পাবো? এরপর মসজিদে যেভাবে বলা হয়েছে সেভাবে সুনির্দিষ্ট দাওয়াতটি দেবেন এবং হাতে হাত রেখে ওয়াদা নেবার চেষ্টা করবেন। যদি দাওয়াত গ্রহণ করেন তবে আলহামদুলিল্লাহ্ বলে মুখে যতদূর সম্ভব দোয়া ও শুভ কামনা করবেন; আর সেদিন দাওয়াত গ্রহণ না করলে পরবর্তী দাওয়াতের ওয়াদা আগাম দিয়ে দেবেন- বলবেন, তাহলে পরবর্তী মজলিসে অন্তত: আপনাকে পেতে চাই- যদি, হ্যাঁ বলেন, তবে আবারো আলহামদুলিল্লাহ্ ইত্যাদি শুভ কামনা করবেন এবং সে মজলিসের সময়মতো দাওয়াত পৌঁছানোর দায়িত্ব যে কেউ নিয়ে নেবেন এবং তা আদায় করবেন।

এভাবে, জনসাধারণের মধ্যে সরাসরি পৌঁছে যেতে হবে এবং দলবদ্ধভাবে জনে জনে দাওয়াত দিতে হবে। সম্ভব হলে- যারা আপনাদের সাথে এ দা‘ঈ হিসেবে সাথে থেকে অন্যদের দাওয়াত দিতে রাজি হয়, তাদেরকেও সাথে রাখবেন এবং সবাইকে সাথে নিয়ে মসজিদে পৌঁছবেন।

এ বাইরের দাওয়াতটি আসরের পর শুরু করে মাগরিবের আযান পর্যন্ত চলবে এবং সাথে করে সবাইকে নিয়ে মাগরিবের নামাযের জন্য মসজিদে প্রবেশ করবেন।

মসজিদে প্রবেশ করবার পর: দাওয়াতে খায়র

মজলিস যেভাবে শুরু হবে

দা‘ঈ (দাওয়াতদাতা)গণ জামা‘আতে নামায আদায়ের পর দুই রাকাত সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ্ নামায আদায় করেই মুসল্লিদের ধরে রাখার চেষ্টা-তদবির শুরু করতে হবে। সুতরাং যদি মাগরিবের পরের মজলিস হয়, তবে সেদিন সিল্সিলাহর ৬ রাকাত সালাতে আওয়াবীন মওকূফ রেখে তাড়াতাড়ি মুসল্লি বসানোর কাজে লেগে যেতে হবে। কেউ মূল দরজায়, কেউ অন্যান্য সুবিধাজনক স্পটে দাঁড়িয়ে এ কাজটা সম্পন্ন করবেন। মুসল্লিদের বারবার অনুরোধ করে, কেউ সামনের কাতারে দাঁড়িয়ে উক্ত পদ্ধতিতে দাওয়াত দিতে থাকবেন। এভাবে ৪-৫ মিনিট করার পর লোকজন বসে যাবার পরই মজলিস শুরু হবে।

মজলিসের কার্যক্রম

এক বা একাধিক মু‘আল্লিম এ মজলিসে শিক্ষা দিতে পারেন। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে মু‘আল্লিমের পরিচয় দেওয়া যেতে পারে- যদি বিশেষ কোন পরিচয় থাকে; নতুবা সরাসরি মু‘আল্লিম সাহেব দাঁড়িয়ে বক্তব্য শুরু করবেন। সংশ্লিষ্ট মসজিদের ইমামও মু‘আল্লিম হতে পারেন। যদি তিনি আন্তরিক হন বা সম্মতি দেন, তবে, মু‘আল্লিম ছাড়া অন্য কারো পরিচয় দেওয়া যাবেনা। অন্য কারো বিশেষ আসন ব্যবস্থাও থাকবেনা। সংগঠনের সর্বোচ্চ ব্যক্তি উপস্থিত থাকলেও তিনি হবেন একজন সাধারণ মুসল্লি ও শ্রোতা মাত্র। তিনি সর্বসাধারণের সাথে বসবেন; তবে স্থানীয় কোন গণ্যমান্য ব্যক্তি বা মসজিদ কমিটির কর্মকর্তা, ইমাম ও খতিব, যদি মজলিসে বসেন, তবে তাঁদের যোগ্যতা ও পদবী অনুসারে কিছু বলা যেতে পারে, যাতে ভবিষ্যতে তাঁরাও উৎসাহিত ও সহযোগী হন।

মুআল্লিমের ধারাবাহিক শিক্ষা কার্যক্রম

আমাদের দাওয়াতে খায়র কার্যক্রমের আলোচ্য বিষয় হবে ৩টি-

১. কুরআন শরীফ, ২. হাদীস শরীফ এবং ৩. মাসা-ইল ও ফাযা-ইল শিক্ষা।

প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই মু‘আল্লিম সাহেব উপস্থিত মুসল্লিদের মাধ্যমে ব্যবহারিকভাবে বা প্রাকটিক্যালি শেখানোর সর্বাত্মক চেষ্টা চালাবেন। অবশ্যই, আমাদের নির্ধারণ করা কিতাবসমূহ থেকে বলতে হবে এবং অবশ্যই কিতাব দেখে দেখে তেলাওয়াত বা পাঠ করতে হবে- যদিও মু‘আল্লিমের সবকিছু মুখস্থ রয়েছে তবুও। কিতাব-পত্র রাখার জন্য রেয়াল বা উপযুক্ত কোন তাক বা অন্য কিছু রাখবেন। নিচে কতিপয় বিষয়ে আলোকপাত করা হলো-

১. কুরআন শিক্ষা

কুরআন শরীফ শিক্ষার জন্য আ’লা হযরত ইমাম আহমদ রেযা রহমাতুল্লাহি আলায়হির প্রণীত এবং মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল মান্নান কর্তৃক অনুদিত (বাংলা) ‘কান্যুল ঈমান ও খাযাইনুল ইরফান অথবা ‘কান্যুল ঈমান ও নূরুল ইরফান’ অনুসরণ করতে হবে এবং তা দেখে দেখে পড়তে হবে। তবে তেলাওয়াত উপস্থিত মুসল্লিদের থেকে হলে ভালো হয়, যাতে তাঁর উচ্চারণে কোন অশুদ্ধি থাকলে তা সংশোধন করা যায়।

এভাবে কয়েকজনকে দিয়ে একই সূরা বা আয়াত তেলাওয়াত করিয়ে তা শুদ্ধ করানোর ব্যবস্থা করতে হবে- যাতে তেলাওয়াতটা হাতে-কলমে শেখানো হয়ে যায়। সাধারণত: নামাজে যে সকল সূরা একজন সাধারণ মুসল্লি তেলাওয়াত করে থাকে, যেমন, ‘সূরা ফাতিহা’ এবং ‘সূরা ফীল’ থেকে ‘সূরা নাস’ পর্যন্ত সূরাগুলো, একই সাথে সূরা আসর, ‘সূরা দ্বোহা’ এবং ‘সূরা আলাম নাশরাহ্ লাকা’, ‘আয়াতুল কুরসী’, ‘সূরা বাক্বারা’ ও ‘সূরা হাশরের’ শেষের আয়াতগুলো ইত্যাদি একটি দু’টি করে প্রতি মজলিসে আলোচনা করা যেতে পারে। শুরুটা সূরা ফাতেহা দিয়ে হওয়া উচিত। তেলাওয়াতের পর বাংলা তরজমা উক্ত কিতাব দেখে দেখে মু‘আল্লিম নিজে পড়বেন এবং সংক্ষিপ্তভাবে বুঝিয়ে দেবেন। সম্ভব হলে শানে নুযূল, প্রয়োজনীয় টীকা-টিপ্পনি, বিশেষতঃ উল্লেখযোগ্য ফযীলতসহ বর্ণনা করবেন। মুসল্লিরা চাইলে পরবর্তী মজলিসেও একই সূরা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে- যদি এক মজলিসে সমাপ্ত করা না যায়।

২. হাদীস শরীফ শিক্ষা

এ ক্ষেত্রে আমাদের নির্ধারিত গ্রন্থ হলো মেশকাত শরীফের শরহ্ বা ব্যাখ্যা গ্রন্থ মির‘আত শরহে মেশকাত- এ ক্ষেত্রেও মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল মান্নানের বাংলা তরজমাকৃত কিতাবটি অনুসরণ করতে হবে। ‘ইন্নামাল আ’মালু বিন্নিয়্যাতি’- এ প্রথম হাদীসটিসহ বাছাইকৃত হাদীসগুলো থেকে দরস দিতে হবে। এজন্য মু‘আল্লিমকে আগে ভাগে কিতাবটি দেখে নিতে হবে এবং পঠিতব্য হাদিসটি ঠিক করে নিতে হবে। এ ক্ষেত্রেও হাদীসটির সাথে সংশ্লিষ্ট মাসা-ইল-ফাযা-ইল, প্রয়োজনীয় আমল-আক্বিদাগুলো সংক্ষেপে এবং অত্যন্ত সহজভাবে বুঝানোর চেষ্টা করতে হবে। হাদীস শরীফের জন্য মাওলানা মুহাম্মদ বখতিয়ার উদ্দিন সংকলিত এবং আনুজমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া প্রকাশিত ‘দরসে হাদীস’ গ্রন্থটিও অনুসরণ করা যেতে পারে।

৩. মাসা-ইল শিক্ষা (ফিক্বহ্)

আমাদের আনজুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট থেকে প্রকাশিত ‘গাউসিয়া তারবিয়াতি নেসাব’ নামক অত্যন্ত সমৃদ্ধ কিতাবটি থেকে দেখে দেখে মাসাইলগুলো বর্ণনা করবেন এবং হাতে কলমে শিক্ষা দেবেন। এক্ষেত্রে, ওজু-গোসল ও নামাজ বিষয়ে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে এবং এক একজন উপস্থিত ভাইকে দাঁড় করিয়ে নিয়ম পদ্ধতিগুলো শেখাতে হবে। যেমন, একজনকে বলতে হবে ওজু করতে, অন্য জনকে বলতে হবে- তাঁর ওজু ঠিক মতো হলো কিনা দেখতে, গলদ থাকলে কী গলদ হলো এবং শুদ্ধটা কীভাবে হবে ইত্যাদি আলোচনা করতে হবে। বিশেষতঃ মু‘আল্লিম নিজে ওজু করে দেখাবেন, নামাযের নিয়ম-পদ্ধতিও তিনি দেখাবেন, যাতে সহজে অন্যরা শিখে নিতে পারেন। তবে, কাউকে এমনভাবে প্রশ্ন করা যাবেনা বা হাতে কলমে দেখাতে বলা যাবে না- যাতে তিনি লজ্জা পান। এজন্য যতটুকু বলে তাকে সন্তুষ্টির সাথে কাজে লাগানো যায়- ততটুকু চেষ্টা করেই শেখাতে হবে। শেখানোর পদ্ধতি সহজ, আকর্ষণীয় এবং আনন্দদায়ক হলে মুসল্লিরাই পরবর্তী মজলিসের আয়োজনের প্রস্তাব করবেন এবং তা হবে এ কাজের প্রথম সফলতা।

অন্যান্য কার্যক্রম

ক. প্রশ্নোত্তর

মু‘আল্লিম নিজ থেকে প্রশ্ন আহ্বান না করাই ভাল। কারণ, এতে অন্য কোন কুচক্রি ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ দূরভিসন্ধিমূলক প্রশ্ন করে বিব্রত করার বা বিভ্রান্তি ছড়ানোর সুযোগ নিতে পারে। হ্যাঁ, যদি কেউ প্রশ্ন করে বসে, আর তা যদি ওই দিনের বিষয়ের সাথে প্রাসঙ্গিক হয়, তাহলে মু‘আল্লিমকে আমলে নিতে হবে এবং বিশুদ্ধ উত্তরটি জানানোর ব্যবস্থা করতে হবে। শুদ্ধ উত্তরটি নিশ্চিতভাবে জানা থাকলেই তৎক্ষণাৎ উত্তর দেবেন, অন্যথায় বলতে হবে- ‘বিশুদ্ধ উত্তরটি আমি আগামি মজলিসে বলবো।’ এতে গ্রহণযোগ্যতাও বাড়বে এবং পরবর্তী মজলিসের চাহিদাও সৃষ্টি হবে, আর শরিয়তের জিম্মাদারীও সঠিকভাবে পালিত হবে। অবশ্য, অনেকগুলো প্রশ্নের উত্তর অবশ্যই, ‘তারবিয়াতি নেসাব’ কিতাবটিতে রয়েছে বিধায় তাৎক্ষণিকভাবে দেওয়া সম্ভব, যদি মু‘আল্লিম কিতাবটি ভালো করে পড়ে থাকেন। আক্বিদাগত প্রশ্ন উত্থাপিত হলে পরিস্থিতি বুঝে, প্রাসঙ্গিক হলে, সচেতনতার সাথে গ্রহণযোগ্য দলিল দিয়েই উত্তর দিতে হবে, নতুবা সময় চেয়ে নিতে হবে।

খ. দোয়া-মুনাজাত

অনুষ্ঠানের শুরুতে ক্বোরআন তেলাওয়াত ও না’ত শরীফ এবং শেষে মীলাদ শরীফ, ক্বিয়াম, তারপর দোয়া-মুনাজাত ইত্যাদি আমাদের প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্য বটে। তবে এ মজলিসটির বৈশিষ্ট্যকে আমরা কিছুটা পৃথক রাখতে চাই। আর এজন্য, আমরা শুরুতে আলাদাভাবে তেলাওয়াত না করে, মজলিসে কুরআনের যে আয়াত তাফসীর বা ব্যাখ্যার জন্য তেলাওয়াত করা হবে সেটাই আমাদের তেলাওয়াত। তেলাওয়াত ও তরজমা দুটোই হয়ে যাচ্ছে বিধায় আলাদা তেলাওয়াত থাকবে না।

এখানে পৃথক হামদ ও না’ত পড়ার সুযোগ হবেনা বিধায় দুরূদ শরীফ ও সংক্ষিপ্ত মুনাজাতের মাধ্যমে মাহফিল সমাপ্ত করা হবে। কারণ, আমাদের অনেক খাস মজলিস আছে, যেখানে আমরা নিয়মিত মিলাদ শরীফ, কেয়াম ও না’ত শরীফ ইত্যাদি পড়ছি। এখানে কোনো তার্বারুকের আয়োজনও করা হবেনা। এ মজলিস শেষ করার আগেই পরবর্তী মজলিসের তারিখ জানানোর ব্যবস্থা করবেন।

সময় বন্টন

আপনাকে সময়ানুবর্তিতা মেনে চলতে হবে। নির্ধারিত সময়ে শুরু এবং নির্ধারিত সময়েই শেষ করতে হবে। অন্যথায় পরবর্তী মজলিসগুলো থেকে লোকজনের আগ্রহ কমতে শুরু করবে। ফলে ধীরে ধীরে আমাদের মহৎ উদ্যোগটি, খোদা না করুন, ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে। এ জন্য আপনার ঘোষিত সময়ের মধ্যেই মজলিস শেষ করতে হবে, যদি আলোচনা শেষ না হয়, তবে পরবর্তী মজলিসের জন্য রেখে দিতে হবে এবং বলতে হবে যে, আমরা নির্ধারিত সময়েই শেষ করবো, তাই অবশিষ্ট আলোচনা ইনশা-আল্লাহ্, আগামি মজলিসে করা হবে।

এতে পরবর্তী মজলিসের আগ্রহটা থেকে যাবে। এখন আপনাকে যে সময় বন্টন করতে হবে তা নিম্নরূপঃ (যদি মজলিসের সময় হয় ১ ঘন্টা বা ৬০ মিনিট)

কুরআনের শিক্ষা হবে ২০ মিনিট

হাদিসের দরস হবে     ১৫ মিনিট

মাসায়েল শিক্ষা হবে ২০ মিনিট

প্রশ্নোত্তর, দোয়া-মুনাজাত ০৫ মিনিট  (সর্বমোট ৬০ মিনিট)।

যদি কোন প্রশ্ন না থাকে তবে মুনাজাতে দেরী না করে, প্রয়োজনে ৫ মিনিট আগে মজলিস শেষ করবেন; আর যদি প্রশ্ন থাকে, তবে এ ৫ মিনিটে প্রশ্নোত্তর ও মুনাজাত করে মজলিস সমাপ্ত করবেন। যদি মোট সময় ৩০ মিনিট বা ৪০ মিনিট হয় তখন সে অনুপাতে বিষয় ভিত্তিক সময় বন্টন করে নিতে হবে। কুরআন ও মাসায়েল শিক্ষা যেহেতু প্রাকটিক্যাল, সেহেতু প্রয়োজনে এ দু’টিতে বেশি সময় নিয়ে অন্যান্য বিষয় থেকে সময় কমিয়ে নিতে হবে। নামাযের নির্দ্ধারিত জামা‘আতসমূহে যেন আমাদের কারণে বিঘœ না ঘটে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

সতর্কতা

         যে সব মসজিদ, প্রতিষ্ঠান কিংবা স্থানে অনুমতি নেওয়া দরকার সেখানে বিনা অনুমতিতে মজলিস না করা।

         বিনা অনুমতিতে মসজিদ বা প্রতিষ্ঠানের মাইক বা অন্যান্য সরঞ্জাম ব্যবহার না করা।

         আক্বিদাগত বিতর্কিত বিষয়ের অবতারণা না করা। কেউ প্রশ্ন উঠালে তবেই সতর্কতার সাথে এবং অত্যন্ত সুন্দর ভাষা ও গ্রহণযোগ্য

           দলিল দিয়ে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করা।

         উত্তর জানা না থাকলে যে কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে সময় চেয়ে নেওয়া এবং অবশ্যই পরবর্তী মজলিসে তা দেওয়ার ব্যবস্থা করা।

         আক্বিদার পরিবর্তে আমলের বিষয়কে নির্ধারণ করে বক্তব্য রাখা। কারণ, আক্বিদাগত বিষয় আমাদের অন্যান্য মাহফিলে হরদম

            আলোচিত হচ্ছে। এ মজলিস মাসায়েল-ফাযায়েল শিক্ষার জন্য মাত্র।

         গরম মেজাজে, উগ্রভাবে কিংবা জজবার সাথে বক্তব্য রাখার পরিবর্তে ন¤্রভাবে, আস্তে আস্তে, যুক্তি সহকারে এবং হাতে-কলমে

            শেখানোর কাজ করতে হবে।

         কোনো ফাসিক্ব, বাতিল ফিরকা কিংবা বা ব্যক্তির নাম না নিয়ে শুধু তাদের আক্বীদা কিংবা মন্দ আমলের কথাটা উল্লেখ করে অতি শালীনভাবে সেগুলোর খন্ডন কিংবা শরীয়ত ও আকাইদের ইমামদের সঠিক সিদ্ধান্তটা তুলে ধরতে হবে। যদি অন্য কেউ এমন কারো নাম উত্থাপন করে বসে, তখন অবস্থা বুঝে, সতর্কতার সাথে উত্তর দিতে হবে।

         মু‘আল্লিমদের বক্তব্য এবং দা‘ঈগণের আহ্বান অবশ্যই হাসিমুখে এবং আন্তরিকতাপূর্ণ হতে হবে।

         পরবর্তী মজলিসের তারিখ সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তরা আগে ভাগে ঠিক করে নিতে হবে এবং ঘোষণা করতে হবে।

         মজলিস শেষে, এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন (জবঢ়ড়ৎঃ) আমাদের সরবরাহ্কৃত ফরম পূরণ করে সংশ্লিষ্ট সাংগঠনিক শাখা ও

            কেন্দ্রিয় দফতরে জমা করতে হবে।

         মজলিসের ত্রুটি-বিচ্যুতি ধরা পড়লে, মুসল্লিদের পরামর্শ-প্রতিক্রিয়া থাকলে তা শীঘ্রই লিখিত আকারে সংশ্লিষ্ট সাংগঠনিক দফতরে জানাতে হবে

            এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

         যারা আপনাদের মজলিসে উপস্থিত হচ্ছে তাদের সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্ক বৃদ্ধি করা এবং দা’ঈ হিসেবে তাদেরকে দলভুক্ত করার চেষ্টা চালাতে হবে।

সাংগঠনিক দায়িত্ব

‘দা’ওয়াতে খায়র’ আয়োজন করার জিম্মাদারী সংশ্লিষ্ট এলাকার ‘গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ’র ইউনিট-ওয়ার্ড-ইউনিয়ন বা থানা কমিটির উপর। প্রত্যেকটি কমিটির ‘দা’ওয়াতে খায়র সম্পাদক’ এ দফতরের মূল এবং নির্দিষ্ট জিম্মাদার। একজন সাংগঠনিক সম্পাদকের কাজের মতই দাওয়াতে খায়র সম্পাদক নিজ এলাকার দাওয়াতি তৎপরতা বৃদ্ধির পাশাপাশি অব্যবহিত নি¤œতর কমিটির সম্পাদকের সাথে কিংবা কমিটির সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে নি¤œতর কমিটির দাওয়াতী কার্যক্রম তদারক করবেন এবং প্রয়োজনীয় দিক-নিদের্শনা দেবেন। তিনি নিজে দাওয়াতে খায়র বিষয়ক প্রশিক্ষণ নেবেন এবং সে অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। তিনি নিজেই দা‘ঈ (আহ্বানকারী/দাওয়াতদাতা) হবেন এবং যোগ্যতা সাপেক্ষে মু‘আল্লিম (শিক্ষক) হিসেবেও কাজ করবেন। তবে, প্রত্যেক সাংগঠনিক দফতরে, একজন দাওয়াতে খায়র সম্পাদকের তত্ত্বাবধানে একটি সমৃদ্ধ দাওয়াত বিভাগ চালু থাকবে। এ বিভাগে যাঁরা কাজ করবেন- তাঁদের সবাইকে নিয়ে একটি আলাদা ‘দাওয়াতী সেল’ বা ‘দাওয়াত উপ-কমিটি’ গঠন করা যেতে পারে। এ কমিটির প্রধান থাকবেন সম্পাদক নিজেই। কমিটির সদস্য সংখ্যা বেশি হলে মূল কমিটির পরামর্শক্রমে একজনকে সদস্য সচিবও করা যেতে পারে। বাকিরা থাকবেন সদস্য। প্রত্যেক দাওয়াতে খায়র সম্পাদকের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এ দাওয়াত বিভাগের দু’টি দাওয়াতী উপাধি বা পদবী থাকবেঃ

ক. মু‘আল্লিম: যারা দাওয়াতী মজলিসে কুরআন, হাদিস, ফেক্বাহ (মাস‘আলা- মাসায়েল) শিক্ষা দেবেন।

খ. দা‘ঈ : যাঁরা দাওয়াতী মজলিসের খবর প্রচার করবেন, মজজিদে-অলিতে-

গলিতে, বাজারে ও প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে বের হয়ে মানুষকে সরাসরি এ দাওয়াত দেবেন এবং মজলিসে নিয়ে আসবেন।

উক্ত দুই শ্রেণীর ভাগ্যবান ব্যক্তিরাই আমাদের এ মহান দ্বীনি কাজের প্রাণ। সুতরাং প্রত্যেক সাংগঠনিক দফতর স্ব স্ব অফিসে একটি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মু‘আল্লিমের তালিকা এবং অপর একটি দা‘ঈর দলভুক্তদের তালিকা সংরক্ষণ করবে। উভয় তালিকা প্রয়োজনের তাগিদে দীর্ঘ হতে থাকবে। ফলে দাওয়াতী কর্মকান্ড ও ব্যাপকতা লাভ করবে।

এ দুই শ্রেণীর তালিকাভুক্তদের সদস্য নিয়েই ‘দাওয়াতী সেল’ গঠিত হবে। পর্যায়ক্রমে তৎপর এবং সম্ভাবনাময় দা‘ঈদের মধ্য থেকে আগ্রহীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে মু‘আল্লিম বানাতে হবে।

মু‘আল্লিম মাদরাসা শিক্ষিত হলে ভালো হয়। তাছাড়া, এ ক্ষেত্রে সাধারণ শিক্ষিত, আগ্রহী এবং শরিয়তী জীবন-যাপনে অভ্যস্থদেরও এ কাজের দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। তবে, পর্যায়ক্রমে সব দা‘ঈকে মু‘আল্লিম বানানোর টার্গেট নিয়েই কাজ করতে হবে- যদিও তারা সাধারণ শিক্ষিত হয়ে থাকেন। তবে, অশিক্ষিত কাউকে মু‘আল্লিম বানানো সম্ভব নয়। অবশ্য দা‘ঈ হিসেবে সর্বস্তরের মুসলমান কাজ করতে পারবেন।

দাওয়াতে খায়র সম্পাদকের এতবেশি জিম্মাদারী যে, এ পদটির মর্যাদা সাংগঠনিক সম্পাদকের সমান বা বেশি ধরে নিতে হবে; যা সময় মত ‘গঠনতন্ত্র’ সংশোধনের মাধ্যমে জানানো হবে। সুতরাং দাওয়াতে খায়র সম্পাদককে তার তৎপরতা বৃদ্ধি করে তাঁর সহযোগি দা‘ঈ এবং মু‘আল্লিমের তালিকা দীর্ঘ করতে হবে। সে তালিকা অনুসারেই নির্ধারিত স্থান ও সময়ে যথাযথভাবে দাওয়াতী কাজের আয়োজন করতে হবে। আয়োজন শেষে প্রতিবেদন তৈরী করতে হবে এবং মজলিস থেকে কোনো পরামর্শ বা অভিযোগ পাওয়া গেলে তা যথাক্রমে বাস্তবায়ন কিংবা সমাধানের মাধ্যমে পরবর্তী মজলিসকে আরো সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য করার ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট দাওয়াতী কমিটি গাউসিয়া কমিটি থেকে মূল সাহায্য নিতে পারবে।

সংশ্লিষ্ট গাউসিয়া কমিটি, মূল নির্বাহি কমিটি এবং এর দাওয়াতে খায়র বিষয়ক সেল বা বিভাগের কর্তব্য হলো-

         মজলিসের সম্ভাব্য স্থানসমূহ, তারিখ এবং মু‘আল্লিম ঠিক করা, আলোচ্য বিষয় (মু‘আল্লিমের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে) নির্ধারণ করা,

            বিষয় সংশ্লিষ্ট অধ্যায় মু‘আল্লিমকে আগাম পড়ে নেবার জন্য তাগিদ দেওয়া।

         সংশ্লিষ্ট স্থানের অনুমতি গ্রহণ করা, সম্ভাব্য ক্ষেত্রে লিখিত এবং স্থায়ী অনুমতি নিয়ে নেয়ার চেষ্টা করা। অনুমতি পত্রের কপি সাথে রাখা

          এবং অফিসে সংরক্ষণ করা।

         দা‘ঈদের কর্তব্য নিশ্চিত করা, সহজ পদ্ধতি বুঝিয়ে দেওয়া এবং দাওয়াতী কাজে প্রেরণ করে- তা ঠিকমত আদায় করছে কিনা- ফলোআপ করা।

         দা‘ঈগণ হবেন সংগঠনের মূল কমিটিভুক্ত। এ কাজে আগ্রহী অন্যান্য ভাই এবং মুসল্লিরা, বিশেষতঃ মজলিসে বসতে বসতে আগ্রহী হয়ে ওঠা

           নতুন কোন মুসল্লিকেও এ দলে অন্তর্ভুক্ত করে, তার নাম দা‘ঈদের তালিকাভুক্ত করে কাজে লাগানো এবং তাঁদের নাম অফিস-তালিকায় সংরক্ষণ করা।

         এ কাজের সম্ভাব্য খরচ খুব অল্প। এরপরও তা যোগান দেবে সংশ্লিষ্ট সাংগঠনিক (মূল) কমিটি এবং দাওয়াতী বিভাগ। এ জন্য স্থানীয় ব্যক্তিদের

            সাহায্য নেওয়া জরুরি। বিশেষতঃ দা‘ঈদের মধ্য থেকেও এ খরচ যোগানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে- এতে তাদের আগ্রহ এবং অবদান

           বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্টতাও বৃদ্ধি পাবে।

         মু‘আল্লিমকে কিছু হাদিয়া দেওয়ার ব্যবস্থা করা। সম্ভব হলে উক্ত মসজিদের জন্যও কিছু চাঁদা দেওয়া। সম্ভব হলে কখনো কখনো উক্ত মসজিদের

           ইমাম মু‘আজ্জিনকেও কিছু হাদিয়া দেওয়া।

         যাঁরা দা‘ঈ হিসেবে যতবেশি সক্রিয় হবেন- তাদেরকে ততবেশি সংশ্লিষ্ট কমিটির সাংগঠনিক দায়িত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

             তবেই সংগঠনের জন্য পরীক্ষিত কর্মকর্তা পাওয়া যাবে এবং দাওয়াতী কাজও দ্রুত সফলতার দিকে এগিয়ে যাবে।

         দাওয়াতী মজলিসে (বৈঠক) উপস্থিতি নিশ্চিত করতে সর্বপ্রথম সাংগঠনিক কমিটিভুক্তগণ, যেমন সভাপতি থেকে শুরু করে অন্যান্য পদবীধারী সম্পাদক সদস্য নির্বিশেষে সকলকে উপস্থিত রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। এ ছাড়া দা‘ঈদের তালিকাভুক্তগণ তো অবশ্যই থাকবেন। স্থানীয় পীরভাইদের এতে শামিল করারও ব্যবস্থা করতে হবে। ট্রেনিংপ্রাপ্ত মু‘আল্লিম ছাড়া যে কেউ শিক্ষকের দায়িত্ব যেন পালন না করে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। যদি কোন উপায় না থাকে, তখন নতুন মু‘আল্লিমকে আমাদের নিয়ম কানুন, কৌশল ও সতর্কতা বিষেয় সংক্ষিপ্ত ধারণা দেওয়ার পরই নিযুক্ত করতে হবে।

         মু‘আল্লিম ট্রেনিংপ্রাপ্তগণকে মনিটরিং করে কাজে লাগানোর দায়িত্ব সাংগঠনিক কমিটির এবং সংশ্লিষ্ট সম্পাদকের। এমনকি নতুন নতুন মু‘আল্লিম তৈরীর জন্য আগ্রহীদের ট্রেনিং সেন্টারে পাঠানোর দায়িত্বও তাদেরকে পালন করতে হবে। তবে, অবশ্যই তাকেই ট্রেনিং-এর জন্য মনোনীত করতে হবে- যিনি মাঠে-ময়দানে এ জিম্মাদারী পালনের অঙ্গীকার করবেন এবং সে অনুযায়ী কাজ করবেন।

         দাওয়াতী মজলিস শেষে রিপোর্ট গ্রহণ করতে হবে এবং তা অব্যবহিত ঊর্ধ্বতন কমিটির দাওয়াতে খায়র সম্পাদক বরাবরে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। তিনি প্রত্যেক মাস ব্যাপী রিপোর্টগুলো সংগ্রহ করে সেগুলোর একেক কপি গাউসিয়া কমিটির কেন্দ্রিয় মহাসচিবের বরাবরে প্রেরণ করবেন।

মনিটরিং ও ফলোআপ

দাওয়াতে খায়র’র অন্তর্ভুক্ত কাজগুলো জানাটাই শেষ কথা নয়। আসল কাজ হলো- এ কাজটি নিয়মিত হচ্ছে কিনা এবং ঠিক যেভাবে হবার কথা ঠিক সেভাবে হচ্ছে কিনা তদারক করা। এই তদারকি বা মনিটরিং না থাকলে শুধু জ্ঞানার্জন হবে বা প্রশিক্ষণ হবে; কিন্তু বাস্তবের মুখ দেখবেনা ‘দাওয়াতে খায়র’। তাই, সংগঠনের প্রত্যেকটি স্তরে এক একটি মনিটরিং সেল বা ফলোআপ টিম থাকবে- যারা সার্বক্ষণিক তদারকিতে  সক্রিয় থাকবেন। তাদের কাজ আওতাধীন দায়িত্বশীলদের বারবার ফোন করে উক্ত কাজের জন্য চাপ সৃষ্টি করা, যেখানে যেখানে মজলিস বসেছে সে সংক্রান্ত প্রতিবেদন সংগ্রহ করা এবং পরবর্তী মজলিস কখন-কোথায় হচ্ছে সে ব্যাপারে পরিকল্পনা-পদক্ষেপ সম্পর্কে জানার চেষ্টা করা এবং প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা দেওয়া। এ জন্য কেন্দ্র থেকে শুরু করে ইউনিট স্তর পর্যন্ত করে একটি দাওয়াতে খায়র বিষয়ক মনিটরিং সেল থাকবে। এ সেলের সদস্যদের কাজ হবে এ কার্যক্রমকে নিয়মিত করণের প্রয়োজনে সর্বাত্মক প্রয়াস চালানো এবং তদারকি অব্যাহত রাখা। বিভাগীয় সম্পাদক অর্থাৎ দাওয়াতে খায়র সম্পদককে প্রধান করে এ সেলটি গঠিত হবে। ইউনিট স্তরে এ সেল বা দাওয়াত বিভাগের কাজ সম্পর্কে ইতোপূর্বে মোটামুটি আলোচিত হয়েছে। দাওয়াতে খায়র সম্পাদকের নেতৃত্বে এ বিভাগে কর্মরত মু‘আল্লিম ও দা‘ঈদের নিয়ে এ বিভাগ পরিচালিত হবে। এরা হয়ে যাওয়া মজলিসগুলোর প্রতিবেদন, পরামর্শ ও সেখানে উত্থাপিত প্রশ্নাবলীর আলোকে পরবর্তী মজলিসকে আরো সুন্দরভাবে সম্পন্ন করতে পরিকল্পনা গ্রহণ করবেন। নতুন নতুন দা‘ঈ সদস্য সংগ্রহ করবেন এবং প্রশিক্ষণ দিয়ে মু‘আল্লিম তৈরী করবে আর এ উভয় শ্রেণীর দাওয়াতী কর্মীদের সর্বোচ্চ কাজে লাগানোর চেষ্টা করবে। প্রতিমাসে কমপক্ষে একবার সাধারণ সভায় মিলিত হয়ে বিগত মাসের কার্যক্রম পর্যালোচনা করবে এবং পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করবেন। দায়িত্ব বন্টন করে দেবেন এবং তা তদারকির মাধ্যমে আদায় হচ্ছে কিনা তার নজরদারী করবেন। এভাবে তাদের কাজ চলতে থাকবে। তাঁদের অব্যবহিত উপরের কমিটি অর্থাৎ ইউনিয়ন, ওয়ার্ড, থানা-উপজেলা, জেলা কমিটিতে বিদ্যমান অনুরূপ দাওয়াত বিভাগ বা দাওয়াতে খায়র সেলগুলোর কাজ হলো-

প্রথমতঃ অব্যবহিত নি¤œতর কমিটির দাওয়াত বিভাগের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা, তাদের কাজের অগ্রগতি পর্যালোচনা, তদারকি, তাদের প্রতি বারবার কাজের জন্য তাগিদ দেওয়া, চাপ দেওয়া, রিপোর্ট সংগ্রহ করা, প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা দেওয়া এবং কোন সমস্যা বা প্রশ্নের উদ্ভব হলে তা দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করা।

দ্বিতীয়তঃ প্রতিটি উপরস্থ কমিটির অনুরূপ মনিটরিং ছাড়াও নিজেদের অফিসেও একটি দা‘ঈ এবং একটি মু‘আল্লিম তালিকা থাকা চাই, যাতে নিচের কমিটিকে তদারকির পাশাপাশি নিজেরাও ঝঃধহফনু এ তালিকার সদস্যদের নিয়ে তাৎক্ষণিক কোনো দাওয়াতে বের হয়ে যেতে পারেন। অর্থাৎ উপজেলা-জেলা-কেন্দ্র প্রত্যেক স্তরেই দা‘ঈ এবং মুয়াল্লিমদের একটি সংগ্রহ রাখা এবং ‘দাওয়াতে খায়র’-এর কাজে এক একটি দলকে বের করা। তাদের তালিকা থেকে প্রয়োজনে দা‘ঈ এবং মু‘আল্লিম নি¤œস্তরের দাওয়াতী কাজেও প্রেরণ করে সাহায্য করা যাবে। কোথাও একাধিক দাওয়াতী মজলিস চলার কারণে মুয়াল্লিম বা দা‘ঈ সংকট দেখা দিলে- সেক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন কমিটির জবংবৎাব খরংঃবফ দের মধ্য থেকে মু‘আল্লিম বা দা‘ঈ প্রেরণ করে তাদের সংকট সমাধান করা হবে।

কেন্দ্রিয় দাওয়াত বিভাগ

কেন্দ্রিয় কমিটির দাওয়াত বিভাগের দায়িত্বও মূলতঃ বর্ণিত অন্যান্য দাওয়াত কমিটির কাজের মতো। অর্থাৎ তাদের মূল কাজ হলোঃ

ক. ১. অব্যবহিত অধঃস্তন কমিটিগুলোকে চাপে রেখে কাজ আদায়ের নিরন্তর প্রয়াস  চালানো।

২. তাদের কাজের অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং প্রতিবেদন গ্রহণ।

৩. প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান, নতুন নতুন দিক-নির্দেশনা জানানো।

খ.   তাদের একটি নিজস্ব দা‘ঈ এবং মু‘আল্লিম তালিকা থাকবে, যারা ‘রিজার্ভ ফোর্স’-এর ন্যায় কাজ করবে। তাৎক্ষণিকভাবে দাওয়াতী কাফেলা বের করবে এবং অধঃস্তন কমিটিতে সংকটকালে দা‘ঈ এবং মুয়াল্লিম সরবরাহ্ করবে।

গ.   দাওয়াতে খায়র বিষয়ে গবেষণা, পরিকল্পনা এবং নিত্য-নতুন দিক-নির্দেশনা দেওয়া এই সেলের প্রধান কাজ। এ জন্য কেন্দ্রীয়ভাবেই একটি গবেষণা সেল জবংবৎপয ঈবষষ বা ঞযরহশ ঞধহশ থাকবে। যাদের কাজই হবে এ মিশনটিকে তাদের গবেষণা, পরিকল্পনা দিয়ে সমৃদ্ধ করা। তাঁরা তাঁদের গবেষণানুসারে গৃহীত পরিকল্পনা প্রণয়ন করে কেন্দ্রিয় কমিটিতে প্রেরণ করবেন এবং কেন্দ্রিয় কমিটি তা আনজুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট’র সম্মতিক্রমে বাস্তবায়নের পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। কেন্দ্রিয় মূল কমিটি কর্তৃক গৃহীত উক্ত পরিকল্পনা সিদ্ধান্ত হিসেবে গৃহীত হয়ে দাওয়াত বিভাগের মাধ্যমে তা বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

ঘ.   কেন্দ্রিয় দাওয়াত বিভাগই মু‘আল্লিম ও দা‘ঈদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের আয়োজন করবে। আর সে প্রশিক্ষণের আলোকে মাঠে-ময়দানে মসজিদে সে দাওয়াতী মজলিস বাস্তবায়ন হবে। ঞযরহশ ঞধহশ-এর পরিকল্পনা অনুসারে প্রয়োজনে প্রশিক্ষণের ধরন, বিষয় এবং দাওয়াতী কর্মপদ্ধতিতে পরিবর্তন বা বৈচিত্র্য আসতে পারে- যা এ দাওয়াতী কাজকে সময়ের দাবী অনুসারে সাজানো যাবে। অবশ্য, জেলা-থানা পর্যায়েও মান সম্পন্ন প্রশিক্ষণের আয়োজন সম্ভব হলে- তা ঊর্ধ্বতন কমিটির অনুমতি ও পরামর্শ সাপেক্ষে করা যেতে পারে।

ঙ.  কেন্দ্রিয় দাওয়াত বিভাগ তাদের সংরক্ষিত দা‘ঈ ও মু‘আল্লিম দিয়ে বাইরের দাওয়াতী কাজে বের হওয়া, অন্যদের দাওয়াতী কাজে প্রয়োজনীয় সংখ্যক দা‘ঈ ও মু‘আল্লিম প্রেরণ করা ছাড়াও নিজস্ব একটি মারকাজ স্থাপন করবে। যেখানে প্রতিদিন দাওয়াতে খায়র এর মজলিস চলতে থাকবে। চট্টগ্রাম ষোলশহরস্থ আলমগীর খানকাহ্ শরীফকে ‘দাওয়াতে খায়র’র কেন্দ্রিয় মারকাজ বানিয়ে এ কার্যক্রম নিয়মিত চালু রাখতে হবে।

চ.  কেন্দ্রিয় মূল সাংগঠনিক কমিটির তত্ত্বাবধানে এ দাওয়াত বিভাগকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার সুবিধার্থে একটি পৃথক এবং ‘পূর্ণাঙ্গ দাওয়াতে খায়র দফতর’ থাকবে। যেহেতু, গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশের অন্য কোন দফতরে দাওয়াতে খায়র এর মতো এতোবেশি কার্যক্রম নেই এবং এতো বেশি কর্মিবাহিনী জড়িত নয়, সেহেতু এজন্য একটি পৃথক অফিস থাকা যুক্তিযুক্ত। সম্ভব হলে অব্যবহিত অধঃস্তন কমিটিতে বিশেষতঃ জেলা সদরগুলোতে এক একটি পৃথক ‘দাওয়াতে খায়র দপ্তর’ খোলা যেতে পারে। ট্রেনিং, মনিটরিং, ফলোআপ, দাওয়াতী দল বের করা থেকে শুরু করে এ সংক্রান্ত যাবতীয় অফিশিয়াল কাজ এখানে সম্পন্ন করা হবে। তবে, অবশ্যই এ দফতর হবে মূল সাংগঠনিক কমিটির নিয়ন্ত্রণাধীন। কখনো পরিপূর্ণ স্বাধীন নয়। মূল সাংগঠনিক দপ্তরের পরামর্শক্রমেই দাওয়াতী দপ্তর কাজ করবে।

—০—

মহিলাদের দাওয়াতে খায়র কার্যক্রম

‘দা’ওয়াতে খায়র’ কার্যক্রম শুধু পুরুষদের জন্য নয়, নারীদের জন্যও প্রযোজ্য। নারীরাও এ কাজে অংশ নেবেন এবং সৌভাগ্যবতীদের অন্তর্ভুক্ত হবেন। আল্লাহ্ পাক এরশাদ করেন-

وَمَن يَعْمَلْ مِنَ الصَّالِحَاتِ مِن ذَكَرٍ أَوْ أُنثَىٰ وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَأُولَـٰئِكَ يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ وَلَا يُظْلَمُونَ نَقِيرًا ﴿١٢٤﴾

তরজমা: এবং যা কিছু সৎ কাজ করবে, পুরুষ হোক কিংবা স্ত্রীলোক এবং যদি হয় মুসলমান, তবে তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে এবং তাদেরকে অণু পরমাণও কম দেয়া হবে না।।’’ [সূরা আন্ নিসা: আয়াত-১২৪, তরজমা: কানযুল ঈমান]

সুতরাং কাজের প্রতিদান পাবার ক্ষেত্রে নারী-পুরুষে কোন তারতম্য নেই; বরং একই। অন্যত্র এরশাদ করেন-

إِنَّ الْمُسْلِمِينَ وَالْمُسْلِمَاتِ وَالْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ وَالْقَانِتِينَ وَالْقَانِتَاتِ وَالصَّادِقِينَ وَالصَّادِقَاتِ وَالصَّابِرِينَ وَالصَّابِرَاتِ وَالْخَاشِعِينَ وَالْخَاشِعَاتِ وَالْمُتَصَدِّقِينَ وَالْمُتَصَدِّقَاتِ وَالصَّائِمِينَ وَالصَّائِمَاتِ وَالْحَافِظِينَ فُرُوجَهُمْ وَالْحَافِظَاتِ وَالذَّاكِرِينَ اللَّهَ كَثِيرًا وَالذَّاكِرَاتِ أَعَدَّ اللَّهُ لَهُم مَّغْفِرَةً وَأَجْرًا عَظِيمًا ﴿٣٥﴾

তরজমা: ‘‘নিশ্চয় মুসলমান পুরুষ ও মুসলমান নারীগণ, ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারীগণ, অনুগত পুরুষ ও অনুগত নারীগণ, সত্যবাদী পুরুষ ও সত্যবাদী নারীগণ, সত্যবাদী, ধৈর্য্যশীল পুরুষ ও ধৈর্যশীল নারীগণ, বিনীত পুরুষ ও বিনীত নারীগণ, দানশীল পুরুষ দানশীল নারীগণ, রোযা পালনকারী পুরুষ ও রোযা পালনকারী নারীগণ, স্বীয় লজ্জাস্থানের পবিত্রতা হিফাযতকারী নারীগণ এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী পুরুষ ও স্মরণকারী নারীগণ এ সবার জন্য আল্লাহ্ ক্ষমা ও মহা প্রতিদান তৈরী করে রেখেছেন।   [সূরা আহযাব: আয়াত-৩৫, তরজমা: কানযুল ঈমান]

তাছাড়া, দা‘ঈ হিসেবে নারী ও পুরুষকে পরস্পর বন্ধু এবং সহযোগি হিসেবে উল্লেখিত হয়েছে কুরআন শরীফে। যেমন-

وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ ۚ يَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَيُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَيُطِيعُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ ۚ أُولَـٰئِكَ سَيَرْحَمُهُمُ اللَّهُ ۗ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ ﴿٧١﴾

তরজমা: ‘মু’মিন পুরুষগণ এবং মু’মিন নারীগণ একে অপরের বন্ধু, (কারণ) তারা মানুষকে সৎ কাজের নির্দেশ দেয় এবং মন্দ কাজে নিষেধ করে, নামায কায়েম রাখে, যাকাত প্রদান করে এবং আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলের নির্দেশ মান্য করে, তারা হচ্ছে ওই লোক, যাদের উপর আল্লাহ্ শীঘ্রই দয়া করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ্ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। [সূরা তাওবা: আয়াত-৭১, তরজমা- কান্যুল ঈমান]

যেহেতু মর্যাদা এবং জিম্মাদারী সমান, তাই পুরুষের পাশাপাশি আমাদের মা-বোনদেরকেও এ দায়িত্ব পালন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আমরা নারী-পুরুষ দা’ঈগণ একে অপরের সাহায্যকারী, যদিওবা নারীরা নারীদের মধ্যেই কাজ করবে এবং পুরুষরা করবে পুরুষদের হিদায়ত।

যেহেতু পর্দা নারীর জন্য ফরয এবং পর্দাই নারীর সৌন্দর্য এবং নিরাপত্তার অন্যতম অবলম্বন, সেহেতু সর্বক্ষেত্রেই এই ফরয কাজটি বজায় রেখেই নারীরা নিজেদের পরিমন্ডলে এবং পরিবেশে কাজ করে যাবে। নারীদের জন্য শরিয়তের যে সমস্ত জ্ঞান অর্জন করা ফরয বা অপরিহার্য সে সব বিষয়ে শিক্ষাদানকে অগ্রাধিকার দিয়ে এ দাওয়াতী কাজ চালাতে হবে। নারীদের জন্য এমন কিছু মাসআলা-মাসাইলের জ্ঞান থাকা জরুরি, যা পুরুষের নিকট থেকে শেখা বিব্রতকর- তা অবশ্যই নারীদের মাধ্যমেই শেখাতে হবে। যেমনটা করতেন স্বয়ং রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম হযরত আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর মাধ্যমে। তাই পুরুষদের জন্য প্রস্তাবিত দাওয়াতে খায়র পদ্ধতি সামনে রেখে নারীরা তাদের নিজেদের জন্য প্রযোজ্য শরিয়তী যেসব পথ এবং বিষয় অবলম্বন করা সমীচিন মনে করবেন- তাই করবেন। এ জন্য প্রয়োজনে পুরুষ আলেমদের পরামর্শ নেওয়া জরুরি হলে তা নেবেন এবং কেন্দ্রিয় দাওয়াতে খায়র বিভাগের সহযোগিতা নিতে পারবেন।

মেয়েদের কর্মক্ষেত্র

অবশ্যই সর্বাগ্রে নিজেদের নিরাপত্তা, তারপরই অন্যদের দাওয়াত দেওয়ার প্রশ্ন। তাই মেয়েদের কর্মক্ষেত্র হবে শুধু মেয়েদের মধ্যে, মহিলা সমাবেশে।

আল্লাহ্ পাক, এ কাজে আগে নিজেকে এবং পরিবারকে শামিল করতে নির্দেশ দিয়েছেন, যেমন- এরশাদ হয়েছে,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ عَلَيْهَا مَلَآئِكَةٌ غِلَاظٌ شِدَادٌ لَّا يَعْصُونَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ ﴿٦﴾

তরজমা: হে ঈমানদারগণ! নিজেদেরকেও পরিবারবর্গকে ঐ আগুন থেকে রক্ষা করো, যার ইন্ধন হচ্ছে মানুষ ও পাথর, যার উপর কঠোর নির্মম ফিরিশতাগণ নিয়োজিত রয়েছেন, যারা আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করেনা এবং যা তাদের প্রতি আদেশ হয়, তাই করে। [সূরা তাহরীম: আয়াত-৬, কান্যুল ঈমান]

আর, এ কাজটি সবচেয়ে বেশি পালন করতে পারেন মা-বোনেরা। সুতরাং প্রত্যেক দা’ঈ নারী এবং মু‘আল্লিম নারী নির্বিশেষে, আগে নিজেকে ইসলামের অনুসারী হিসেবে তৈরী করবে, অতঃপর, নিজের মা-বাবা, ভাই-বোন এবং অপরাপর সদস্যদের সে পথের পথিক বানানোর কাজকে অগ্রাধিকার দিয়ে দাওয়াতে খায়র কাজে অংশ নেবেন। পরিবারের পর প্রতিবেশি, এরপর আত্মীয় স্বজন। এরপর নিজের কর্মক্ষেত্র এবং অন্যান্য সম্ভাব্য মহিলা অঙ্গনে কাজ চালাবেন। তারা বাসায় বাসায় গিয়ে নারীদের একত্র করে তালিম দেবেন। স্কুল-কলেজ মাদরাসায় যে সব নারী অভিভাবক তাঁদের সন্তানদের ছুটির অপেক্ষায় অলসভাবে বসে থাকেন- তাঁদের মধ্যেও এ কাজ করতে পারে। বস্তি-মহল্লা, গার্মেন্ট ইন্ডাষ্ট্রিতে বিদ্যমান নারীদের জন্যও তাদের কাজ করতে হবে। এমনকি বিত্তশালী, উচ্চ শিক্ষিত নারীদের মধ্যে আরো বেশি তৎপর হওয়া জরুরি। কারণ, এদের একজন সাত জনের কাজ আদায় করতে সক্ষম। তাছাড়া, অধিক বিত্ত যেহেতু মানুষকে বলগাহীন করে তুলে তাই তারা অধিকাংশই বিপদগামী হয়ে থাকে, বিধায় এই মহলে বেশি কাজ করতে হবে- যাতে তারা হেদায়তের পথে ফিরে আসেন। তবে, সর্বক্ষেত্রে একই কৌশল অনেক সময় অচল বলে প্রতীয়মান হতে পারে, বিধায় যেখানে যে উপায় অবলম্বনে বেশি সুফল আসবে সেখানে সে হিকমত ও প্রজ্ঞাকে কাজে লাগাতে হবে। এটাই আল্লাহর নির্দেশ।

সুতরাং দা’ঈ এবং মু‘আল্লিমগণের অধিকতর জ্ঞান, বুদ্ধিমত্তা, অভিজ্ঞতা এবং প্রশিক্ষণ অর্জনের কোন বিকল্প নেই। এ মহান কাজে। আর এ হিকমত অর্জনের ক্ষেত্রে নারী দা’ঈদের বন্ধু হিসেবে প্রয়োজনীয় সব সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত থাকবে পুরুষ দা’ঈরা- দাওয়াতে খায়র মূল দফতরের পুরুষ আলিম ও প্রশিক্ষকরা।

মোটকথা, এ ধরনের কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছাড়া অন্যসব ক্ষেত্রে নারীরা পুরুষদের জন্য প্রদত্ত পদ্ধতিসমূহ অনুসরণ করে দাওয়াতি কাজ চালাতে পারবেন।

উপসংহার

যেহেতু আল্লাহর এ নির্দেশ সিলসিলায়ে আলীয়া কাদেরিয়ার মাশায়েখ-হযরাতের পক্ষ থেকে আমাদের উপর এসেছে, সুতরাং আমাদের এ কাজে তাঁরাও সার্বক্ষণিক শামিল আছেন। এ বিশ্বাস রাখা চাই। হযরাতে কেরাম বলেন, হাত-পায়র হরকত করো, গায়ব সে মদদ হোগী’। সেহেতু আমরা একটু চেষ্টা করলেই ওই গায়বী সাহায্যে অনেক দূর এগুতে পারবো। হযরত গাউসে জমান সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ রহমাতুল্লাহি আলায়হি বলতেন, ‘বা’জি আগর চাহেঁ তো সূখী লাকড়ি সে ভি কাম লে সেকতে হ্যাঁয়’। হযরত চাইলে শুকনো কাঠ থেকেও বড় বড় কাজ নিতে পারেন। সুতরাং আমাদের মতো অনুপযুক্তদের দিয়ে এতো বড় কাজ আদায় করার ইঙ্গিত এটি- যদি আমরা আস্থাবান হই এবং দৃঢ়তার সাথে পথ চলি। হযরত সাবির শাহ্ সাহেব ক্বেবলা বলেছেন, ‘আপনাদের কোন ভয় নেই, কারণ হযরাতে কেরাম আপনাদের সাথে আছেন’। তাই এখন শুধু এগিয়ে যাওয়া, আর সময় ক্ষেপন নয়। আর, লজ্জা নয়, অলসতা নয়। এই লজ্জা, এই অলসতা, এই শংকা, এ দ্বিধাদ্বন্ধ সবকিছু ইবলিসেরই কারসাজি; তাই একে পদদলিত করে এগিয়ে যাওয়াটাই হবে ‘জিহাদে আকবর’। হাদীস শরীফে, তলোয়ারের জেহাদকে ছোট জেহাদ বলা হয়েছে আর নফসের দ্বন্দ্বকে দমনের মাধ্যমে সত্যের দিকে এগিয়ে যাওয়াটাকে বলা হয়েছে বড় জিহাদ তথা জিহাদে আকবর। তাই দাওয়াতে খায়র আমাদের জন্য ‘জিহাদে আকবর’। আল্লাহ্ পাক তাওফীক্ব দিন। আ-মী-ন।

 

 

 

শেয়ার
  • 123
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    123
    Shares